মধুপুর বনে মধুলিপ্সাঃ পঙ্কজ ভট্টাচার্য

সদ্যপ্রয়াত মানবমুক্তির সংগ্রামী নেতা ও সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী ভূমিজ এবং বনের সন্তান আদিবাসীর দুঃখকষ্ট ও পরিবেশ ধ্বংসের জন্য বনরক্ষকদের ‘বনভক্ষক’ আখ্যায়িত করে গেছেন বার বার। সারা দেশে বনবিভাগের নিত্য ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল গুলোতে এখনও বৃটিশ শাসনের অবসান হয় নাই, অঘোষিত বৃটিশ রাজত্ব বলবৎ রয়েছে। স্বাধীনদেশের বনবিভাগ পরিচালিত হচ্ছে বৃটিশ রাণীর ১৯২৭ সনের বন আইনে। আর বন আইনের কুখ্যাত ২০ ধারা ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, এধারায় বনের দণ্ডমুণ্ডের ‘হত্যাকর্তা বিধাতা’ বানিয়ে দিয়েছে বনরক্ষক নামধারী বনভক্ষকদের। ওয়াজেদ আলীর ভাষায় ‘সেই ট্টাডিশন আজও সমানে চলিতেছে।’
বন ও বনের সন্তান আদিবাসীরা এক দিশাহীন দুঃসময় পার করছে এখন। বৃটিশ শাসনের অনেক আগে থেকেই বনের পুত্র-কন্যা আদিবাসীরা বনসৃজন, সংরক্ষণ, পরিচর্যা, প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দুরুহ কর্মকান্ডকে পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য পালন মনে করে এসেছেন, আজও বন তাদের ধর্মাচরণ, জীবনযাপন, জীবনধারণ তথা আদিবাসী সংস্কৃতির প্রধান অঙ্গ। আদিবাসীদের বন থেকে বিযুক্ত করলে আদিবাসী বাঁচেনা, বনও বাঁচেনা। এ সত্যটি প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে অহরহ। বনের কর্তাব্যক্তিরা হান্টার হাতে হাফ প্যান্ট ও হ্যাটবুট পড়া বৃটিশ আমলার পদাংক অনুসরণ করে বলেন, আদিবাসীরা শত শত বৎসর বনবাসী থাকলেও তাদের জমির স্বত্ব নাই, দলিল নাই। এরা জানেন না পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জমির দলিল ও রেজিষ্ট্রির রেওয়াজ নেই। জমির উপর আদিবাসী জাতি-সম্প্রদায়ের যৌথ দখলীয় মালিকানা থাকে, ব্যক্তিগত মালিকানা নয়- এটাই প্রথাগত অধিকার তথা জন্মগত অধিকার। সর্বোপরি আদিবাসীদের কাজে তাদের বসতি পাহাড়, বন, জলাশয়, জঙ্গল হোল মাটি- মা। মাটি- মাকে বিক্রী, রেজিষ্ট্রি, হস্তান্তর করা তাদের কাছে মাটি-মাকে অসম্মান করার নামান্তর। আদিবাসীরা তাই বলে আমরা মাটি-মাকে বিক্রী করতে পারি না। এজন্য জাতিসংঘের বহু দলিলে আদিবাসীদের বসবাসের দখলীকৃত ভূমিকে প্রথাগত ভূমি অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, আই, এল, ও-র ১০৭ নম্বর ধারায় আদিবাসীর প্রথাগত ভূমির অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এটার অনুস্বাক্ষরও করেছে। তথাপি রাষ্ট্রের সর্বঞ্জ আমলাচক্র যখন বলেন, ওদের জমির মালিকানার কাগজ বা দলিল নেই, তাই উচ্ছেদ করা হবে তাদেরকে, তখন অবাক হই না বুঝি বৃটিশ ও পাক আমল এখনও শেষ হয় নাই। সারবস্ত লুপ্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের।
এবাবু আমি মধুপুর প্রসঙ্গে আসি সরকারী প্রশাসনের একদল দুর্নীতিবাজ আমলা ও ভূমিদস্যু এবং লুটেরা চক্র একজোট হয়ে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের সংকট সৃষ্টি করে নিজ ভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদের গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। স্মরণাতীত কাল থেকে মধুপুর বনাঞ্চলে ২৫ হাজারের অধিক গারো, কোচ, বর্মন ও বাঙালী শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে এসেছেন। আদিবাসীরা গভীর মমতায় বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এসেছেন শত শত বছর ধরে। অপরদিকে সরকার ও বনবিভাগ বিভিন্ন সময় বন ও পরিবেশ ধ্বংসকারী মুনাফামুখীন প্রকল্প গ্রহণ করে এই প্রাকৃতিক বনকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছেন। পাকিস্তানী আমলের ঘন ও বিস্তৃত শালবন উজার করা হয়েছে। নির্বিচারে। উডলক ও রাবার বাগানের নামে কায়েমী আমলা- লুটেরা চক্র প্রাকৃতিক বন ধ্বংসে নিয়োজিত। এরা বনের ভিতর বিভিন্ন স্থাপনা- ন্যাশনাল পার্ক , পিকনিক স্পট, বিমান বাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে প্রাকৃতিক বনের সর্বনাশ এবং পরিবেশের বিপর্যয় সৃষ্টি করে চলেছেন। দেখার কেউ নেই, রাষ্ট্র যে দৃষ্টিহীন।
২০০৪ থেকে ২০০৮ সন পর্যন্ত ক্ষুধার্ত আমলা- লুটেরা চক্র ইকোপার্কের নামে মধুপুরকে মধুচক্র বানাতে তৎপর হয়ে আদিবাসী উচ্ছেদের মহাপরিকল্পনা কার্যকর করতে উন্মত্ত হয়েছিলেন। ফলে গিদিতা রেমা, পীরেন স্লান ও চলেশ রিছিলকে উচ্ছেদ-চক্রান্তকারীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়। শোকাহত আদিবাসী স্বজনের শোক শাক্তিতে পরিণত করে শপথ নেয়- প্রাণ থাকতে ‘ইকোপার্ক’ হতে দেবনা। আদিবাসীদের রুদ্ররোষের সামনে কুচক্রী বনকর্তাদের পিছু হটতে হয়। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা পীরেন স্লানের হত্যার বিচার দাবী করেন এবং নিহতের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা দেন। এখনও চোখে ভাসে ২০০৪ সনের পীরেন স্লানের মৃতদেহ রাজপথে রেখে হাজার হাজার আদিবাসী নরনারী বন্ধ করে দিয়েছিলেন ঢাকা- টাঙ্গাইল- উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ। দীর্ঘ ৮ ঘন্টাব্যাপী অচলাবস্থা দূর করে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ভদ্রমহিলা হাতজোড় করে আদিবাসীদের কাজে দুঃখ প্রকাশ করে হত্যার বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়েছিলেন। বন- আমলারা সেকথা ভুলে বসেছেন আজ। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হোল-ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী যিনি ইকোপার্কের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন আজকে তারই প্রধানমন্ত্রীত্বে দেশ যখন পরিচালিত হচ্ছে তখন শেখ হাসিনার সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য অশুভ চক্রটি পুনরায় নতুন আদিবাসী উচ্ছেদের চক্রান্তে মত্ত হয়েছেন। আদিবাসী ও বাঙালী মধুপুরের জনগণের সাথে কোন আলোচনা ব্যতীরেকে তাদের সম্মতি- সমঝোতার পরোয়ানা না করে অতি সংগোপনে ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সনে মধুপুর বনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করা হয় যা অতি সম্প্রতি জানা গেছে। মধুপুর এলাকার ৯ হাজার ১৪৫ একর জমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অধীনে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ১৩ টি গ্রামে আদিবাসী গারো, কোচ, বর্মন ও বাঙালীর শত শত বছরের বসতি, ১৫ হাজার জনগোষ্ঠী আজ উচ্ছেদ আতঙ্কে অস্থির ও ক্ষুব্ধ। তাদের বসতভিটা, স্কুল, মসজিদ, গীর্জা, মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কবর, শ্মশান ও আবাদী জমি কেড়ে নেয়ার বনবিভাগের নয়া চক্রান্ত প্রতিহতে তারা বদ্ধপরিকর।
বর্তমান সরকারী দল আওয়ামী লীগ তাদের বিগত নির্বাচনী ইস্তেহারে আদিবাসীদের জমির প্রথাগত অধিকার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ইস্তেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কারা কী কারণে অতি সংগোপনে মধুপুরকে ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চলের’ নামে প্রজ্ঞাপন জারী করে সরকার ও আদিবাসীদের মুখোমুখি সংঘাতে ঠেলে দিচ্ছেন তা সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে, এভাবে স্বার্থবাহী লুটেরা-আমলা চক্রকে নিষ্ক্রীয় ও বিরত করতে হবে। মনে রাখতে হবে ধর্মান্ধ জঙ্গী আতঙ্কে যখন দেশবাসী ভীতি উৎকণ্ঠায় বিপর্যস্ত, তখন আদিবাসী-শ্রমিক-কৃষকসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চল’ এর নামে গরীব আদিবাসী-শ্রমজীবি মানুষকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার যে কোন পদক্ষেপ জনগণের সাথে সরকারের দূরত্বও বিচ্ছিন্নতা বাড়াবে। আর অস্থিরতাও অস্থিতির পথে দেশকে ঠেলে দেবে। অতএব সাধু সাবধান।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *