পাহাড়ে পর্যটন শিল্প একটি আদিবাসী মারার যন্ত্রঃ পিপল চাকমা

পাহাড় সব সময় আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু। পার্বত্য চট্টগ্রাম রাজনৈতিক ভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ক্ষমতার পালা বদল হয়। কিন্তু পাহাড়ে আদিবাসীদের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন হয়নি। দেশের যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকুক না কেন পাহাড়ের জন্য আলাদা শাসন ব্যবস্থা জারি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে সব রাজনৈতিক দল। ক্ষমতাসীন দলগুলো আদিবাসীদের উপেক্ষা করে বিভিন্ন সময় তাদের ক্ষমতা অপব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। যার প্রভাব পার্বত্য চুক্তিতে প্রতীয়মান। পার্বত্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে ১৮ বছর অতিবাহিত হতে চলেছে তারপরও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বরং চুক্তি পরিপন্থী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাহাড় আর সমতলকে বিভাজন সৃষ্টি করে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সব সময় ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। তারা চায়না পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হোক। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের এমপি মন্ত্রীরা বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করছে। দেশের অধিকাংশ নাগরিক পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবীতে সোচ্চার। অথচ সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন না করে সেনাবাহিনীকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে পাহাড়ে অশান্তি বজায় রেখেছে। অপারেশন উত্তরণের নামে সেনাবাহিনী তাদের ক্ষমতা অপব্যবহার করে সেটেলার বাঙ্গালীদের দিয়ে ভূমি বেদখল অব্যাহত রেখেছে। উন্নয়নের কথা বলে পর্যটন বানানোর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করে আদিবাসীদের উচ্ছেদের এখন একটি বড় প্রতারণার ফাঁদ। পর্যটন শিল্প সম্প্রসারণ করে স্থানীয় অধিবাসীদের কোন ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি বরং সেটেলারদের গুচ্ছ গ্রাম তৈরীর কারখানা ছাড়া আর কিছুই না এই পর্যটন শিল্প। এর বড় উদাহরণ সাজেক ভ্যালী পর্যটন তৈরী করে প্রতিদিন সমতল এলাকা থেকে মানুষ ভ্রমণ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে পাহাড়ীদের প্রতারণা করে যাচ্ছে। সেটেলারদের অভয়ারণ্য এখন সাজেক। সেনাবাহিনী যে কোন সময় অপহরণ নাটক সাজিয়ে ষড়যন্ত্র করে সাজেকে সেটেলার বসতি স্থাপন করে কিনা, সেটাই এখন বড় ভয়। স্থানীয় অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে সেনবাহিনী বিলাস বহুল কটেজ বানিয়ে বাণিজ্য করে যাচ্ছে। ঢাকায় অনেক ট্রাভেল এজেন্সী গড়ে উঠেছে পাহাড়ের পর্যটন শিল্পকে ঘিরে। যথারীতি অফিস ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করে সামাজিক মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। দেখা গেছে এই সমস্ত ট্রাভেল ব্যবসায়ীরা সেটেলার বাঙ্গালী হয়ত সেনাবাহিনীর নিকট আত্মীয়। দুই পয়সাও স্থানীয় আদিবাসীদের পকেটে যাচ্ছে না, যা লাভবান হচ্ছে সেটেলার বাঙ্গালী আর সেনাবাহিনী। পাহাড়ে পর্যটন শিল্প একটি আদিবাসী মারার যন্ত্র। সেনাবাহিনীর এই অপকৌশল বন্ধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বন উজাড় হয়ে যাবে এবং আদিবাসীরা ভূমিহীন হয়ে পড়বে। বন জঙ্গল উজাড় হয়ে গেলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে পাহাড়। দেখা দিবে খাদ্য সংকট, পাহাড়ী ঝর্ণাগুলি শুকিয়ে যাবে, বিভিন্ন বন্য প্রাণী বিলুপ্তি ঘটবে। যেকোন সময় প্রাকৃতিক বিপর্যয় সময় নেমে আসতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন জাগে যেখানে নগরায়ন হয়েছে এবং মানুষের বসবাস বেশি সেখানে উন্নয়ন না করে বন জঙ্গল উজাড় করে পর্যটন তৈরী করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। স্বাধীনতার আগে আর পরে এবং বর্তমানে পাহাড়ের চিত্র দেখলে বুঝা যাবে উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে ভূমিহীন করা হয়েছে। শত শত আদিবাসী পরিবার নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে উদ্বাস্ত জীবন যাপন করছে। নিজ দেশে তারা আজ পরবাসী। তাদের ভাগ্য আজও পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি। কোন সরকার আদিবাসীদের সুশাসন, মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। মানবাধিকার লংঘন করে আদিবাসীদের উপর স্টীম রোলার চালাচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। আইনের শাসন না থাকার কারণে সুশাসন নিশ্চিত হয়নি। যার ফলে প্রতিনিয়ত হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও জুলুম চলছে আদিবাসীদের উপর। স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দখলে। যার ফলে যখন তখন আদিবাসীদের প্রতারণার শিকার হতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার একর সেগুন বাগান উজাড় হয়ে গেছে একমাত্র বন দস্যু এবং চোরা কারবারীদের যোগসাজশে। দেশের এই অমূল্য সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের পকেটে চলে গেছে। আর বিভিন্ন সময় এই সমস্ত অর্থ আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার পিছনে খরচ করছে ক্ষমতাসীন লোকজন। তাই দেশের স্বার্থে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন খুবই জরুরী। আওয়ামী লীগ সেই সময় সরকারের পক্ষ হয়ে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন করেছিল এবং চুক্তি বাস্তবায়ন না করে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে চলে যায়। চুক্তি সাক্ষর হওয়ার পর আওয়ামী লীগ দুইবার রাষ্ট্র পরিচালনা ক্ষমতায় আসে। বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। তারপরও পার্বত্য চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো করতে পারেনি। আর কত টালবাহানা পার্বত্য চুক্তিকে নিয়ে। পাহাড়ীদের আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে। দেশের একটি অংশ অরাজকতা সৃষ্টি করে একটি দেশে কোনদিন শান্তি আসতে পারে না। তাই দ্রুত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করে পাহাড়ে শান্তি নিশ্চিত করুক সরকার।
ব্লগার ও সমাজকর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *