স্মরণঃ দেশব্রতী উসুয়ে- দক্ষিণের বাতিঘরঃ পঙ্কজ ভট্টাচার্য

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির ইতিহাসে এক সুপরিচিত ও ব্যতিক্রমী বিপ্লবীর নাম উসুয়ে তালুকদার উসুয়ে দা, উসুয়ে ভাই, উসুয়ে বাবু নামে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে ভাই-বন্ধু আপনজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এই মহাপ্রাণ মানুষটি তার প্রিয় মাতৃভূমি, পরিজন ও দেশবাসীকে ছেড়ে না- ফেরার দেশে চলে গেলেন সম্প্রতি। তিনি শুধুমাত্র রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রধান নেতা নন, দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং সমগ্র ভূখ-ের একজন আদর্শবান ও ত্যাগী বাম প্রগতিশীল নেতা ছিলেন। পরিণত বয়সে সম্প্রতি ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তার মৃত্যুজনিত শূন্যতা দেশের প্রগতিশীল ও সমাজ বদলের শিবিরে প্রতিনিয়ত অনুভূত হবে।বিপ্লবী উসুয়ের জন্ম ১৯৩২ সালের ৭ ডিসেম্বর পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার ফেলাবুনিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত রাখাইন পরিবারে। তার ঠাকুরদার (নানা) নাম মংমহেঅং, ডাক নাম মৈশে হাওলাদার। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলে ইউনিয়নের শাসন কর্মকর্তা নিযুক্ত ছিলেন। উসুয়ের পিতার নাম ফ্লহ্লাউ (ফসাউ)। তিনি ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য এবং বরিশাল জজকোর্টের জুরি বোর্ডের মেম্বার (জুরার)। উসুয়ে’র মাতার নাম চানথাফ্রু। তার নানীর (দিদিমা) নাম চোয়ান ম্রাউ। তার নানার পিতার নাম প্লহাঅং এবং নানার মাতার নাম ওয়েংঅংমে। এই দম্পতি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও ধার্মিক। তাদের এবং তাদের পুত্র ও পুত্র বধূদের সহযোগিতায় ১৩০৭ বাংলা সনে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ‘সীমা বৌদ্ধ বিহার’ (প্যাগোডা) প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ্তবিদেশের ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মাবলম্বী ও পর্যটকদের কাছে এটা ছিল প্রধান দর্শনীয় তীর্থভূমি। এই বৌদ্ধ বিহার ১৯৬২ সালে নদীর ভাঙনে নদী গর্ভে তলিয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে ইসুয়ের পিতা নদী ভাঙনের কারণে তাদের নিজ ভিটাবাড়ি ছেড়ে কলাপাড়া সদরে বসতবাড়ি গড়ে তোলেন। তার ঠাকুরদা ও মাতুল বংশের হাজার হাজার একর জমি নদী ভাঙনে বিলীন হওয়ার কারণে কলাপাড়া সদরে এক বিরাট দ্বিতল কারুকার্য খচিত বাড়ি নির্মাণ করেন। এই বাড়টি বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির এক প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠে বিশেষতঃ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে। এই বাড়ির একাংশে ন্যাপের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু ছিল দীর্ঘদিন ধরে।সমাজ বদলের একনিষ্ঠ সৈনিক ইসুয়ে তালুকদারের রাজনীতির কর্মক্ষেত্রে ছিল পটুয়াখালী বরগুনাসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে। তার সক্রিয় পদচারণা ছিল দেশের কৃষক আন্দোলনের অঞ্চলসমূহে। বিগত ছয় দশক ধরে তিনি দেশের সকল প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকা-ে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা পালন করে এসেছেন। অবিভক্ত ভারতের কংগ্রেস দলে, পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক যুবলীগের নেতা, আওয়ামী লীগের নেতা ও ৫৭ পরবর্তীতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা হিসাবে সক্রিয় রাজনীতি আমৃত্যু অবদান রেখে এসেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও সব সময় সম্পর্ক রেখে তিনি চলেছেন। গণফোরামের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সর্বশেষ ঐক্য কনভেনশনে গঠিত ঐক্য ন্যাপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ম-লীর সদস্য ছিলেন তিনি। একই সাথে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর তিনি ছিলেন ধর্মীয়, সমাজিক, সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে প্রধান নেতা। রাখাইন ভাষা শিক্ষাদানসহ সাধারণ শিক্ষার স্কুল প্রতিষ্ঠা, পটুয়াখালী রাখাইন সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি, বাংলাদেশ বার্মা এ্যাসোসিয়েশনের তিনি ছিলেন আজীবন সভাপতি ম-লীর সদস্য, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের জেলা সহসভাপতি ও থানা সভাপতি, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের পটুয়াখালী জেলা আহ্বায়ক ছিলেন তিনি।একই সাথে রাখাইনসহ পাহাড় ও সমতলের সকল জাতিগোষ্ঠীসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, প্রথাগত ভূমি অধিকারসহ আদিবাসীদের ভূমি নিরাপত্তা, আদিবাসীদের ওপর শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতন ও অবহেলার বিরুদ্ধে জাতীয়ভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামেরও অন্যতম নেতা হিসাবে সব সময় ক্রিয়াশীল ছিলেন উসুয়ে। আদিবাসীর অধিকারের সংগ্রামের চেয়ে বহুগুণ বেশি আন্দোলন সংগ্রামে তিনি অবদান রেখেছেন কৃষক-শ্রমিক নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অধিকার এবং জাতীয় দাবিতে। জাতীয় রাজনীতিতে আদিবাসী এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সক্রিয় পদচারণা ছিলা অতূলনীয় ও নজিরবিহীন। ১৯৭০ সনে সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার জোয়ারের মধ্যেও ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১৭,২৫৫। তাও বন্যা, জলোচ্ছ্বাস-গোর্কির কারণে দক্ষিণাঞ্চলে একমাত্র পরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট সংগ্রহের সুযোগ অবস্থা কোনটাই ছিল না। প্রতিকূলতার মধ্যে উসুয়ের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও আস্থার পরিচায়ক উক্ত ভোটের সংখ্যা। বায়ান্নর ভাষা সৈনিক উসুয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে সকল গণতান্ত্রিক ও জনগণের রুটি-রুজির সংগ্রামে অবদান রেখেছেন। বিশেষতঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে গমন না করে তার নিজ এলাকায় আদিবাসী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা, সংবাদ ও তথ্য সংগ্রহ, আশ্রয়ণ প্রভূতি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।উসুয়ে ছিলেন বিত্ত, সম্পদ, ক্ষমতা ও লোভ-প্রলোভনের ঊধর্ে্ব। মাটি, মানুষ ও মাতৃভূমির প্রতি একান্তভাবে দায়বদ্ধ, আদর্শ ও নীতিতে অবিচল থেকে তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন জনকল্যাণে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার তাকে একশ’ বিঘা জমি দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সবুর খান উসুয়ের বাড়িতে এসে তাকে নানান সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস দিয়ে রাউয়ালপিন্ডির সবুরের বাস ভবনে আমন্ত্রণ জানান। শত প্রলোভন তাকে আদর্শ থেকে টলাতে পারেনি। উসুয়ে তালুকদারের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যাদের ঘনিষ্ঠ সান্বিধ্য পেয়েছেন তাদের মধ্যে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মনিসিংহ, প্রফেসর মুজাফফর আহমেদ, নলিনী দাশ, আব্দুল করিম, মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, মনোরঞ্জন ধর, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন শিকদার, সত্যেন সেন, প্রাণ কুমার সেন, দেবেন শিকদার, হীরালাল দাশগুপ্ত, মনোরমা বসু, অজয় রায়, ড. অজয় রায়, পীর হাবিবুর রহমান, কবি সুফিয়া কামাল, ড. কামাল হোসেন, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, আব্দুস সাত্তার, রণেশ মৈত্র, মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত (অব.), এডভোকেট খান সাইফুর রহমান, বিচারপতি একেএম বদরুল হক, এডভোকেট পরিমল চন্দ্র গুহ, ব্যারিস্টার সাইদুর রহমান, সৈয়দ আশরাফ, নিরোদ বিহারী নাগ, পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রমুখ।মৃত্যুকালে এই মহান ব্যক্তিত্ব রেখে গেছেন সুদীর্ঘকালের মানবমুক্তির সাধনা ও আন্দোলন সংগ্রামের এক সুমহান ঐতিহ্য আর তার সহধর্মিণী, এক পুত্র দুই কন্যা, জামাতারা, নাতি-নাতনী এবং অগণিত শোকাহত স্বজন ভক্তকূলকে।বিপ্লবী মহাপ্রাণ উসুয়ে তালুকদার শোষণ মুক্তির সংগ্রামের কিংবদন্তি পুরুষ হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের পথ দেখাবেন- তিনি হবেন স্বদেশ সাধনার এক চিরায়িত বাতিঘর।উসুয়ে তালুকদারের পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করি।

পঙ্কজ ভট্টাচার্যঃ সভাপতি; ঐক্য ন্যাপ

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.