জাতীয় বাজেট ও আদিবাসীঃ সঞ্জীব দ্রং

১.
আজ মন খুব খুশি যে আমরা কেউ এখনো ক্লান্ত হচ্ছি না। অন্যরা বললেও আমরা এখনো কেউ “ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু” বলছি না। আমাদের অত ক্লান্তি নেই, হতাশা ও বিরক্তি নেই, আমরা বলে চলেছি নিরন্তর আদিবাসী মানুষের কথা। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আমাদের। বাজেটে এবারও আশানুরূপ কিছু নেই, তবুও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যদি কিছু একটা হয়। বেলা তো একেবারে বয়ে যায়নি, বেলা এখনো আছে। সূর্য ডুবে গেলেও পরের দিন আবার নতুন সূর্য উঠে। কী সুন্দর, তাই আশায় বুক বেঁধে আছি আমরা।

আদিবাসীরা কঠিন সময় পার করছে এখন। রাষ্ট্র-সৃষ্ট আত্ম-পরিচয়ের সংকট তো ঘনীভূত হচ্ছেই, অন্যদিকে দেশের নানা স্থানে আদিবাসীরা নিজভূমি থেকে উচ্ছেদের সম্মুখিন হচ্ছে। শ্রীমঙ্গলের ৭০০ খাসিয়া পরিবার ১২ জুন থেকে উচ্ছেদ নোটিশ নিয়ে আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। মধুপুরে বনে ২০ ধারা জারী করে বন বিভাগ পুরো গ্রাম-বনাঞ্চল-স্কুলঘর-মসজিদ-মন্দির-সমাধিক্ষেত্র-হাসপাতাল রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করেছে এই ফেব্রুয়ারি মাসে। মধুপুরের গারো-কোচ-বর্মন জনগণ অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে।

২.
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। আবার মহাসমারোহে এসেছে জাতীয় বাজেট আমাদের জীবনে। সত্যজিৎ রায়ের মতো “আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে, শাখে শাখে পাখি ডাকে কত শোভা চারিপাশে” বলতে পারলে ভালো হতো। একজন মানুষ এককভাবে দশ বার সংসদে বাজেট উত্থাপন করেছেন, বিরাট রেকর্ড করেছেন। অথচ এখানে আদিবাসীদের, গরিব মানুষের, দলিত-হরিজন-প্রান্তিক মানুষের স্থান কোথায়? আমি এবারো বাজেট নিয়ে বড় বড় মোটা ১৫ খণ্ডের বই নিউমার্কেটের বুক সিন্ডিকেট থেকে ১,৪৫০ টাকায় কিনে আনলাম। যাকে পাঠিয়েছি তার শ্রমমূল্য ও সিএনিজি ভাড়া বাদে। তারপর বাজেট বইয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু তো তেমন পেলাম না। শুধু মঞ্জুরি ও বরাদ্দ দাবীসমূহ ২০১৬-১৭, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই খন্ডে ঙ অংশে লেখা আছে, “সমতল ভূমিতে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচি বাস্তবায়ন।” এ খাতে বরাদ্দ আছে গত বছরের সমান ২০ কোটি টাকা। বাজেটের আকার বেড়েছে, এখানে সমান রয়ে গেছে। বাজেট সংক্ষিপ্ত সার খন্ডে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৪০ কোটি টাকা। গত বছর ছিল ৭৭৯ কোটি টাকা। এখানে বৃদ্ধি ঘটেছে।

বাজেট বক্তৃতার ১৪৭ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে হালুয়াঘাট, দিনাজপুর ও নওগাঁতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমী নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া দেশিয় শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে বিভাগীয় ও জেলা শিল্পকলা একাডেমী নির্মাণ প্রকল্প আমরা গ্রহণ করেছি।” ১৪৭. 147. Small Ethnic Groups: In order to develop the culture of small ethnic groups, construction of cultural academies at Haluaghat, Dinajpur and Naogaon is underway. Moreover, we have taken up a project to build Shilpakala academies at district and divisional levels for promoting art and culture in the country.

এ ছাড়া বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসীদের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। এখানে এ অর্থ বছরে আদিবাসীদের জন্য কী হবে আমি জানি না। বিভাগীয় ও জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে।

৩.
আমি অর্থনীতিবিদ নই বা বাজেট বিষয়ে জ্ঞানী কেউ নই। বাজেট ও আদিবাসী বিষয়ে কথা বলবার যে টুকু অধিকার আমার আছে, তার ভিত্তি হলো; আমি নিজে এ সমাজের একজন মানুষ এবং এই জীবনে আমার সামান্য দুঃখ ভারাক্রান্ত অভিজ্ঞতা। বলতে পারেন জীবন-অভিজ্ঞতা, যা সুখকর নয়। মাননীয় অর্থমন্ত্রী দয়া পরবশ হয়ে সমতলের ২০ লক্ষাধিক আদিবাসী মানুষের জন্য এবারো গত বারের সমান ২০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রেখেছেন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। প্রকৃত সত্য হলো, টাকার পরিমাণ যাই হোক, সমতলের এই অর্থ বাস্তবায়নে আদিবাসীদের কোনো অংশগ্রহণ, ক্ষমতা নেই।

আদিবাসীদের সত্যিই উন্নয়নের ধারায় আনতে হলে জাতীয় বাজেটে পৃথকভাবে যথেষ্ট বরাদ্দ প্রয়োজন। “সবার জন্য সমান অধিকার” – এ ধরনের কথা বললে, আদিবাসীদের উপর ঐতিহাসিক যে বৈষম্য ও শোষণ চলেছে, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। এতে আদিবাসী জীবনে শোষণ ও বঞ্চনা নিয়তির মতো লেগে থাকে। বহুকাল ধরে আদিবাসী জীবনে জাতীয় বাজেট বরাদ্দ বা উন্নয়নের প্রতিফলন নেই। ঐতিহাসিকভাবে নানা শোষণ ও বঞ্চনা মোকাবেলা করতে করতে জাতীয় বাজেট নিয়ে আলাদা ভাবনার অবকাশ আদিবাসী জীবনে আসেনি।

৪.
এবারের বাজেটের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আদিবাসী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ২ ভাগের বেশি। এ হিসাবে আদিবাসীদের জন্য বাৎসরিক বরাদ্দ হওয়ার কথা কমপক্ষে ৬,৮০০ কোটি টাকা। সমতলের আদিবাসী জনসংখ্যা মোট আদিবাসী জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। সেই হিসেবে সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিৎ কমপক্ষে ৪,৫০০ কোটি। অথচ বরাদ্দ আছে ২০ কোটি টাকা। এটি হলো সমতার হিসাব। যদি বলা হয়, ঐতিহাসিক বৈষম্য হয়েছে আদিবাসীদের প্রতি। তাহলে বাজেট বরাদ্দ বিশেষ বিবেচনায় আরো বেশি হওয়া উচিত। পাটিগণিত অংক কষলে দেখা যাবে, সমতলের আদিবাসীদের জন্য জনপ্রতি বাজেট বরাদ্দ বছরে মাত্র ১০০ টাকা। অথচ একজন নাগরিকের জন্য বাজেট বরাদ্দ বছরে ২১,০০০ টাকার উপরে। এগুলো অংকের হিসাব। কত বড় বৈষম্য আমরা করছি আদিবাসী জনগণের সাথে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য এবার বাজেট বরাদ্দ ৮৪০ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন ব্যয় ২৯৫ কোটি আর উন্নয়ন ব্যয় ৫৪৫ কোটি। গত অর্থ বছরে এই বরাদ্দ ছিল ৭৭৯ কোটি টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের পাশে নীচে আছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলাম। সেখানে বরাদ্দ ২২,১০১ কোটি টাকা। এরপরও আছে আলাদা বাজেট বরাদ্দ আছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ইত্যাদির জন্য।

যেহেতু আদিবাসীরা নানাকারণে ঐতিহাসিকভাবে শোষণ, বৈষম্য ও মানবসৃষ্ট দারিদ্র ও বঞ্চনার শিকার, তাই বরাদ্দ শতকরা হিসাবের বাইরে আরো বেশি হওয়া উচিত।

৫.
আজকেও আবারো আমি আদিবাসী ও বাজেট ভাবনা নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে সব সময়ের মতো প্রখ্যাত লেখক, ম্যাগসেসে পুরষ্কারপ্রাপ্ত, পদ্মভিভূষণ উপাধিতে ভূষিত, বিখ্যাত সব উপন্যাস হাজার চুরাশির মা, অরণ্যের অধিকার ও রুদালির রচয়িতা মহাশ্বেতা দেবীর দ্বারস্থ হচ্ছি। বিখ্যাত এই মানুষটি তার গঙ্গা-যমুনা-ডুলং-চাকা প্রবন্ধে লিখেছেন, “আমি মনে করি ভারতবর্ষে শাসনব্যবস্থা মূলস্রোত-চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত। সরকার আদি-তফসিলীদের জন্য এত রকম কাগুজে ব্যবস্থা এই জন্য করেছেন যে, সরকার জানেন ওদেরকে পশ্চাৎপদ করেই রাখা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, জমির হক, বনজ সম্পদে অধিকার, জীবনের সব ক্ষেত্রেই ওরা বঞ্চিত। এই জন্য এত আইন ও স্কীম। কেন্দ্র ও রাজ্য – সব মিলিয়েই আমি “সরকার” শব্দটি ব্যবহার করলাম। আদিবাসী সংস্কৃতি, ভাষা, সমাজ সংগঠন, সবকিছুর অস্তিত্বই বিপন্ন এবং এটাই ভারতের আদিবাসীর ইতিহাস, যে ইতিহাস মানবসৃষ্ট। ওরা মূলস্রোত থেকে দূরে আছেন। মূলস্রোত ওদেরকে ভারতবর্ষ শব্দটির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে কোনদিন ভেবেছে কিনা আত্মজিজ্ঞাসা করতে অনুরোধ করি। একটি প্রশ্ন বহুকাল ধরে করে আসছি। আইটিডিপি এলাকায় এবং আদিবাসীদের জন্য সমুদ্রসমান টাকা আসছে, খরচ হচ্ছে। আইটিডিপি এলাকা, আদিবাসী জীবন, মূলত আদিবাসী প্রধান এলাকা (সিংভূম, সাঁওতাল পরগনা, রাঁচি, পালামৌ, হাজারিবাগ); এসব জায়গায় ও আদিবাসী জীবনে ওই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রতিফলন নেই কেন? কেন তারা ভূমিহীন, দেশান্তরী মজুর, শিক্ষায় এত পিছনে, তৃষ্ণার জলে, সেচের জলে বঞ্চিত? ধনী বা উচ্চ মধ্যবিত্ত আদিবাসী কতজন আছেন? এসব টাকা কোথায় যাচ্ছে? সরকারি নিয়ম মতে, যে সব বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলেছি তার বাইরে সেচ-পূর্ত-কৃষি-শিক্ষা, এমন প্রতি দপ্তরের জন্য ৪% টাকা আদিবাসী উন্নয়নে খরচ হওয়ার কথা। বাস্তবে কী হচ্ছে? গরুকে খাওয়ান, সে স্বাস্থ্যপুষ্ট হবে। ঘর সাফ করুন, ঘর পরিস্কার হবে। বই পড়ুন অনেক, জ্ঞান বাড়বে। গাছ লাগিয়ে যান ও যত্ন করুন, সে ফুল-ফল-পাতা দেবে। অর্থাৎ যত্ন, অর্থ ব্যয়ের প্রতিফলন একটা ছোট-বড় মাপের ক্ষেত্রেই ইতিবাচক হতে বাধ্য। ভারতবর্ষের সমগ্র আদিবাসী জীবনে, আদিবাসীর জন্য যে ব্যয় হচ্ছে তার প্রতিফলন নেই। তার কারণও সহজবোধ্য (বুঝতে চাইলে), এগুলির যথার্থ রূপায়ণ নেই, তার চেষ্টাও করা হয়নি।”

ভারতের অনেক রাজ্যে আদিবাসী জনগণ আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকার ভোগ করছে, স্ব-শাসন ব্যবস্থা সেখানে আছে। এত সবের পরও অনেক রাজ্যে ‘বৃহত্তর স্ব-শাসনের জন্য’ তাদের আন্দোলন চলমান। তারপরও মহাশ্বেতা দেবী এই কথাগুলো বলেছেন। আমাদের দেশের আদিবাসীদের দশা খুব করুণ। এর কারণ জাতিসংঘ বলেছে, ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের আদিবাসী জনগণ নানা শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। এত বাধা ও অবিচার মোকাবেলা করতে করতে জাতীয় বাজেট নিয়ে আলাদা ভাবনার অবকাশ এখানে আদিবাসী জীবনে আসেনি। তাই এ নিয়ে তেমন কাজ বা গবেষণাও হয়নি। তথ্য উপাত্তও নেই বলা চলে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সবেমাত্র আলোচনা শুরু করেছেন। এ নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।

৬.
তবে এবারো আমি প্রশংসা করবো, সরকার জনকল্যাণ শিরোনামে চা শ্রমিকদের জন্য ১৫ কোটি টাকা, প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ, হিজরা জনগোষ্ঠীর জন্য ৬০০ টাকা ভাতা, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ৫০০ টাকা ভাতা বরাদ্দ করেছেন। এটি গত অর্থ বছরেও ছিল। এবার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এছাড়া এবারও বাজেট বক্তৃতায় জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন, বিকশিত শিশুঃ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ শিশু বাজেট, ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা ইত্যাদি প্রতিবেদন উত্থাপিত হয়েছে, যা প্রশংসনীয়।

৭.
আমরা লক্ষ্য করছি, গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী / ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের জন্য অতীতে ছোট্ট পৃথক অনুচ্ছেদ বা প্যারাগ্রাফ থাকলেও গত কয়েক বছরের বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসীদের স্থান হচ্ছে না। গত বছরও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার ৩৭ নং পৃষ্ঠায় একটি লাইন স্থান পেয়েছিল এভাবে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও তাঁদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র ধরে রাখার লক্ষ্যে এ অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেব।” এবারের বাজেট বক্তৃতা আদিবাসীদের জন্য আরোও হতাশাজনক। সামনে এগিয়ে যাবার পরিবর্তে কেন উল্টো ইতিপূর্বে যা ছিল তাও বাদ যাচ্ছে, এ এক প্রশ্ন।
আমরা গত বছর বাজেট অধিবেশন চলাকালীন সময়ে সংবাদ সম্মেলন এবং আলোচনা সভা করে সরকারকে অনুরোধ করেছিলাম বাজেট সংশোধন ও সংযোজন করে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে। এই ককাশের কনভেনর জনাব ফজলে হোসেন বাদশা এমপি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের চেষ্টায় সফলতা আসেনি। এবার আমাদের আরো বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। এবার আমাদের হাতে কিছু সময় এখনো আছে। আমাদের প্রতিনিধি দল ককাশের নেতৃত্বে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দ্রুত দেখা করতে পারেন। এ জন্য হোমওয়ার্ক করে লিখিত আকারে আদিবাসীদের জন্য কী কী খাতে আমরা বরাদ্দ চাই, তা যুক্তি সহকারে তুলে ধরতে হবে।
৮.
আদিবাসী জনগণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বঞ্চিত, দরিদ্র ও অনগ্রসর অংশের মধ্যে অন্যতম। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের জনসাধারণের প্রায় অর্ধেক দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করে। তাদের মাথাপিছু আয়ও অনেক কম। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতল উভয় অঞ্চলের আদিবাসীদের সিংহভাগ এখনও জীবিকা নির্বাহের জন্য জুম ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। সমতলের আদিবাসীদের দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও অধিক এখন ভূমিহীন। তার ওপর আদিবাসীদের দখলীয় ভূমি নিয়ে বিরোধ সর্বত্র।

নানা কারণে আদিবাসী জনগণ উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে না। তাই আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে পৃথক ও বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। আমি এ লেখার শুরুতে আমাদের পাশের দেশের উদাহরণ তুলে ধরেছি। আদিবাসী তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষা এবং চাকুরির নিশ্চয়তাসহ আত্মকর্ম সংস্থান যাতে তারা করতে পারে, সে জন্য ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এতে শহরে মাইগ্রেশনও কমে যাবে। আদিবাসী তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে। এখানে আপনাদের আলোচনার জন্য কয়েকটি দাবি উত্থাপন করছিঃ

১. পৃথক অনুচ্ছেদ যুক্ত করে জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগণের উন্নয়নের জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী বিষয়ে বিবরণী থাকতে হবে।
২. মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে সমতলের আদিবাসীদের জন্য থোক বরাদ্দ ২০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১০০ কোটি করতে হবে।
৩. বাজেট বরাদ্দ সাধারণত হয় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক। সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য যেহেতু কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নেই, সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই থোক বরাদ্দ পরিচালনার জন্য সমতলের আদিবাসীদের সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি বা বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীর বাস সমতলে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি অনেক দিনের। মন্ত্রণালয় হলে তার মাধ্যমেই বাজেট বরাদ্দ হবে।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহের বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. সকল মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের বাজেটে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট আকারে বরাদ্দ রাখা যায় এবং বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের কীভাবে সম্পৃত্ত করা যায়, সে বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
৬. আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমীগুলোতে আদিবাসী সংস্কৃতি উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু নাচ-গান নয়, গবেষণার দিকে মনযোগী হতে হবে এবং এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
৭. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সামাজিক ক্ষমতায়নের বাজেট খাতে আদিবাসী উপকারভোগী যাতে নিশ্চিত হয়, তার জন্য এ বিষয়ে নির্দেশনা থাকতে হবে।
৮. উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী নারী ও তরুণদের আত্ম-কর্ম সংস্থানের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।

সঞ্জীব দ্রং; সাধারণ সম্পাদক;বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম
ঢাকা ২২ জুন ২০১৬, সিরডাপ অডিটরিয়াম
আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভায় মূল প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপিত।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *