কল্পনা চাকমা অপহরণের দিনটি জাতীয় কলংকের দিন

আইপিনিউজ ডেস্কঃ ১২ জুন, ২০১৬, কল্পনা চাকমা অপহরণের ২০ বছর। কিন্তু অপহরণের ২০ বছর হতে চললেও কল্পনা চাকমার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। অপহরণ মামলাটিরও নিষ্পত্তি হয়নি। অপহরণের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই লে. ফেরদৌস-এর চাকুরীতে পদোন্নতি হয়েছে। যাদের নামে মামলা দায়ের হয়েছে তারা কেউ গ্রেফতার হননি। কল্পনা চাকমার অপহরণের ২০ বছর এই বিষয়টি নিয়ে দেশের প্রধান দৈনিকগুলো বিভিন্ন উপসম্পাদকীয় ও কলাম প্রকাশ করে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন সংগঠন রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের দাবি জানায়।
ঢাকাঃ হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে কল্পনা চাকমা অপহরণের ২০ বছর উপলক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অলোচনায় বক্তারা বলেছেন অপহরণের দিনটি জাতীয় কলংকের দিন। হিল উইমেন্স ফেডারেশন সভানেত্রী চঞ্চনা চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অতিথি আলোচক ছিলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য, জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা । মনিরা ত্রিপুরার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক চন্দ্রা ত্রিপুরা। অন্যান্যদের মধ্যে অংশগ্রহণ করেন আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক এ্যান্ড্রু সলোমার, পিসিপি ঢাকা মহানগরের সভাপতি ক্যারিংটন চাকমা, নর্থ সাউট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পার্বতী রায়, চানচিয়ার সমন্বয়কারী আন্তনী রেমা, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি সুমন মারমা, কাপেং ফাউন্ডেশনের হিরণ মিত্র চাকমা প্রমুখ।
পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণের এ দিনটি জাতীয় কলঙ্কের দিন। কল্পনা চাকমা অপহরণ, সাগর-রুনি দম্পতি হত্যা, তনু হত্যাসহ সকলে বিচারহীনতার সংস্কৃতির শিকার। তিনি আরো বলেন, কল্পনা চাকমার সংগ্রাম, তার চেতনা ধারণ করে ভবিষ্যতে হাজারো কল্পনার সৃষ্টি হবে । শক্তিপদ ত্রিপুরা বলেন, কল্পনা চাকমা এক বিদ্রোহের নাম, বিপ্লবের নাম। যে বিদ্রোহের লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলের নিপীড়িত মানুষের অধিকার, স্বাধিকার আদায়। তার সোচ্চার কন্ঠে ভীত হয়েই সেনাবাহিনী রাতের আঁধারে কাপুরুষের মত তাকে অপহরণ করে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রাম অচিরেই আবারো অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন।
আলোচকরা আরো বলেন, কল্পনা চাকমা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামী আদিবাসী জুম্ম নারী সমাজের এক নির্ভীক অগ্রসৈনিক। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং এদেশে একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের উপড় সেনাশাসনের নোংরা সংস্কৃতি তাকে অপহরণ করে। দীর্ঘ ২০ বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকার তথা রাষ্ট্র অত্যন্ত লজ্জ্বাজনকভাবে এখনও সে অপহরণের বিচার নিশ্চিতকরণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই তনু হত্যা, বিচিত্রা তির্কি ধর্ষণ , সাগর-রুনি হত্যা, তুমাচিং মারমার ধর্ষণ ও হত্যার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। বক্তারা বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলণ্ঠিত করেছে।

IMG_1282
রাঙ্গামাটিঃ রাঙ্গামাটি জেলা সদরে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে কল্পনা চাকমা অপহরণের ২০তম দিবস উপলক্ষে ‘অপহরণ ঘটনার যথাযথ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে’ এক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। মিছিলটি জনসংহতি সমিতির জেলা কার্যালয থেকে শুরু হয়ে বনরূপা বাজার ঘুরে এসে ডিসি অফিসের দক্ষিণ ফটকে এসে সমাপ্ত হয় এবং সেখানেই একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত করা হয়।
মহিলা সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ-সভাপতি সোনারাণী চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জনসংহতি সমিতির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা, মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুপ্রভা চাকমা, কল্পনা অপহরণ মামলার আইনজীবী ও ব্লাস্টের রাঙ্গামাটি জেলার সমন্বয়ক এ্যাডভোকেট জুয়েল দেওয়ান, যুব সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অমিতাভ তঞ্চঙ্গ্যা, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের রাঙ্গামাটি জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক পুলক চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী দীপা চাকমা। প্রতিবাদ সমাবেশটি পরিচালনা করেন মহিলা সমিতির জোনাকী চাকমা।
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন ‘বিগত ২০ বছরেও অপহৃত কল্পনা চাকমার হদিশ না পাওয়া, অপহরণ ঘটনার যথাযথ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে না পারা, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে না পারা’ সরকার তথা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক । ‘কল্পনা অপরহরণ ঘটনার যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে প্রধানমন্ত্রী, সরকার, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীর দায়-দায়িত্ব রয়েছে’ বলে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন।
‘কল্পনা চাকমা অপরহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারীদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে’ বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। বক্তরা অবিলম্বে অপহরণ ঘটনার যথাযথ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানান।
বক্তারা অরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষে এবং জুম্ম নারীদের নিরাপত্তা বিধান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবয়ানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

P1120847
বান্দরবানঃ জেলা সদরে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন জেলা শাখার উদ্যোগে কল্পনা অপহরণকারীদের বিচারের দাবিতে একটি মিছিল বের করা হয়। পরে জনসংহতি সমিতি জেলা কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিাত হয়। । সভায় সভাপতিত্ব করেন হ্লাচিং মে চাক, সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনসংহতি সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটি সাধারণ সম্পাদক ক্যাবামং মার্মা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মহিলা সমিতি বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি ও বান্দরবান সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ওয়াইচিং প্রু মার্মা । আরো বক্তব্য রাখেন জনসংহতি সমিতি বান্দরবান সদর থানা কমিটির সভাপতি উচসিং মার্মা, যুব সমিতি বান্দরবান জেলা কমিটি সাধারণ সম্পাদক মংএচিং মার্মা(জিকো), ছাত্রনেতা অজিত তঞ্চঙ্গ্যা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন জেলা কমিটির সহ-সভাপতি আনন্তি তঞ্চঙ্গ্যা। বক্তারা ১৯৯৬ সালে প্রিয় নেত্রী কল্পনা চাকমাকে অপহরণের প্রতিবাদে যে তীব্র গণ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এবং সারা বিশ্বব্যাপী যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সেই কথা তুলে ধরেন। আলোচকরা বলেন, কল্পনা চাকমা নারী ও পুরুষের বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন ও বঞ্চনার অবসান করতে চেয়েছিলেন। আলোচকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দ্রুত পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং কল্পনা অপহরণের সাথে যারা জড়িত তাদের শাস্তি ও কল্পনা চাকমার পরিবার যেন সুবিচার পায় তার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *