কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা এবং রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতি: মেকসুয়েল চাকমা

কল্পনা চাকমা ছিলেন আদিবাসী নারী অধিকার কর্মী এবং পার্বত্য হিল উইমেন ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক। সর্বোপরি কল্পনা চাকমা পাহাড়ি আদিবাসীদের মাঝে একটি আদর্শের নাম।পার্বত্য জনপদে অধিকার আদায়ের মূর্ত প্রতীক।
দীর্ঘ ২০ বছর হতে চললো ১৯৯৬ সালে ১২ জুন জাতীয় নির্বাচনের ঠিক দিবাগত রাতে নিউ লাল্যঘোনা, উগলছড়ি, থানা- বাঘাইছড়ি, জেলা- রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার নিজ বাড়ী হতে কল্পনা চাকমা (১৬) কে বড় দুই ভাইয়ের উপস্থিতিতে অপহরণ করা হয়। ঘটনার পর পরই তার বড় ভাই কালেন্দী কুমার চাকমা এলাকার চেয়ারম্যান, টিএনওসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিগণকে অপহরণের বিষয়টি অবহিত করেন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত একটি গুলির ব্যাগ টিএনও সাহেবের নিকট জমা দেন। আর টর্চের আলোতে অপহরণকারী কয়েকজনকে চিনতে পারেন বলে বর্ণনা করেন।
কিন্তু পরবর্তীতে বাঘাইছড়ি থানায় অপহরণকারীদের নামে মামলা দায়ের করতে গেলে বিপত্তি শুরু হয়। কারণ টর্চের আলোতে অপহরণকারীদের মধ্যে তৎকালীন কজইছড়ি সেনাক্যাম্পের কমান্ডার লেঃ মো: ফেরদৌস কায়ছার খান, ভিডিপি প্লাটুন কমান্ডার মো: নূরুল হক ও মো: সালেহ আহম্মেদকে চিনতে পেরেছেন বিষয়টি অবহিত করে থানায় মামলা দাখিল করতে গেলেও বাঘাইছড়ি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঐ চিহ্নিত আসামীদের অভিযুক্ত করে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। যার ফলে কল্পনা চাকমার বড় ভাই মামলায় অনোন্যপায় হয়ে তৎকালীন ওসি’র কথামতো চিহ্নিত আসামীদের নাম উল্লেখ না করে বিগত ১২/০৬/১৯৯৬ ইং তারিখে বাঘাইছড়ি থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
এই অপহরণ ঘটনার কারণে দেশে বিদেশে তুমুল আন্দোলন ও সমালোচনার ঝড় উঠে। এমনকি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিবাদ হয়। প্রতিবাদ আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক নিরীহ পাহাড়ি পুলিশের গুলিতে হত্যার শিকার হয়ে শহীদ হন।
একপর্যায়ে সরকার বাধ্য হয়ে ঘটনার তিনমাস পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং – স্বঃ মঃ ( রাজঃ-২- পার্বত্য-৩/৯৫ (অংশ) /৯৬৫, তারিখ: ৭/৯/১৯৯৬ ইং তারিখ মূলে কল্পনা চাকমার অপহরণের ব্যাপারে ৩ (তিন) সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করেন এবং উক্ত তদন্ত কমিশনের আহবায়ক ছিলেন জনাব মো: আব্দুল জলিল, অবসরপ্রাপ্ত মাননীয় বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এবং সদস্য ছিলেন জনাব মো: সাখাওয়াত হোসেন, তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম বিভাগ ও অধ্যাপক অনুপম সেন, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে মামলার বাদী, তার ভাই লাল বিহারী চাকমাসহ প্রায় ৮৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মামলার বাদী ও তার ভাই তাদের জবানবন্দীতে আসামীদের সনাক্ত করার বিষয়টি এবং তাদের নামসমূহ ১) তৎকালীন লেঃ মো: ফেরদৌস, ২) ভিডিপি নূরুল হক, ৩) ভিডিপি সালেহ আহম্মদসহ ১০/১২ জনের কথা উল্লেখ করা স্বত্বেও এবং অধিকাংশ সাক্ষীগণের জবানবন্দীতে সমর্থিত সাক্ষ্য থাকা স্বত্বেও তদন্ত কমিশন অপহরণের মূল হোতাদের আড়াল করে তাদের প্রতিবেদনে এই মর্মে মন্তব্য করেন যে, ” অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রমে ও সাক্ষ্য প্রমাণ পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় হউক আর অনিচ্ছায় হউক অপহৃত হয়েছে। কিন্তু কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা উপযুক্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণের অভাবে নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।” সত্যিই সেলুকাস! তদন্ত হয়, তদন্তের রিপোর্টও আসে কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়না! অপহরণ ঘটনাকে ভিন্ন প্রবাহে নিয়ে যাওয়ার মহোৎসব চলে।
kolpona
অন্যদিকে মামলার বাদী, তার ভাই লালবিহারী ও স্থানীয় সাক্ষীগণ কল্পনা চাকমার অপহরণের বিষয়ে চিহ্নিত আসামীদের নাম মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তাগণের নিকট সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করলেও মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ সুকৌশলে তাদের নাম এড়িয়ে বিগত ২১/৪/২০১০ ইং তারিখে বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের তদন্ত রিপোর্টের সাথে সাদৃশ্য রেখে একইভাবে মূল চিহ্নিত আসামীদের আড়াল করে উল্লেখিত মন্তব্য- “অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রমে ও সাক্ষ্য প্রমাণ পরীক্ষা করে ও পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছে। কিন্তু কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা উপযুক্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণের অভাবে নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি” উল্লেখ করে এবং মামলাটিতে কোন প্রকার সাক্ষ্য প্রমানাদি না থাকায় তদন্ত মূলতবী করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য (FRT) দাখিল করা হয়। যার কারণে বাদী আবেদনকারী হয়ে গত ২/৯/২০১০ ইং তারিখে রাঙ্গামাটি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নারাজি দরখাস্ত দাখিল করেন। আদালত দরখাস্ত মঞ্জুর করে মামলাটি চট্টগ্রামস্থ সিআইডি কে পুনঃ তদন্তের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
সিআইডি মামলার বাদী, তার ভাই লাল বিহারী চাকমা, অনিল বিহারী কার্বারী, ইউপি সদস্য সুনীল বিহারী চাকমা, সুশান্ত চাকমাসহ প্রায় ৭ জনকে বাঘাইছড়ি রেস্ট হাউজে নিয়ে গিয়ে কল্পনা চাকমার অপহরণের ঘটনা বিষয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।সিআইডির নিকট ঘটনার সুবিস্তৃত বর্ণনা ও আসামীদের কথা উল্লেখ করা স্বত্বেও সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তাও অত্যন্ত সুকৌশলে আসামীদের নাম এড়িয়ে এবং ঘটনার মূল রহস্য অন্যদিকে প্রবাহিত করে মামলাটিতে কোনপ্রকার সাক্ষ্য প্রমাণাদি নাই উল্লেখ করে দায়সাড়াভাবে গত ২৬/৯/২০১২ ইং তারিখে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য দাখিল করেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তদন্ত কমিশন কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদন, বাঘাইছড়ি থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির প্রতিবেদন একটি বিষয় স্বীকার করা হয়েছে যে, কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছেন। কিন্তু বাদী ও তার ভাই লাল বিহারীসহ সকল সাক্ষীগণ উক্ত আসামীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সমর্থিত সাক্ষ্য দেওয়া স্বত্তেও সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ঐ আসামীগণ ১) তৎকালীন লেঃ ফেরদৌস, ২) ভিডিপি নূরুল হক, ৩) ভিডিপি সালেহ আহম্মদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন নাই। এমনকি তাদের কোন জিজ্ঞাসাবাদ করারও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নাই।
এদিকে আমরা বিগত ১৩/১/২০১৩ ইং তারিখে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ঢাকা থেকে আমি ও দুই সিনিয়র কর্মী (সিনিয়র আইনজীবি) গিয়ে এবং রাঙ্গামাটি জজ কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট জুয়েল দেওয়ানসহ সকলে মিলে মামলায় সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীর কাছ থেকে ওকালতনামায় নিযুক্ত হয়ে মামলায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাদীর উপস্থিতিতে বিজ্ঞ রাঙ্গামাটি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে এক নারাজি দরখাস্ত দাখিল করা হয় এবং মামলায় শুনানীতে নারাজি দরখাস্তে উল্লেখিত আসামীদের গ্রেফতার পূর্বক জবানবন্দী গ্রহণ ও বিচারবিভাগীয় তদন্ত প্রার্থনা করা হয়। আদালত শুনানী অন্তে পরবর্তীতে বিগত ১৬/০১/২০১৩ ইং তারিখে এক লম্বা আদেশ দেন, আদালত তার আদেশে বলেন রাঙ্গামাটিতে জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেসীর ১০ টি আদালতে মাত্র ০৩ জন ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন।যা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। এমতাবস্থায় তদন্তে কাজে কাউকে নিয়োগ দিলে বিচার কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটবে। তাই সংবাদ দাতা পক্ষের নারাজির আবেদনে বর্ণিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন আপাতত: বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
নিম্নের নির্দেশনার আলোকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য অত্র রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া গেল।
নির্দেশনা হলঃ-
১) ভিকটিম কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো।
২) মামলার ঘটনার সাক্ষীদের ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ পূর্বক তাদের জবানবন্দী ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা।
৩) লেঃ ফেরদৌস, ভি. ডি. পি নূরুল হক ও ভি.ডি.পি সালেহ আহম্মদকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা।
৪) সর্বোপরি ঘটনার প্রকৃত তথ্য ও সঠিক রহস্য উদঘাটন করা।
বিধি অনুসরণ করে উপরোক্ত নির্দেশনার আলোকে পুলিশ সুপার, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্বয়ং তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
আগামী ২০/০৩/২০১৩ ইং তারিখ তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য।
তৎপরবর্তী কল্পনা চাকমার অপহরণ মামলাতে এভাবে আদালতে ২৫ টির বেশি ধার্য্য তারিখ চলে গেছে। কিন্তু মামলায় কোন অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন অদ্য পর্যন্ত আসেনি। আদৌ এ মামলায় কোন সুস্পষ্ট রিপোর্ট আসবে কিনা প্রশ্ন ও সন্দেহ থেকে যায়। আদালতে মামলাটিতে আগামী ১২/৭/২০১৬ ইং তারিখ দিন ধার্য্য রয়েছে রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপার কর্তৃক অধিকতর তদন্ত রিপোর্টের জন্য।
সবিশেষ বলা যায় দীর্ঘ বিশ বছরে কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনাতে তদন্ত দলগুলো মামলায় এবং কল্পনা চাকমার হদিস বিষয়ে আশার আলো দেখাতে পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়েছেন। মামলাটি নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর এবং ভিকটিম কল্পনা চাকমার অদ্যাবধি কোন খোঁজ না পাওয়া এবং কোথায় আছে এর কোন উত্তর না পাওয়ায় ভিকটিমের পরিবার চরমভাবে আশাহীন ও বিচারহীনতায় ভূগতেছে। রাষ্ট্র এই ঘটনার বিচারে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।
এমনকি রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে ভিকটিমের দুই ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের আদেশ চাওয়া হয় এই বলে যে, অদূর ভবিষ্যতে যদি কল্পনা চাকমাকে পাওয়া যায় তবে ডিএনএ মিলানোর মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। বাদীপক্ষ এ বিষয়টি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিকটিমপক্ষকে চরম হয়রানি বলে দাবি করেন। আজ দেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মীরা, সর্বোপরি বিশ্ববাসী এই অপহরণ ঘটনার জন্য রাষ্ট্রের কাছে যথাযথভাবে ন্যায়বিচার দাবি করে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থাও আজ কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনার জন্য বিচার চাচ্ছে। তারা তাদের প্ল্যাকার্ড এর মাধ্যমে কল্পনা চাকমার অপহরণের ২০ বছর, কল্পনা চাকমা কোথায়?‪#‎myunseensister‬ বলে সারা বিশ্বে প্রতিবাদ মুখর হয়ে জানান দিচ্ছে।
এমতবস্থায় এই ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
জানা নেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর কত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলে রাষ্ট্র আমাদের বিচার আকাঙ্খা পূর্ণ করবে।
কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয়েছ সত্য বটে, কিন্তু তার যে অধিকার আদায়ে লড়াই সংগ্রামের চেতনা কখনো মৃত্যু হবে না। অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বেঁচে থাকুক আর অন্যায় নিপীড়ন জুলুমের কন্ঠ স্তব্দ হোক। হয়তো সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে কল্পনার স্বপ্ন একদিন পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে, সেদিনের অপেক্ষায়…….।
মেকসুয়েল চাকমা; আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
আইন ও সালিশ কেন্দ্র; স্টাফ লয়্যার

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *