আদিবাসী ও বাজেট বিষয়ক সংলাপঃ প্রফেসর ড. মেসবাহ কামাল

১৮ মে ২০১৬ সিরডাপ আর্ন্তজাতিক কনফারেন্স অডিটোরিয়াম
বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বলে আমরা শুনতে পাচ্ছি। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আরো জানা যায় ১৯৯১ সালে দারিদ্রের হার যেখানে ছিল ৫৬.৭ শতাংশ, বর্তমানে তা ২২.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্ব ব্যাংকের মান অনুযায়ী বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। আশাবাদি হয়ে উঠি এই মনে করে যে দেশের সকল মানুষের জীবনে এই প্রভাব পড়ছে, সকল মানুষ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই প্রেক্ষাপটে যদি আমরা আদিবাসীদের দিকে তাকাই তাহলে যা দেখা যায় যে, দীর্ঘকাল ধরে আদিবাসী জীবনে উন্নয়নের প্রতিফলন নেই। কোন জনগোষ্ঠির উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ বিষয়টি সেই জনগোষ্ঠির উন্নয়নের প্রতি সরকারের স্বদিচ্ছার বিষয়টি প্রকাশ পায়। আদিবাসীদের উন্নয়নের ধারায় আনতে হলে জাতীয় বাজেটে পৃথকভাবে বরাদ্দ প্রয়োজন এবং তাদের জন্য সেই বরাদ্দ হতে হবে যথেষ্ট পরিমাণে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দ হয়ে থাকে। উল্লেখ্য গতবছর সরকার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী, ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, দলিত, হরিজন, হিজরা, ভবঘুরে ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম ইত্যাদি হাতে নিয়েছেন। গত বাজেটে তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৩৩ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা। এর বাইরে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি আলাদা দেওয়া হয়েছে। জেন্ডার বাজেটের বিষয়টি ছিল । যা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

‘২০১০ থেকে ২০১৪ সালে বিগত বছরগুলোতে জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী / ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের জন্য ছোট্ট পৃথক অনুচ্ছেদ থাকলেও গতবছরের বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসীদের স্থান হয়নি। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার ৩৭ নং পৃষ্ঠায় একটি লাইন স্থান পেয়েছে এভাবে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও তাঁদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র ধরে রাখার লক্ষ্যে এ অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেব।” সমতলের আদিবাসী, যারা আদিবাসীদের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ এবং যাদের সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ, তাদের সম্পর্কে একটি লাইনও গত বাজেট বক্তৃতায় ছিল না। আদিবাসীদের জন্য গত বছরের বাজেট বক্তৃতা সকলকে হতাশ করেছে।
২০১৪ সালের ১৬ জুন বাজেট অধিবেশন চলাকালীন সময়ে ‘আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস’ সংবাদ সম্মেলন, আলোচনা সভা এবং মতবিনিময় করে সরকারকে অনুরোধ করেছিলো বাজেট সংশোধন ও সংযোজন করে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে। আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস-এর আহবায়ক জনাব ফজলে হোসেন বাদশা এমপি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু বাজেটে তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়নি। তবে ২০১৫ সালের বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে ‘আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস’এর পক্ষ থেকে গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এই সভায় বাজেট বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয় এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানানো হয়। সেই সাথে সমতল আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য একটি আলাদা বিভাগ খুলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। আরো বলা হয় আদিবাসীদের জনসংখ্যানুপাতে বরাদ্দ দিতে হবে এবং আগামী বাজেটে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। ২০১৫-১৬ বাজেট অধিবেশনে কমপক্ষে ২২ জন ককাস সদস্য জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য বাজেটে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস-এর ভূমিকা উল্লেখ্যযোগ্য বলে আমরা মনে করি।

আদিবাসী জনগণ ও বাজেট
গত ২০১৫-১৬ সালে বাজেটের আকার ছিল (২ লক্ষ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি) প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা। চলতি অর্থ বছরে ২০১৬-১৭ বছরে বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা। গত বছরের অভিজ্ঞতা হলো বাজেটের ১৩ ভলিউমে আদিবাসীদের স্থান প্রায় ছিল না বললেই চলে। এবার আমরা আশা করছি আদিবাসীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকবে এবং বাজেট বক্তৃতাতেও আদিবাসী বিষয়ে একটি অনুচ্ছেদ/প্যারাগ্রাফ থাকবে যা অতীতে ছিল, গত বছর ২০১৫-১৬ ছিলনা যেটা অত্যন্ত দু:খজনক। আদিবাসী জনসংখ্যা ২০ লক্ষ ধরলে বা জনসংখ্যানুপাতে বিচার করলে সমতলের আদিবাসীদের জন্য গত বছর বাজেটে কমপক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল। আদিবাসী জনসংখ্যা সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় ২%। শতকরা ২ দিয়ে ২৫০,৫০৬ কোটিকে ভাগ করলে, আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা। সেখানে সমতলের আদিবাসীদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা” বাবদ ১৬ কোটি টাকা ছিল যা পরবর্তীতে বেড়েছে। তবে এ বরাদ্দ বাজেটে উল্লেখিত হয়নি, তবে খাতটি আছে। আমরা উল্লেখ করেছিলাম গত বাজেটে সমতলের ২০ লক্ষ আদিবাসীর জন্য ১৬ কোটি টাকা, প্রতিজনের ভাগে বরাদ্দ বছরে ৮০ টাকা। গত বাজেটে রুমা উপজেলায় বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ১ কোটি ৮৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ ছিল। এ ছাড়া সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মঞ্জুরী থেকে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের জন্য পাঁচতলা অফিস-কাম-কম্যুনিটি হল নির্মানের জন্য বরাদ্দ ছিল যার পরিমাণ ৩ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা। তা ছাড়া হালুয়াঘাট, দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমীর জন্য সব মিলিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছিল ১০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে এ বছর ২০১৬ সালে তিন পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য ঢাকাস্থ বেইলি রোডে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স নির্মাণে ১০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যা সর্ব মহলে প্রশংসা পেয়েছে।
আদিবাসী জনগণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বঞ্চিত, দরিদ্র ও অনগ্রসর অংশের মধ্যে অন্যতম। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের জনসাধারণের প্রায় অর্ধেক দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করেন। তাদের মাথাপিছু আয়ও অনেক কম। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতল উভয় অঞ্চলের আদিবাসীদের সিংহভাগ এখনও জীবিকা নির্বাহের জন্য জুম ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। আদিবাসীদের জন্য উন্নয়নমূলক বরাদ্দ মূলত সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন একটি কর্মসূচির মাধ্যমে দেওয়া হয়। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমগ্র সমতল অঞ্চলের প্রায় ৪৮টি জেলার আদিবাসীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিশেষ কার্যাদি বিভাগ হতে এ বরাদ্দ প্রদান করা হয়। বাজেটের আকার বাড়ছে প্রতি বছর, যার ব্যয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতওয়ারী হয়ে থাকে। এটি সহজবোধ্য যে, মূল বাজেট হতে আদিবাসীদের উন্নয়নে সরাসরি বরাদ্দ পাওয়ার জটিলতা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের জন্য ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট অপ্রতুল। আবার সমতলের প্রায় ২০ লক্ষ আদিবাসীদের জন্য বাজেট বরাদ্দে সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক থোক বরাদ্দ চলছে যা উল্লেখ করেছি।
এখানে বিগত বছরের বাজেট পর্যালোচনা করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে যথাক্রমে ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ৩২৬ কোটি টাকা, ২০১২-২০১৩ সালের অর্থ বছরে ৪১৯ কোটি টাকা এবং ২০১৩-২০১৪ সালের অর্থবছরে ৪৯৯ কোটি বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। (২০১৪-২০১৫) পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৭৩৫ কোটি টাকা। সমতলের আদিবাসীদের জন্য ২০১১-১২ অর্থ বছরে মাত্র ১৫ কোটি, পরের বছর ১৭ কোটি এবং ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ১৬ কোটি টাকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” বরাদ্দ ছিল।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য আদিবাসীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করে বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ পরিমাণ করা জরুরী। ১৯৯১ সালের সরকারি আদমশুমারীতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষ, ২০০১ সালের আদমশুমারীতে ১৪ লক্ষ এবং ২০১১ সালের আদমশুমারীতে ১৭ লক্ষ ছিল। আদিবাসীদর মতে, এ সংখ্যা আরো বেশি। যা কমপক্ষে ৩০ লক্ষ।

বিগত ৫ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ নিম্নরূপঃ
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক বরাদ্দ ২০০৯-১০ হতে ২০১৫-১৬ (অংকসমূহ কোটি টাকায়)
badget

সমতলের আদিবাসীদের জন্য সরকারী বরাদ্দঃ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের Development Assistance for Special Area (except CHT) বা “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী উল্লেখকৃত যে, এই কর্মসূচির কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে শুরু করা হয়েছে যা চলতি অর্থ বছর পর্যন্ত চলমান আছে। দেশের বিভিন্ন জেলার সমতল ভূমিতে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। কর্মসূচিটি সরকারী অর্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কর্মসূচির অনুকূলে বিগত তিনটি অর্থ বছরে (২০১০-২০১৩) মোট ৪৪.০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

‘বিগত তিনটি অর্থ বছরে ১৬০টি উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের (যথাঃ গরু পালন প্রকল্প, মৎস্য চাষ প্রকল্প, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, পানের বরজ, হস্ত শিল্প, রিক্সা-ভ্যান চালানো প্রকল্প, পরিবহন প্রকল্প, নার্সারী সৃজন প্রকল্প, পোল্ট্রি প্রকল্প, তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, জুতা তৈরি প্রকল্প, চিংড়ি চাষ প্রকল্প ইত্যাদি) ১৬০টি বৃহৎ আকারের আয়বর্ধনমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া উক্ত প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থে প্রায় ১৮০টি উপজেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা বৃত্তি, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সামগ্রী ক্রয়, টিউবওয়েল ও স্যানিটারী ল্যাট্রিন স্থাপন, কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, আসবাবপত্র সরবরাহ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ/সংস্কার, বিদ্যালয় সংস্কার, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমিতি অফিস সংস্কার ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরের বরাদ্দকৃত অর্থ হতে বুয়েট/ইঞ্জিনিয়ারিং/মেডিকেল/ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়/জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ১১৭ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য এককালীন শিক্ষা বৃত্তি প্রদানের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে কর্মসূচির আওতায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। উক্ত বরাদ্দকৃত অর্থে শিক্ষাবৃত্তি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি প্রায় ১০০টি উপজেলায় ১০০টি সরাসরি আয়বর্ধনমূলক প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। গত ৩টি অর্থ বছরে কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত অর্থ ও গৃহীত আয়বর্ধনমূলক প্রকল্প ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে প্রায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০ হাজার আদিবাসীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।’

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচিতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে সমতলের আদিবাসীদের জন্য সরকারী বরাদ্দ প্রদান শুরু হয়। বর্তমান অর্থ বছরে এর পরিমাণ ২০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সমতলের প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীদের জন্য মাত্র ২০ কোটি টাকা বার্ষিক বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত কম। আবার এর বন্টন প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে নানা জটিলতা। আগে যেখানে মাত্র ২৮টি জেলার ৪১ টি উপজেলার আদিবাসীদের এ সহায়তা প্রদান করা হতো এখন সেখানে ৪৮টি জেলার ২১৬টি আদিবাসী অধ্যুষিত উপজেলা যুক্ত হয়েছে। যার ফলে বলা যায়, এ কর্মসূচির আওতায় আদিবাসী অধ্যুষিত উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে যেমন অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ আদিবাসী জনসংখ্যা অনুযায়ী খুবই কম আবার অন্যদিকে, প্রতি বছর সবগুলো উপজেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে একসাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ এ বরাদ্দ প্রদান করা হয় না। তাই কোনো কোনো উপজেলার আদিবাসীদের এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সংশ্লিষ্ট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে এ অর্থ বন্টন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে এবং উপজেলার বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় কয়েকজন আদিবাসী প্রতিনিধিসহ একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে এ অর্থ বন্টনের কাজ করা হয়। সমতলের আদিবাসী জনগণ এ অর্থ বরাদ্দের বন্টন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত নন। সেই সাথে উল্লেখ্য এই অর্থ বন্টনের স্বচ্ছতা নিয়ে জটিলতা তৈরী হয়েছে।

উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি মানুষকে পেতে হবে। তাই আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে পৃথক ও বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। আদিবাসীদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষা এবং চাকুরির নিশ্চয়তাসহ আত্মকর্ম সংস্থান-এর জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে।
সংসদীয় ককাসের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরছিঃ
১. জাতীয় বাজেটে পৃথক অনুচ্ছেদ যুক্ত করে আদিবাসী জনগণের উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা।
২. বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী বিষয়ে বিবরণী রাখা জরুরী।
৩. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি। মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমেই সাধারণত বাজেট বরাদ্দ হয়। সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য যেহেতু কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নেই, সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই থোক বরাদ্দ পরিচালনার জন্য সমতলের আদিবাসীদের সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি বা বোর্ড গঠন করা যেতে পারে।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহের বাজেট বৃদ্ধি করা জরুরী।
৫. সকল মন্ত্রণালয়ের /বিভাগের বাজেটে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা এবং বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা ।
৬. আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমীগুলোতে আদিবাসী সংস্কৃতি উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
৭. উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসীদের আত্ম-কর্ম সংস্থানের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।
সমতলের আদিবাসীদের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দ ২০০৯-১০ হতে ২০১৩-১৪

badget 2

সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি জোরালো ভাবে তুলছি। গত বছরও এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় না হচ্ছে, সেই সময় পর্যন্ত এই বিষয় দেখার জন্য একটি আলাদা বিভাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত করার বিষয়ে গতবার যে প্রস্তাব এসেছিল সেটা কার্যকর করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যে থোক বরাদ্দ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” চলছে, সেখানে সমতলের আদিবাসীদের প্রকৃতপক্ষে কোনো অংশগ্রহণ নেই। সেই প্রেক্ষাপটে সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টিও পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত করার কথা পরীক্ষামূলকভাবে দেখা যেতে পারে। এখানে একজন আদিবাসী সচিব, যুগ্ম-সচিব মর্যাদার কর্মকর্তা বিষয়টি তত্বাবধান করতে পারেন।
শেষ কথা হলো জাতীয় বাজেটে পৃথক অনুচ্ছেদ যুক্ত করে জনসংখ্যানুপাতে আদিবাসী জনগণের উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। ২০১৬-১৭ সালের অর্থ বছরের বাজেটে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর বাজেট বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের থোক বরাদ্দ পরিচালনার জন্য আদিবাসীদের সম্বনয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতে হবে। আদিবাসী বাজেট নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা জরুরী। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য- উপাত্ত নিয়ে পলিসি লেভেলে এ্যাডভোকেসী করে আদিবাসীদের জীবনমান বাড়ানোর বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

প্রফেসর ড.মেসবাহ কামাল
সমন্বয়ক, টেকনিক্যাল কমিটি, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস এবং চেয়ারপার্সন, গবেষণা ও উন্নয়ন কালেকটিভ

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *