ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের “নবীন বরণ ও বিদায় সংবর্ধনা- ২০১৭”

গত ২৮ জুলাই, ২০১৭ইং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের যৌথ উদ্যোগে“জুমপাহাড়ের স্বপ্নবুকে, শিক্ষার মশাল হাতে,নবীন প্রবীণ এসো মিলি শেকড়ের টানে” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের জগন্নাথ হলস্থ অক্টোবরটিভিরুমে“নবীন বরণ ও বিদায় সংবর্ধনা- ২০১৭” অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
উক্ত অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক ভাবে বরণের পাশাপাশি ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া প্রবীণ শিক্ষার্থীদেরকে ও আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় জানানো হয়। এর সাথে সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক সাথে সর্বোচ্চ সংখ্যক নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ ও প্রবীণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন করল পাহাড়ীছাত্র পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের অন্যতম মেধাবী ছাত্র অশোক চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি এ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের মাননীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া । বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রী দীপায়ন খীসা, সদস্য, তথ্য ও প্রচার বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি,পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক সুমন মারমা, হিলউইমেন্স ফেডারেশন, ঢাকা মহানগর শাখার সংগ্রামী সভাপতি চন্দ্র্রা ত্রিপুরা প্রমুখ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্য বৃন্দ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগ্রামী সভাপতি অমর শান্তি চাকমা।
জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উক্ত সংগঠনের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক লিটন চাকমা। স্বাগত বক্তব্যের পরে যথাক্রমে নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ও প্রবীণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অভিনন্দন পত্র ও বিদায়িমান পত্র পাঠকরে শোনান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী জয়শ্রী চাকমা ও অনন্যা তঞ্চঙ্গ্যা। এরপরে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে ১ম স্থান পাওয়া মেধাবী শিক্ষার্থী প্রকট চাকমা কে তাঁর কৃতিত্বের জন্য ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। নবীনদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন অন্তর ত্রিপুরা এবং প্রবীণদের পক্ষ থেকে বিদায়ী বক্তব্য রাখেন মাস্টার্সে প্রথম শ্রেনীতে ১ম স্থান অধিকার করা বিদায়ী মেধাবী শিক্ষার্থী প্রকট চাকমা।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হিলউইমেন্স ফেডারেশন, ঢাকা মহানগরের সভাপতি চন্দ্রা ত্রিপুরা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, প্রতিটি নবীন জুম্ম শিক্ষার্থীর অবশ্যই জুম পাহাড়ের স্বপ্ন বুকে ধারণ করতে হবে। শিক্ষার মশাল হাতে নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে। অন্ধকারাচ্ছন্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে আলো ফিরিয়ে দিতে তিনি বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ারও আহ্বান জানান।
পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুমন মারমা বলেন, ছাত্রের প্রধান কাজ অধ্যয়নকরা। অধ্যয়নেরপাশাপাশি শেকড়ের প্রতি টানের চেতনার জায়গা থেকে, দায়িত্ব বোধের জায়গা থেকে সকলকে একত্রিত করে রাখাও অত্যন্ত জরুরী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের মধ্যেকার পারস্পারিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভূমিকা অনস্বীকার্য বলেও তিনি অভিহিত করেন। সেই সাথে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার আদায়ের চলমান আন্দোলনে সবাইকে অংশ গ্রহন করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগের সদস্য, দীপায়ন খীসা বলেন, পাহাড় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুম্ম শিক্ষার্থীরা অনেক আগ থেকেই পড়ার সুযোগ পেতো। কিন্তু সে সময়ে আজকের মত এত অধিক সংখ্যাক শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেতো না।তিনি বলেন,পাবর্ত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটি ও তপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিষ্ঠা কালীন সময় থেকে বর্তমান অবধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুম্ম শিক্ষার্থীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। তিনি ভবিষ্যতে আরো অধিক সংখ্যক জুম্ম শিক্ষার্থী কিভাবে ভর্তির সুযোগ পাবে সে বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখাও বর্তমান ছাত্রদের দায়িত্ব বলে মনে করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশাল জায়গা, এখানে এসে কেউ নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না। যেভাবে পারেন নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্ঠা করেন এবং অন্যকে গড়ে তোলার ব্যাপারে সাহায্য করবেন জাতি, সমাজকে এগিয়ে নিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুম্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার পারস্পারিক ঐক্যকে প্রশংসা করেন এবং পড়াশুনা, খেলাধুলায় তাদের অনস্বীকার্য অবদানের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে অমর শান্তি চাকমা বলেন, জুম পাহাড়ের স্বপ্ন মানে এম এন লারমার স্বপ্ন, একটি শ্রেণিহীন শোষন হীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। সে স্বপ্নকে ধারণ করে নবীন শিক্ষার্থীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য্য ফিরিয়ে আনবে। স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জাতি, সমাজ তথা দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুম্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার পারস্পারিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধিতে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরেন।
সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয় । সাংস্কৃতিক পর্বে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের গান, কবিতা আবৃতি ও নাচের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *