লংগদুতে আবারও শাসকশ্রেণির ভয়ানক রূপ, দ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হোক তরুণ প্রজন্মঃ বাচ্চু চাকমা

২ জুন ২০১৭ এর লংগদুর ঘটনায় অতীতের লোমহর্ষক সকল ঘটনাবলী হঠাৎ মনে পড়ে গেল। লংগদুর পাহাড়িদের বাড়িঘরে এই আগুন স্বাভাবিক আগুন নয়। এটি মানব সৃষ্ট আগুন। মানুষরূপী একদল নরপিশাচ পাহাড়িদের ঘরে আগুন দিয়েছে। সেদিন সকালে ফেইসবুক খোলার পর টাইম লাইনের শিরোনাম লংগদুতে আগুন জ্বলছে। আমি তখন বাঘাইছড়িতে সাংগঠনিক কাজে অবস্থান করছিলাম। আকাশের কাল মেঘের ঘনঘটা, প্রাকৃতিক অবস্থা তেমন ভাল নয়। প্রাকৃতিক বৈরিতার মধ্যে দিয়ে কয়েক দিন ধরে ঝিরঝিরে হালকা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বাঘাইছড়ির ঐ প্রান্তের পাহাড় থেকে শুভাকাংখীদের ফোন আসতে লাগল। জানতে চাইলো লংগদুর কি অবস্থা? তখনও ঝাপসা-ঝাপসা, সঠিক খবরা-খবর সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। সাথে সাথে লংগদুতে আমার প্রিয় সংগঠনের কর্মী ও শুভাকাংখীদের ফোন করলাম। খবর আসলো লংগদুর অবস্থা খুবই খারাপ, থমথমে পরিস্থিতি। সেটেলার বাঙালিরা পাহাড়িদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। বস্তুত সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় সেটেলার বাঙালিরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে। ফিরে যাই ২৮ বছর আগে ১৯৮৯ সালে ৪ঠা মে লংগদুর বুকে ঘটে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম গণহত্যাকান্ডে। সেই লংগদুর গণহত্যা আমাদের তরুণ ছাত্র সমাজকে এখনও ব্যথিত করে-যন্ত্রণা দেয়, অন্তরকে বিদ্ধ করে। সেদিন বেদনাকর নিষ্ঠুর ও অমানুষিক হামলা, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যাকান্ড চালিয়ে শাসকশ্রেণি নিজেকে যেমনি কলংকিত করেছিল, তেমনি জুম্ম জাতির ইতিহাসের পৃষ্ঠাকে আরও রক্তাক্ত ও অগ্নিময় করে তুলেছিল।
২৮ বছর আগে লংগদুর আগুন জন্ম দিয়েছে একটি আপোষহীন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের। লংগদুর রক্তই পাহাড়ী ছাত্র সমাজকে প্রতিরোধের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নিজেদের জীবনকে সমর্পিত করতে অনুপ্রাণিত করেছে। পার্বত্যা লের শত শত হাজারো ছাত্র সমাজের তারুণ্যেকে বিদ্রোহী করে তুলেছে। লংগদুর রক্তই তৎকালীন সময়ের সচেতন তরুণ ছাত্র সমাজকে নাড়া দিয়ে যায়। প্রতিরোধের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তরুণ ছাত্র সমাজ সঠিক দিশা খুঁজে পেয়েছে। লংগদুর রক্ত গোটা জুম্ম ছাত্র সমাজের ধমনীতে কম্পন ধরিয়েছিল। এখনও সেই কম্পন তারুণ্যের ধমনীতে নদীর ¯স্রোতের ন্যায় বহমান। সেই লংগদুর আগুন পার্বত্যা লের সমগ্র তরুণ ছাত্র সমাজকে যে বিদ্রোহী করে তুলেছে সেই বিদ্রোহের আগুন এখনও নিভে যায়নি। দীর্ঘ ২৮ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক রক্ত ঝড়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ ও হত্যার অহরহ অমানবিক ঘটনাবলীর জন্ম দিয়েছে শাসকশ্রেণী। বারে বারে এই রাষ্ট্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবন আমাদের নয়। সেকারণে এই ঘটনাবলী বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আমাদের এই প্রজন্মের ছাত্র তরুণ সমাজ আবারও দেখল লংগদু জ্বলছে। চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিহাসের পাতা উল্টাতে গিয়ে মনের ভেতর থেকে এক ধাক্কা অসহ্য যন্ত্রণা, বেদনাকর দূর্বিসহ জীবনের বাস্তব চিত্র আমার চোখের সামনে ফুটে উঠেছে।
পাহাড়ের বুকে সেই সময় জুম্ম জনগণের উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরতম নির্যাতন চালিয়েছে শাসকশ্রেণী। গুচ্ছগ্রাম, শান্তি গ্রাম, আদর্শ গ্রাম নাম দিয়ে জুম্ম জনগণকে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো করা হতো। চারিদিকে সেনা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হতো। সেনাবাহিনীর অনুমতি ছাড়া সেনা বেষ্টনী থেকে কেউ কোথাও বের হতে পারতো না। বন্দী নিবাসে পাহাড়ের মানুষের জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে। জুম্ম জাতির সেই কালো অধ্যায়গুলোর কথা তরুণ ছাত্র ও যুব সমাজ কখনো ভুলে থাকতে পারে না। হে তরুণ বিশেষ করে জুম্ম ছাত্র সমাজ আবারো তোমার উদ্দেশ্যে এই লেখাটি। ৬০ দশকে মহান নেতার কন্ঠে জুম্ম জাতির চেতনাবোধ জাগ্রত করার ডাক এসেছে। সেই সাথে সাথে ‘কাপ্তাই বাঁধ জুম্ম জাতির মরণ ফাঁদ’ এটি অন্তর দিয়ে উপলদ্ধি করার পর তরুণ ছাত্র ও যুব সমাজকে সংগঠিত করে মানব সৃষ্ট কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের এক পর্যায়ে প্রিয়নেতাকে গ্রেফতার করে জেলে অন্তরীণ করা হলো, পাকিস্তান সরকার নির্লজ্জভাবে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করলো। তখন জুম্ম জনগণের উপর নেমে এলো মহাবিপর্যয়, যা ভাষায় প্রকাশ করার নয়! ৭০ দশকে মহান নেতার নেতৃত্বে সমগ্র জুম্ম সমাজ সংগঠিত হলো, প্রতিষ্ঠা করলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের প্রাণের অন্যতম রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। আবারো মহান নেতার ডাকে সাড়া দিয়ে বিজাতীয় শাসন-শোষণ থেকে মুক্তিলাভের আশায় সাত পাঁচ না ভেবে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে অগণিত জুম্ম ছাত্র ও তরুণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সামন্তীয় সমাজের চিন্তাধারা থেকে মানুষগুলোকে জুম্ম জাতীয় মুক্তির চেতনায় জাগরণের গান শুনিয়ে পার্বত্যা লের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে সেই সময়ের তরুণ সমাজ।
অতীতের ন্যায় এবারেও আগুনের স্ফূলিঙ্গ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ুক পার্বত্যাঞ্চলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। সেই স্ফূলিঙ্গ থেকে দাবানল সৃষ্টি করে পার্বত্যা লের সকল প্রকার প্রতিক্রিয়াশীল, সুবিধাবাদী ও চুক্তি বিরোধী চক্রকে চিরতরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানচিত্র থেকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত করতে হবে। সেই মহান কাজটি সম্পন্ন করার প্রয়াস অব্যাহত রাখুক আমাদের বর্তমান তরুণ ছাত্র ও যুব সমাজ। অতীতের সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, ঘৃণা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ তরুণ সমাজের অন্তরে পুঁঞ্জিভূত করে মহাবিস্ফোরণ ঘটিয়ে আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ করে শাসকগোষ্ঠীর সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন-নিপীড়ণের স্টিম রোলার চিরতরে স্তব্ধ করতে হবে। শাসকশ্রেণি রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত হাতিয়ার আমাদের জুম্ম জাতির উপর নিক্ষেপ করছে। উৎপীড়ক শাসকশ্রেণি প্রতিটি ক্ষেত্রে নগ্ন থাবা বিস্তার করে চলেছে। জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার আমরা চারিদিকে, ন্যায় বিচার আমরা কোথাও পাই না। হয়রানি ও বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হয়ে জুম্ম জনগণ সর্বোচ্চ হারাচ্ছে। অনন্তকাল ধরে বসবাসরত আমাদের পূর্ব পুরুষদের ভিটামাটি প্রতিদিন বেদখল করে নেওয়া হচ্ছে। শাসকশ্রেণির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নীরবে প্রতিদিন বেআইনীভাবে বহিরাগত বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। সেই বহিরাগত বাঙালিদের দ্বারাই সংগঠিত হয়েছে লংগদুর বুকে সাম্প্রদায়িক হামলা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও মানবতা বিরোধী সকল কর্মকান্ড।
লংগদুর গৃহহীন মানুষের জীবন সরেজমিনে গিয়ে দেখে আসলাম। শুধু দেখে আসিনি বেদনাকর জীবনের সাথী হতে গিয়েছিলাম। শুনেছি প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় সেটেলার বাঙালিদের তান্ডবলীলার হিংস্রতার গল্প। এতই অমানবিক আচরণ করেছে তারা যা দানবরূপী হিংস্র পশুদেরকেও হার মানায়। বাত্যাপাড়া, মানিকজোড়ছড়া ও তিনটিলা এই তিনটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায় সেটেলার বাঙালিরা পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে সব শেষ করে দিয়েছে। ঘরে তোলা ফসল, ধান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। লোকজন এখনও বাড়িঘরে ফিরতে পারেনি, খোলা আকাশের নিচে তাদের জীবন। সরকারের পক্ষ থেকে বাড়ি নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তার কোন কার্যকর পদক্ষেপ এখনও দেখা যায়নি। নতুন করে বাড়ি নির্মাণের জন্য একটা খুঁটিও চোখে পড়েনি। আশেপাশে অনেক অস্থায়ী পুলিশ ও বিজিবি ফাঁড়ি, সেনাবাহিনীর টহলটিম ও তাদের আনাগোনা সবই আছে। কিন্তু গৃহহারা লংগদুর আদিবাসীরা নিরাপদ মনে করে না। লংগদু ঘরহারা মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও যন্ত্রণা দেখলে আবেগাপ্লুত না হয়ে পারা যায় না। তাদের সারা জীবনের সি ত সম্পত্তি, বাড়িঘর হারিয়ে এখন নিঃস্ব ও সর্বহারা। এই ক্ষতি কোন দিন পূরণ হবে না। তিনটি আদিবাসী গ্রামে ২১৭টি বাড়িঘর, ১৯টি দোকান সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ছাই করে দেয়া হয় এবং ৮৮টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। সেটেলার বাঙালিরা পেট্রোল ও কেরোসিন ঢেলে একের পর এক অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। সেটেলার বাঙালিরা এক ধরনের গ্যাসের বোতলও ব্যবহার করেছে, যার কারণে পাকা ও আধা-পাকা ঘরবাড়িতে দ্রুত আগুন লেগে যায় এবং সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বর্ষাকালে গৃহহারা মানুষের জীবন যে কত দূর্বিসহ হতে পারে তা ভুক্তভোগী নাহলে অনুভব করা যায় না। লংগদুর সাম্প্রদায়িক হামলা, লুটপাট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এর প্রতিবাদে ভারতের বিহারের বুদ্ধগয়ায় ৫ জুন ২০১৭, আগরতলায় ৮ জুন ২০১৭, কানাডায় ১১ জুন ২০১৭, অস্ট্রেলিয়ায় ১২ জুন ২০১৭, ফ্রান্সের প্যারিসে ১৫-১৬ জুন ২০১৭, ২৯ জুন ২০১৭ আমেরিকার ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের সামনে প্রতিবাদ হয়েছে এবং এছাড়াও মায়ানমার, জাপান, ভারতের দিল্লীসহ অনেক দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। সেই প্রতিবাদ থেকে বলা হয়েছে, লংগদুর সন্ত্রাস, পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, বহুজনকে গৃহহীন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নতুন করে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

২ জুন ২০১৭ লংগদুতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটার সাথে সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাজেয় বাংলা থেকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ব্যানারে ঢাকার জুম্ম শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে শাহবাগে সমাবেশ করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও ২৯৯ নং পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য শ্রী উষাতন তালুকদার ৫ জুন ২০১৭ দশম জাতীয় সংসদের ১৬তম অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে লংগদুতে পাহাড়িদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত বলে অভিযোগ করে এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। লংগদুতে সেনা-পুলিশের ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নেতৃত্বে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক জুম্মদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সাম্প্রদায়িক হামলার উপর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে লংগদু হামলা ও অগ্নিসংযোগের সাথে জড়িত ব্যক্তি, নিরাপত্তা ও আইন-প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা, ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের বাড়ি নির্মাণ ও কমপক্ষে ৬ মাসের রেশনসহ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন করা এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চুক্তি মোতাবেক সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ও অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহার করা, সেটেলার বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন প্রদান করার দাবিসহ ৭ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।

উল্লেখ্য যে, যেই হাত দিয়ে জুম্মদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হল, সেই হাতে জুম্মরা ত্রাণ নেবে না, সরকারের ত্রাণ তারা গ্রহণ করবে না-বলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা জানিয়ে দেয়। অনেক ক্ষোভ আর তিক্ততা থেকেই লংগদুর অসহায় জুম্মরা সরকারের দেওয়া ত্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলছে। ইতিমধ্যে জেলা পরিষদের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাহাড়িদের কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়েছে। সেই দাবিগুলো যথাযথ কার্যকর না করা পর্যন্ত সরকার দলীয় কারো হাত থেকে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কোন ত্রাণ ঘরহারা লংগদুর পাহাড়িরা গ্রহণ করবে না বলে মত প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য যে, লংগদু সাম্প্রদায়িক হামলার সাথে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতৃত্ব কর্তৃক সরাসরি জড়িত থাকা ও নেতৃত্ব দানের অভিযোগ ইতোমধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও জানা গেছে যে, সুধাসিন্দু খীসা ও তাতিন্দ্রলাল চাকমা(পেলে)-র নেতৃত্বাধীন সংস্কারপন্থী দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিষ্কার করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদারের ত্রাণ ঘরহারা পাহাড়িদের গ্রহণ করতে হবে। তাহলে কি সংস্কারপন্থীরা এখন দীপংকর বাবুর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে! ভুক্তভোগী জনগণের মনের বেদনা ও বাস্তবতার কি তাদের কাছে কোন মূল্য নেই? বস্তুত তারা এখন সরকারী দলের স্থানীয় কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর ফাঁদে পড়ে শাসকগোষ্ঠীর ৫ম বাহিনীর ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে চুক্তি বিরোধী ও জুম্মস্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম অব্যাহত রাখার গভীর ষড়যন্ত্রেই মেতে উঠেছে। লংগদুর পুড়ে যাওয়া ঘরহারা জুম্ম জনগণের কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট হল, ১/১১ এর সময় ছিটকে পড়া প্রতিক্রিয়াশীল, সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালিপ্সুর অন্যতম ভূঁইফোর সংগঠন সংস্কারপন্থীর আসল চেহারা কতটা ভয়ানক। আর কতটুকু সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও র্নিলজ্জ হলে জুম্মস্বার্থ বিরোধী এমন কাজে লিপ্ত হওয়া যায়! কীভাবে তারা ঘরহারা মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবির বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারে! অবশ্য তাদের কিইবা করার আছে, প্রগতিশীল রাজনীতির ভাষায় দালালের কোন জাত-পাত থাকে না। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষে দালালেরা নিজের ব্যক্তিগত সমস্ত কিছু অন্যের কাছে বিকিয়ে দিতে পারে। সংস্কারপন্থীদের আজ সেই একই অবস্থা চলছে।

লংগদুর পাহাড়িরা না খেয়ে থাকেনি, বিশ্ব বিবেক কেঁদেছে তাদের অসহায়ত্ব দেখে, জাগ্রত হয়েছে মানবতা। বেসরকারীভাবে মানবতাবাদী মানুষেরাই সব জায়গা থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে লংগদুবাসীর পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে। দানবরূপী নরপিশাচের দল যতই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠুক না কেন, সত্যকে আড়াল করে কখনো মিথ্যার জয় হবে না। পৃথিবীতে সব সময় ন্যায় ও সত্যের জয় হয়েছে, অত:পর মিথ্যার পরাজয় অনিবার্য এবং অপরিহার্যও বটে। ২৩৬টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়, ৭৫ বছর এক বৃদ্ধ মহিলা গুনমালা চাকমাকে সেই নরপিশাচের আগুনে পুড়ে ছাই হতে হলো। হায়রে বৃদ্ধার জীবন শাসকরূপী রাষ্ট্রযন্ত্রের অপশাসনে তোমাকে এভাবে জীবন দিতে হলো! হে তরুন আবারও বলছি, পৃথিবীব্যাপী যা কিছু অগ্রগতি ও পরির্বতন, বির্বতন হয়েছে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের শ্রমের বিনিময়ে হয়েছে। সেকারণে জুম্ম জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাহাড়ের বুকে বেঁচে থাকা নিরন্ন খেটে-খাওয়া মেহনতি মানুষগুলোকে ঐক্যবদ্ধ ও জাগ্রত করার দায়িত্ব তরুন ছাত্র সমাজের উপর বেশি। জেল, জুলুম, পুলিশ, নির্যাতন-নিপীড়ন, দমনপীড়ন মৃত্যু কিছুতেই এই তরুন সমাজ ভয় পায় না। ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ বেয়ে চলার তাদের জীবনের অভিজ্ঞতালদ্ধ যে জ্ঞান, সেটা আহরণ করে ভবিষ্যত দিনগুলোতে আমাদের তরুন ছাত্র সমাজকে আরো অধিকতরভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে বীর যোদ্ধাদের আদর্শের ঝান্ডা বহন করে জন্মভূমি ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে তরুন সমাজকে সামিল হতে হবে। পৃথিবীর বুকে কোন শাসকশ্রেণি অধিকার বি ত কোন জাতিকে সংগ্রাম ছাড়া, বিপ্লব ছাড়া অধিকার দেয়নি। পাহাড়ের বুকে জুম্ম জাতির তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে- অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আপনাদের নিশ্চয় অজানা নয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো কঠিন। ঠিক তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করার চেয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন করাও অনেক কঠিন। সেই কঠিন কাজটি বাস্তবায়নের জন্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রাম নিরন্তরভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

শেষান্তে বিশ্বকবি রবী ঠাকুরের ভাষায়, “পৃথিবীতে যেখানে এসে তুমি থামবে, সেইখান হতেই তোমার ধ্বংস আরম্ব হবে। কারণ, তুমি কেবল একলা থামবে, আর কেউ থামবে না। হয় অবিশ্রাম চলো এবং জীবন চর্চা করো, নয় বিশ্রাম করো এবং বিলুপ্ত হও”। পৃথিবীর এটাই নিয়ম! পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুন ছাত্র সমাজের লড়াই অবিশ্রামভাবে চালিয়ে যেতে হবে। সেই জায়গায় তারুণ্যের উপস্থিতি থাকলে জুম্ম জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের ভিত আরো মহাতেজী হয়ে উঠবে। ১৯৮৯ সালে ৪ঠা মে লংগদুর রক্তই জুম্ম ছাত্র সমাজের প্রাণের সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্ম দেয়। সেই জুম্ম সমাজের প্রাণপ্রিয় সংগঠনের পথচলা আজ ২৮ বছর। দীর্ঘ ২৮ বছরের মাথায় এসে আবারও তরুন ছাত্র সমাজ প্রত্যক্ষ করলো লংগদু জ্বলছে! কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর ছাড়পত্র কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে তরুন ছাত্র সমাজের তারুণ্যের ভিতকে দ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কবিতায় বলা হয়েছে-

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান,
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপনে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশির্বাদ,
তারপর হবো ইতিহাস।

তরুনদের উদ্দেশ্যে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “ঐ নতুনের কেবল দেখো কাল বৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়োধ্বনি কর”। তাহলে আজকে তরুনেরা কাল বৈশাখী ঝড়ের মত ঝঞ্জ¦া বেগে উত্তাল তরঙ্গের মত তারা এগিয়ে যেতে পারে, তারা সবকিছুই করতে পারে। অন্যায়কে প্রতিহত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে কেবলমাত্র এই তরুনেরা। জুম্ম জাতির বৃহত্তর স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের তারুণ্যের শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। প্রবীনের বুদ্ধি ও নবীনের শক্তি এই দুইয়ের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলে জুম্ম জাতির মুক্তি মিলবে।

বাচ্চু চাকমাঃ সাবেক সভাপতি; পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *