লংগদুতে সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে ঢাকায় নাগরিক প্রতিবাদ সমাবেশে পঠিত প্রবন্ধ

গত ২ জুন ২০১৭ রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলা সদরের তিনটিলা ও পার্শ্ববর্তী মানিকজোড়ছড়া ও বাত্যা পাড়ায় সেনা-পুলিশের উপস্থিতিতে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা চালায়। এ হামলার লংগদু সদরের তিনটিলা এলাকায় পাহাড়িদের ৯৪টি ঘরাবাড়ি ও দোকানপাট; মানিকজুরছড়ায় কমপক্ষে ৮৮টির ঘরবাড়ি এবং বাত্যা পাড়ায় প্রায় ৪২টি ঘরাবাড়িসহ পাহাড়িদের প্রায় ২৫০টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়েছে। তিনটিলায় ৭৫ বছরের নারী গুণমালা চাকমা নামে এক অশীতিপর বৃদ্ধ মহিলাকে নির্মমভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য যে, গত ১ জুন ২০১৭ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় খাগড়াছড়ি-দিঘীনালা সড়কের চার মাইল নামক স্থানে নুরুল ইসলাম নয়ন নামে একজন মোটর সাইকেল চালকের লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২ জুন সকালে পৌঁনে ৭টার দিকে খাগড়াছড়ি থেকে লংগদু উপজেলাধীন বটতলী নামক তার গ্রামে তার লাশ নিয়ে আসা হলে দুইজন পাহাড়ি ভাড়া নিয়ে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে মর্মে অভিযোগ এনে সেটেলার বাঙালিরা সাম্প্রদায়িক উস্কানী ছড়াতে থাকে। এরপর সকাল ৯টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতে লংগদু উপজেলায় বাত্যা পাড়া থেকে সেটেলার বাঙালিদের এক জঙ্গী সাম্প্রদায়িক মিছিল বের করা হয়।
মিছিলটি আনুমানিক ১০টার দিকে লংগদু সদরের তিনটিলা এলাকায় পৌঁছলে সেটেলার বাঙালিরা কোন উস্কানী ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও মাল্টিপারপাস কমিউনিটি সেন্টারের অফিসসহ পাহাড়িদের ঘরবাড়ি ও দোকানগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ঘরবাড়ি লুটপাটসহ পাহাড়িদের উপর হামলা করতে শুরু করে। এতে তিনটিলা এলাকায় ১০টি দোকানসহ পাহাড়িদের কমপক্ষে ৯৪টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয় বলে জানা যায়। সেটেলাররা প্রথমে পাহাড়িদের ঘরবাড়িতে পেট্রোল ও কেরোসিন ঢেলে দিয়ে থাকে। তারপর একের পর অগ্নিসংযোগ করে থাকে। এমনকি এক ধরনের গ্যাসের বোতল থেকে ঘরবাড়িতে স্প্রে করে দেয়া হয় বলে দেখা গেছে। ফলে পাকা বা আধা পাকা ঘরবাড়িও দ্রুত দাউ দাউ করে পুড়ে যায় বলে জানা গেছে।
এরপর সেনা ও পুলিশ প্রহরায় সেটেলার বাঙালিরা পার্শ্ববর্তী মানিকজোড়ছড়ায় হামলা করতে যায়। সেটেলার বাঙালিরা পাহাড়ি ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করতে গেলে প্রথমে পাহাড়ি গ্রামবাসীরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। ফলে সেটেলার বাঙালিরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় একদল সেনা সদস্য পাহাড়িদেরকে অস্ত্র তাক করে এগিয়ে আসে এবং পাহাড়িদেরকে গুলি করার হুমকি দিতে থাকে। প্রাণের ভয়ে পাহাড়িরা পিছিয়ে গেলে সেটেলার বাঙালিরা পেট্রোল ও কেরোসিন ঢেলে পাহাড়িদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এতে মানিকজোড়ছড়ায় ৫টি দোকানসহ কমপক্ষে ৪২টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ছাই হয়ে যায়।
বেলা ১২টার দিকে জেলা প্রশাসন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ১২টার পরেও সেনাবাহিনীর প্রহরায় সেটেলার বাঙালিরা বাত্যা পাড়া ও বড়াদম ইত্যাদি পাহাড়ি গ্রামে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এতে ৪টি দোকানসহ বাত্যা পাড়ায় ৪২টি ঘর পুড়ে যায় বলে জানা যায়। একপর্যায়ে বাত্যা পাড়া থেকে ফিরে বড়াদম গ্রামের ঘরবাড়ি অগ্নিসংযোগ থেকে রক্ষা পেয়ে থাকে।
অত্যন্ত দু:খজনক যে, লংগদু সেনা জোনের জোন কম্যান্ডার লে: কর্ণেল আবদুল আলিম চৌধুরী পিএসসি, টুআইসি মেজর রফিক ও লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে সেনা-পুলিশের সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে সেটেলার বাঙালিরা পাহাড়িদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করে এবং লুটপাটসহ সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা চালায়।
উক্ত জঙ্গী মিছিল ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পাটি, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি জাতীয় রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে এবং তথাকথিত সমঅধিকার আন্দোলন ও অন্যান্য সেটেলার বাঙালিদের সংগঠনের লোকজন অংশগ্রহণ করে বলে জানা যায়। তারই অংশ হিসেবে গত ২ জুন ২০১৭ তারিখ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উক্ত মোটর সাইকেল চালককে হত্যার প্রতিবাদে রাঙ্গামাটি শহরে ক্ষমতাসীন দলের যুবলীগ এক জঙ্গী মিছিল বের করে। এতে পাহাড়ি বিরোধী সাম্প্রদায়িক শ্লোগান প্রদান করা হয় বলে জানা যায়।
জানা যায় যে, নুরুল ইসলাম নয়নকে হত্যার প্রতিবাদে আওয়ামীলীগের উদ্যোগে লংগদু সদরে আহুত সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দিয়েছেন, লংগদু জোনের জোন কম্যান্ডার লে. কর্ণেল আব্দুল আলীম চৌধুরী ও লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম। এছাড়া বক্তব্য প্রদান করেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও আওয়ামীলীগের লংগদু শাখার সাধারণ সম্পাদক জানে আলম, লংগদু উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি লংগদু শাখার সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন, লংগদু উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াতে ইসলামীর লংগদু শাখার আমীর নাসির উদ্দীন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা এ্যাডভোকেট আবছার আলী, লংগদু যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, বাঙালি ছাত্র পরিষদের রাঙ্গামাটি জেলা সভাপতি আলমগীর হোসেন প্রমুখ। উল্লেখ্য যে, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সেটেলার বাঙালিরা একদিকে লংগদু উপজেলা সদরে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত করতে থাকে। অন্যদিকে তিনটিলাসহ অন্যান্য এলাকায় পাহাড়িদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালাতে থাকে।
এ থেকে এটা বলা যায় যে, ২০১২ সালে কক্সবাজার জেলার রামুতে সকল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ, নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারীর লোকজনের অংশগ্রহণে আগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত করা হয়েছিল, তারপর সম্মিলিতভাবে বৌদ্ধ মন্দির ও সম্প্রদায়ের উপর হামলা চালানো হয়েছিল সেভাবে লংগদুতে সকল জাতীয় রাজনৈতিক দল, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি সংগঠনের অংশগ্রহণে একযোগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও অগ্নিসংযোগের সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, গত ৬ মে ঢাকার এক নাগরিক প্রতিনিধিদলকে ভূমি বেদখল বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে বান্দরবানে এবং ২৫ এপ্রিল ঢাকার আরেক প্রতিনিধিদলকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে নানিয়ারচরে ঢুকতে দেয়া না হলেও, এমনকি গত এপ্রিলে নিরপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে নিহত রমেল চাকমার লাশ তার মা-বাবার কাছে ফেরত না দিলেও গত ২ জুন লংগদু সেনা জোন কর্তৃপক্ষ জুম্ম অধ্যুষিত গ্রামের মধ্য দিয়ে সেটেলার বাঙালিদেরকে লাশ নিয়ে জঙ্গী মিছিল করতে অনুমতি দিয়েছে। পাহাড়িদের উপর হামলা ও তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগে উস্কানী দেয়ার হীনলক্ষ্যেই মূলত এভাবে সেটেলারদেরকে লাশ জঙ্গী মিছিল করতে সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল বলে বলা যেতে পারে।উল্লেখ্য যে, গত ৬ মে ঢাকার এক নাগরিক প্রতিনিধিদলকে ভূমি বেদখল বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে বান্দরবানে এবং ২৫ এপ্রিল ঢাকার আরেক প্রতিনিধিদলকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে নানিয়ারচরে ঢুকতে দেয়া না হলেও, এমনকি গত এপ্রিলে নিরপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে নিহত রমেল চাকমার লাশ তার মা-বাবার কাছে ফেরত না দিলেও গত ২ জুন লংগদু সেনা জোন কর্তৃপক্ষ জুম্ম অধ্যুষিত গ্রামের মধ্য দিয়ে সেটেলার বাঙালিদেরকে লাশ নিয়ে জঙ্গী মিছিল করতে অনুমতি দিয়েছে। পাহাড়িদের উপর হামলা ও তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগে উস্কানী দেয়ার হীনলক্ষ্যেই মূলত এভাবে সেটেলারদেরকে লাশ জঙ্গী মিছিল করতে সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল বলে বলা যেতে পারে।

রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় সদরের তিনটিলা ও মানিকজুরছড়া, বাত্যপাড়া ও বড়াদমে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিতিতে সেটেলার বাঙালি কর্তৃেড়ীদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলায় দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করছে এবং সমাবেশ থেকে নিম্নোক্ত দাবীসমূহ জানাচ্ছে-
১.লংগদুতে পাহাড়ি গ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও অগ্নিসংযোগকারীদের অচিরেই গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।
২.অগ্নিসংযোগ ও সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাদের জীবন ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩.পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ, দ্রুত ও যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য অবিলম্বে সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
৪.পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক সকল অস্থায়ী ক্যাম্প ও অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহার করতে হবে।
৫.পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৬.সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন প্রদান করতে হবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *