সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা থাকা উচিত: সুপ্রিম কোর্ট

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে জোর করে নেওয়া ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত দিতে আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৮৯ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণের কিছু সাধারণ নীতিমালা থাকা উচিত বলে মন্তব্য করে রায়ে ৬টি বিষয় তুলে ধরা হয়।

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ওই সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাদের কর্মপরিধির কথা তুলে ধরে বলা হয়, দেশের আইন অনুযায়ী সরকারের পক্ষে এ সংস্থাটির এভাবে অর্থ নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। রায়ে বলা হয়, কোন ক্ষমতাবলে এবং কীভাবে তারা এই টাকা উদ্ধার করে বা জোর করে নেয়, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সরকারের। সরকার নীরব থেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই বেআইনি কাজকে সমর্থন জুগিয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, বিশেষ পরিস্থিতি কিংবা সংবিধানের ক্ষমতাবলে জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো

পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা বিশেষ করে ডিজিএফআইকে আইন বহির্ভূতভাবে জনগণের জীবন, সম্পদ ও ব্যবসায় হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

রায়ে বলা হয়েছে, জোর করে নেওয়া অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনগত কোনো বাধা নেই। ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জোর করে আদায় করা এসব অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি ভয়ানক বিপদও। দেশ থেকে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই টাকা সংশ্লিষ্টদের ফেরত দিতে পারত। কী কারণে তা আটকে রেখেছে তা বোধগম্য নয়।

এর আগে গত ১৬ মার্চ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত দিতে রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের করা আপিল খারিজ করে এ রায় দেন।

আদালতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও খায়রুল আলম চৌধুরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

রায়ে আদালত বলেছেন, কোনো আইন ছাড়াই অবৈধভাবে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে আদালতের নির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। হাইকোর্ট যথাযথভাবেই টাকা ফেরতের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদে আইন করার প্রয়োজন নেই। জোর করে আদায় করা এ টাকা ডিজিএফআইর এক কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখার জন্য পাঠিয়েছেন। পরে এই টাকা উদ্ধারের বৈধতা দিতে চেষ্টা করা হয় যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

রায়ে বলা হয়, সেনাবাহিনী দেশের সম্পদ। সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক কাজ হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের সীমান্তের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। দেশের ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় এবং আইনের শাসন রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখা। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রকে দুই ধরনের সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত রাজনীতিবিদ, যাদের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে যারা সামরিক বাহিনীতে থাকেন, তাদের থেকে দেশকে রক্ষা করা।

রায়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসা করে বলা হয়, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পেশাদার সামরিক বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। বেসামরিক বাহিনীকে ঘূর্ণিঝড়, বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবেলার মতো সামাজিক কাজে অংশ নিচ্ছে। অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোস্টগার্ড চোরাচালানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। সমুদ্রসীমায় সম্পদ রক্ষা করছে। সেনাবাহিনী ১৯৭০ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ দায়িত্ব পালন করে আসছে। নৌবাহিনী সমুদ্রসীমা এবং মিয়ানমারের আগ্রাসন রুখতে ভূমিকা রাখছে। ১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।

আপিল বিভাগের রায় অনুসারে এস. আলম গ্রুপের সাতটি প্রতিষ্ঠান ৬০ কোটি টাকা, দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি লিমিটেড এবং বারাউরা টি কোম্পানি লিমিটেড ২৩৭ কোটি ৬৫ লাখ, মেঘনা সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ ৫২ কোটি, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড ১৫ কোটি, ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড ৯০ লাখ, ইউনিক সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ ৭০ লাখ, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ১৭ কোটি ৫৫ লাখ, বোরাক রিয়েল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেড ৭ কোটি ১০ লাখ, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ৩৫ কোটি এবং ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের এক পরিচালক ১৮৯ কোটি ও ইউনিক ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের স্বত্বাধিকারী ৬৫ লাখ টাকা ফেরত পাবেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জরুরি অবস্থা জারি করে দুর্নীতি দমন অভিযানের কথা বলে গ্রেফতার করা হয় দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের। ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুই শতাধিক পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের কোষাগারে এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা জমা করা হয়।
তথ্যসূত্রঃ সমকাল

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *