বুদ্ধ পূর্ণিমা তার ও প্রাসঙ্গিক উচ্চারণ

আজ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে ২৫৬১ বুদ্ধাব্দের শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধ জগতে এ মহানপূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম মহিমায় অবিস্মরণীয়।মহান পুণ্যপুরুষ মানবপুত্র বুদ্ধ এ পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতম রূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী উদ্যানে জন্মগ্রহণ বা ভূমিষ্ট হয়েছিলেন, বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষতলে ছয় বছর ঊনপঞ্চাশ দিন কঠিন এবং কঠোর ধ্যান সাধনার মধ্যদিয়ে তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের বয়ক্রমকালে এ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতেই সম্যক সম্বুদ্ধত্বজ্ঞানে অধিষ্ঠিত হয়ে সোপাদিশেষ নির্বাণ অধিগম করেছিলেন এবং এ পূর্ণিমা তিথিতেই বুদ্ধ আশি বছর বয়ক্রমকালে কুশিনারার যুগ্ম শালবৃক্ষতলে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। এজন্যে গোটা বিশ্ব বৌদ্ধ জগতে এ পুর্ণিমাটি ত্রিস্মৃতি বিজড়িত মহান বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবে বিশ্ব বিশ্রুত ও গভীর শ্রদ্ধার সাথে সমাদৃত এবং অন্তরের আত্ম নিবেদিত ভালোবাসা উজাড় করে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীযের্র মধ্যদিয়ে প্রতিপালিত হয়।
অহিংসা মহামানবিকতা, পৃথিবীর তাবৎ প্রাণী- প্রজাতির প্রতি অমলিন কল্যাণকামীতা, মৈত্রী ও করুণার স্বপ্ন-সম্ভাবনার সংশ্লেষণে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দীপ্তোজ্জ্বল কাণ্ডারী-এ মহামানব বুদ্ধের ত্রিস্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পুর্ণিমা দিবসটি তাবৎ বৌদ্ধ বিশ্বসহ জাতিসংঘকর্তৃক মহা সাড়ম্বরে প্রতিপালিত হয়ে আসছে। আমাদের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশস্থ সমতল ও আদিবাসী বৌদ্ধদের প্রতি প্রাণময় সহযোগিতা, স্বীকৃতি ও সম্মাননার বাতাবরণে এ দিবসটিকে সরকারী ছুটি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সদাশয় সরকার তাদেরকে প্রতিবছর এ পূর্ণিমাটি যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় ও ভাব-গম্ভীর পরিবেশে প্রতিপালন করার অবকাশ দেওয়ার পরম পরাকাষ্টা প্রদর্শন করে চলেছেন। এজন্যে সদাশয় সরকারসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অমলিন কৃতজ্ঞতা ও বুদ্ধ পূর্ণিমার পুণ্যপুত শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করি।
আজ ১০ মে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যগত পারম্পর্য বজায় রেখে বাংলাদেশী সমতল ও আদিবাসী বৌদ্ধ জনগণ অহিংসার মূর্ত প্রতীক মানবপুত্র বুদ্ধের পাদমূলে তাঁদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য নিবেদন পূর্বক বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনায় অভিষিক্ত হওয়ার প্রত্যাশাপূর্ণ অঙ্গীকারেরপুণর্মূল্যায়নের প্রয়াস পাচ্ছে। এ প্রয়াসের সংশ্লেষণে বৌদ্ধ জনগণ- দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার মধ্যদিয়েবুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, ধর্মশ্রবণ, ধর্মপর্যালোচনা, পরমপূজ্য ভিক্ষুসংঘকে সশ্রদ্ধচিত্তে দান-দক্ষিণা প্রদানসহ নানাবিধ পুণ্যপুত পুণ্য কর্ম সম্পাদন করবে। তার পাশাপাশি বাংলাদেশের তাবৎ জনগোষ্ঠী, বিশ্বের তাবৎ প্রাণী-প্রজাতীর সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন ও মঙ্গল কামনাসহ বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে বিশেষ প্রার্থনানুষ্ঠানের আয়োজন করবে। রাজধানী ঢাকার বুকে মিরপুরস্থ ১৩ নং সেকশনে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যগত পারম্পর্য বজায় রেখে ঢাকাস্থ তাবৎ আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী নানাবিধ অনুষ্ঠানমালা সাজিয়ে আত্মগত নিবিড় পূজা ও প্রার্থনানুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে বিশ্বশান্তির লক্ষে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছে।
বুদ্ধ মহাকারুণিক। তিনি মৈত্রী, প্রেম ও অহিংসার মূর্ত প্রতীক। বিশ্বের তাবৎ প্রাণী-প্রজাতির দুঃখ মুক্তিই হল তাঁর ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী। তাঁর ধর্ম-দর্শনের আরেকটি মর্মবাণী হল- শত্রুতার দ্বারা শত্রুতা নিরসন বা শত্রুতার স্থায়ী নিরসন বা নির্মূলকরণ অসম্ভব। শত্রুতা শত্রুতা ডেকে আনে। সন্ত্রাস সন্ত্রাস ডেকে আনে। হিংসা হিংসা ডেকে আনে। শত্রুতা, সন্ত্রাস, হিংসা, রক্তের বদলা রক্ত, চোখের বদলা চোখ বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী নয়। এ সবের বিপরীত ক্ষমা, মৈত্রী, করুণা, অহিংসা, সমচিত্ততার উৎকর্ষ সাধনই বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী। নর-নারীর যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিমুর্হূতের কায়-বাক্য-মনো কর্মে কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে, আচারে-ব্যবহারে, মননে-অনুশীলনে সদাসর্বদা অপ্রমত্ততা বা সংযমতা সুসংরক্ষণই বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মর্মবাণী।
বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের আরেকটি অনন্যসাধারণ মর্মবাণী হল- জন্মসূত্রে কেউ বৌদ্ধ হয় না। একমাত্র কর্মসূত্রেই বৌদ্ধগণ বৌদ্ধ হিসেবে দাবী করতে পারেন। কারণ একজন বৌদ্ধকূলে জন্ম গ্রহণ করে যদি সে প্রাণী হিংসা করে, প্রাণী হত্যা করে, চুরি করে, দুর্নীতিবাজ হয়, ঘুষখোর হয়, আত্মস্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষে ছল চাতুরীসহ ধান্ধাবাজী, মতলববাজী ও কুচক্রী হিসেবে কাজ করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যা কর্কশ, ভেদ ও সম্প্রলাপ বাক্য বলে আর মদ-গাঁজা অহিফেন বা মরণঘাতী নেশাদ্রব্য সেবন করে তাহলে তাকে কোনমতেই সত্যিকার বৌদ্ধ বলা যাবে না। বৌদ্ধকূলে জন্মগ্রহণ করলেও বৌদ্ধিক চিন্তা-চেতনায় সে কোন কালেই বৌদ্ধ নয়।এ প্রসঙ্গে মানবপুত্র বুদ্ধের দীপ্তকণ্ঠের উচ্চারণ হল-
‘ন জচ্চা বসলো হোতি ন জচ্চা হোতি ব্রাহ্মণো,
কম্মনা বসলো হোতি কম্মনা হোতি ব্রাহ্মণো।’ (বসল সূত্ত)
অনুবাদ- জন্মসূত্রে কেউ চণ্ডাল হয় না, জন্মসূত্রে কেউ ব্রাহ্মণ হয় না। একমাত্র কর্মসূত্রেই মানুষ চণ্ডাল বা ব্রাহ্মণ হিসেবে আখ্যা প্রাপ্ত হন। তেমনি কেউ গৈরিক বসনধারণ করলে ভিক্ষু হয় না। গৈরিক বসনধারণ করে কেউ বাড়িতে বাড়িতে পিণ্ডাচরণের মাধ্যমে জীবন জীবিকা নির্বাহ করলেও ভিক্ষু হিসেবে পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতার অধিকারী হন না। যিনি জাগতিক সর্ববিধ পাপ-পুণ্যের উর্দ্ধে উঠে ব্রহ্মচর্যপরায়ণ হয়ে সত্যিকার জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত অবস্থায় জগতের সকল প্রাণী-প্রজাতির সার্বিক কল্যাণ কামনায় সর্বমাঙ্গলিক কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন বুদ্ধ তাঁকেই সত্যিকার ভিক্ষু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে বর্তমান এ একবিংশ শতাব্দীর দ্বন্ধ বিক্ষুব্দ, হিংসা-কুটিল, বক্র মন-মানসিকতা তাড়িত,চর্চিত,অনুশীলিত, ক্ষমতা-মদমত্ত, ক্ষমতালিপ্সু, বেনিয়া মনোবৃত্তির বদৌলতে সুকৌশলে সর্বময় ক্ষমতা, অর্থ-বিত্তের অধিকারী হয়ে নিজ নিজ আধিপত্যের চিরস্থায়ী অবস্থান পাকপোক্ত করার তাগিদে লাগামহীন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিশ্ব ব্যবস্থায় জন্মগ্রহণ করা নরনারীরমাঝে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও তাঁদেরকে সমালোচনামুক্ত রাখতে পারছেন না। ভিক্ষুসংঘের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে অনন্ত জ্ঞানী বুদ্ধও সন্ত্রাসী আখ্যায় আখ্যায়িত হচ্ছেন। অথচ (২৫৬১ বুদ্ধাব্দ) দু’হাজার পাঁচশত একষট্টি বছরের ব্যাপ্তিকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত গোটা বিশ্বের অর্ধেকাংশ জুড়ে বুদ্ধের শাসন-সদ্ধর্ম বিস্তারের অজুহাতে কোথাও একবিন্দু রক্তপাত সংঘটিত হয়নি। গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে জাতি,ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে যত জ্ঞানী গুণী, দূরদর্শী,বিচক্ষণ,ত্রিকালদর্শী, মহাজ্ঞানী মহৎজন রয়েছেন সকলেই করুণাঘন বুদ্ধের এ রক্তপাতহীন ধর্ম বিজয়কে এ জগতের এক অনন্য বিস্ময়রূপে আখ্যায়িত করার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর‘অহিংসা পরমধর্ম’, এ মূলমন্ত্রকে আত্মগতভাবে বুকে ধারণ করে অহিংসার সর্বব্যাপী স্পন্দনকে(Vibration) কাজে লাগিয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অহিংসার মূর্ত প্রতীকরূপে মহাত্মা গান্ধীআখ্যায় আখ্যায়িত হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। দ্বিপদধারী চক্ষুষ্মাণ, স্থিতধী, সচেতন ও সংযত তাবৎনর-নারীদের উদ্দেশ্যে মহাকারুণিক বুদ্ধের চিরন্তন ও কালজয়ী নির্দেশনা হল-
‘মাতা যথা নিযং পুত্তং আযুসা একপুত্তং অনুরক্খে,
এবম্পি সব্বভূতেসু মানসংভাবয়ে অপরিমাণং।’(করণীয় মৈত্রী সূত্র)
স্নেহময়ী মা যেমন নিজের একমাত্র পুত্র বা কন্যাকে নিজের বুকের রক্ত দিয়ে হলেও ইহ-জাগতিক সর্বপ্রকার বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করার তরীকা অবলম্বন করেন তেমনি এ জগতের সকল স্তরের ও সর্ব সম্প্রদায়ের শুধু মানুষ নয়, সর্ব প্রকার প্রাণী-প্রজাতিকেও মাতৃত্ব জ্ঞানে অবলোকন করে তাদের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করতে হবে এবং তাদেরকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যদিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এটিই হল বুদ্ধের ধর্ম-দর্শন বা তাঁর অনন্যসাধারণ সর্বমাঙ্গলিক মর্মবাণী। এ বাণীর মধ্যে কোথাও সন্ত্রাসের বীজ লুকিয়ে আছে কি?
মানবপুত্র বুদ্ধের নববিধগুণ-যেমন ভগবান,অর্হৎ, সম্যক-সম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ, অনুত্তর, দম্য পুরুষগণের সারথী, দেব-মনুষ্যগণের শাস্তা বুদ্ধ ভগবান-এ মন্ত্রটিতে এখন সন্ত্রাসের বীজ অন্বেষিত হচ্ছে। তাঁর সুব্যাখ্যাত, স্বয়ং সন্দৃষ্টিক,কালাকালহীন বা অনন্তকাল ব্যাপী অনুশীলনযোগ্য, এস, দেখ, পরীক্ষা-নিরীক্ষাকর, উপযুক্ত মনে করলে গ্রহণ কর-এরূপ বলারযোগ্য, তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা নিরীক্ষারযোগ্য, প্রত্যক্ষভাবে অধিগত হওয়ারযোগ্য ধর্মের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের বীজ বপিত রয়েছে বলে বলা হচ্ছে। নবগুণ সম্পন্ন সংঘের মধ্যে খোঁজা হচ্ছে ভেদ-বিভেদ ও কলহ বিবাদের এবং হিংসা বিদ্বেষের বাতাবরণ।প্রতিহিংসা পরায়নতার কি নির্মম উচ্চারণ!
তাই আজকের এ ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত মহাপবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত প্রার্থনানুষ্ঠানে অমলিন প্রত্যাশাভরে কামনা করি আমাদের এ প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের সর্বস্তরের, সর্ব-সম্প্রদায়ের, সর্বধর্মাবলম্বী প্রিয়ভাজন জনগণসহ বিশ্বের সাতশত কোটি জনগণের অন্তরের অন্তঃস্থলে বুদ্ধের অহিংসা মন্ত্র, সর্বকাজে সমচিত্ততার চেতনা, সর্বপ্রাণী-প্রজাতির নির্বিঘ্নে নিরুপদ্রবে সুস্থশরীরে বেঁচে থাকারও অস্তিত্ব রক্ষার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস সম্বলিত কর্ম-সংস্কৃতিরউৎসর্জন ঘটুক। বিশ্বের মধ্যে শান্তি, সুস্থিতি, প্রগতি ও সমৃদ্ধিসহ সর্বমাঙ্গলিক ঐক্য চেতনার বাতাবরণে অমলিন শান্তির সুবাতাস বয়ে চলুক অনন্ত অনন্তকাল।
সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু
জগতের সকল প্রাণী সুখি হোক।

ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো,
সভাপতি,
পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ বাংলাদেশ,
অধ্যক্ষ
শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার, ঢাকা ও আনন্দ বিহার, রাঙ্গামাটি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *