সেনাশাসন, জুম্ম বিরোধী ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে অবরুদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম : জুম্মরা যাবে কোথায়?

মঙ্গল কুমার চাকমাঃ বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন সেনাশাসন, জুম্ম-বিধ্বংসী বহুমুখী ষড়যন্ত্র ও ব্যাপক অপপ্রচারে অবরুদ্ধ। তার সাম্প্রতিক নমুনা হচ্ছে গত ৬ মে ২০১৭ বান্দরবান জেলার লামায় বহিরাগত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পাহাড়িদের ভূমি বেদখল ও আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদের অভিযোগ বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত এবং তথ্য সংগ্রহ করতে ঢাকা থেকে আগত একটি নাগরিক প্রতিনিধিদলকে সেনাবাহিনী কর্তৃক লামা ও বান্দরবান সদরে ঢুকতে না দেয়া। তারও আগে ৮ মার্চ ২০১৫ রাঙ্গামাটিতে সফররত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্যদেরকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করতে দেয়া হয়নি। সেসময় তাদের উপর বিশেষ বাহিনীর ইন্ধনে কিছু সাম্প্রদায়িক সেটেলার বাঙালি হামলাও চালায়। অনেক আগে ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আহুত সমাবেশে যোগ দিতে আসার পথে রাঙ্গামাটিতে ড. কামাল হোসেন ও তার সফরসঙ্গীদের উপর হামলার ঘটনা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল তা সবারই জানা এবং সেদিন তাঁকে রাঙ্গামাটি জেলার সীমানা রাবার বাগান এলাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। অতি সম্প্রতি সেনা নির্যাতনে খুন হওয়া রমেল চাকমার পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের সাথে গত ২৫ এপ্রিলে সাক্ষাৎ করতে আসা একটি নাগরিক প্রতিনিধিদলকেও রাঙ্গামাটির নান্যাচরে ঢুকতে দেয়নি সেনাবাহিনী। এমনকি নিহত রমেল চাকমার লাশ তার মা-বাবার কাছে ফেরত না দিয়ে পেট্রোল ও কেরোসিন ঢেলে দাহ করার মতো অমানবিক ঘটনাও সংঘটিত করেছে স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষ।
এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা উল্লেখ করা যায় যেখানে সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চলাফেলা ও সংগঠনের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জুম্মদের সাথে দেশীয় ও বিদেশী সংস্থার লোকজনের কথাবার্তা বলার উপর বিধি-নিষেধ আরোপসহ মৌলিক অধিকার পরিপন্থী ১১টি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও বর্তমান অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক (?) সরকার বোবার ভূমিকা প্রদর্শন করে চলেছে। দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন রেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে জুম্মদের ভূমি বেদখল, তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ, অবাধে পার্বত্যাঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠন ও জুম্মদেরকে জাতিগতভাবে নিপীড়ন-নির্যাতনের নীলনক্সা বাস্তবায়নের জন্যই এভাবে দেশের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ এবং বিদেশী সংস্থার লোকজনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকতে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে বলে নি:সন্দেহে বলা যেতে পারে।
জানা যায় যে, গত ৬ মে লামায় নাগরিক প্রতিনিধিদলের সরেজমিন পরিদর্শনকে ভন্ডুল করতে নিরাপত্তা বাহিনীর ইন্ধনে সাম্প্রদায়িক কিছু সেটেলার বাঙালিদের দিয়ে এক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। আরো জানা যায় যে, কয়েকজন ম্রো গ্রামবাসীকে এনে উক্ত অবরোধ পালন করতে বাধ্য করা হয়। তাদেরকে বিশেষ বাহিনী কর্তৃক ভাড়াটে লোক দিয়ে ডেকে এনে ব্যানারসহ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। ম্রো গ্রামবাসীরা জানতেন না যে সেদিন সড়ক অবরোধ ডাকা হয়েছে। ৬ মে ২০১৭ দৈনিক সমকাল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, “কেন সড়ক অবরোধ ডাকা হয়েছে জানতে চাইলে স্থানীয় বাঙালি নেতা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি জানি না। আমাদের নেতা ইয়ুন লগ মুরং জানেন।’ ইয়ুন লগের কাছে কিসের দাবিতে অবরোধ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমিও জানি না। আমি এখন আলী কদম থেকে আসছি।’ যানবাহন চলাচলে কেন বাধা দিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান।” বস্তুত একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বহিরাগত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পাহাড়িদের ভূমি বেদখল ও পাহাড়ি গ্রাম উচ্ছেদকে আড়াল করতে সাম্প্রদায়িক ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলকে দিয়ে এই অবরোধের নাটক সাজানো হয়েছে। নাগরিক প্রতিনিধিদলকে বাধা প্রদানের মধ্যে দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ছত্রছায়ায় জুম্মদের ভূমি প্রতিনিয়ত বিশেষ গোষ্ঠী দ্বারা বেদখল করা হচ্ছে। এসব ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই নাগরিক প্রতিনিধিদলকে বান্দরবানে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়েছিল।
জুম্ম জনগণকে কেবল অবরুদ্ধ করে রাখা নয়, সেই সাথে জনসংহতি সমিতির সদস্যসহ আন্দোলনরত অধিকার কর্মীদেরকে অস্ত্র গুঁজে দিয়ে গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা দায়ের ও জেলে প্রেরণ, অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন, হত্যা, রাজনৈতিক হয়রানি ইত্যাদিও সমান তালে অব্যাহতভাবে চলছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো ৩১ মার্চ ২০১৭ জনসংহতি সমিতির কাপ্তাইয়ের রাইখালীর সভাপতি ও রাইখালী ইউপি মেম্বার থোয়াই শৈনু মারমা এবং তাঁর ছেলে পিসিপির সদস্য ক্যহিংহ্লা মারমাকে বিজিবি কর্তৃক বিষ্ফোরক দ্রব্য গুঁজে দিয়ে গ্রেফতার, অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন ও জেলে প্রেরণ। নান্যাচরে এইচএসসি পরীক্ষার্থী উঠতি বয়সী রমেল চাকমার হত্যার ঘটনা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। একই কায়দায় মাটিরাঙ্গা সেনা জোন কর্তৃক গত ১০ আগস্ট ২০১৪ সালে হত্যা করা হয় জনসংহতি সমিতির সদস্য তিমির বরণ চাকমা ডুরানকে। রমেল চাকমার মতো ১৮ বছরের উঠতি বয়সী উচ্চ মাধ্যমিকের নিরীহ ছাত্র জিম্পু চাকমাকে হত্যা করা হয় মাটিরাঙ্গা সেনা জোনে ২০০৪ সালের ২৩ আগস্ট এবং তাকেও সেনা-পুলিশের উপস্থিতিতে দাহ করতে তার মা-বাবাকে বাধ্য করা হয়। তারও অনেক আগে ৫ মার্চ ২০০০ সালে পার্বত্য চুক্তি অনুসারে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা জনসংহতি সমিতির সদস্য মংসাথোয়াই মারমা বিশ্বকে গুইমারা সেনা জোনে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯৯৬ সালে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে অপহরণ এবং চিরদিনের জন্য গুম করার মতো আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ঘটনা এখানে উচ্চারণ করা বাহুল্য বৈ কিছু নয়।
এভাবে সেনাবাহিনীর – স্রেফ দাম্ভিকতা, জাত্যাভিমান ও বর্বরতায় সংঘটিত বিচার-বহির্ভুত হত্যাকান্ডের তালিকা অনেক দীর্ঘ করা যায় যেখানে এসব নৃশংস হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নিরাপত্তা বাহিনীর কোন সদস্যকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানা যায়নি। তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় অপরাধের পূর্ণ দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রমোশন দিয়ে তাদেরকে আবার পুরস্কৃতও করা হয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে। এভাবে অপরাধের দায়মুক্তি দিয়ে আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী ও সেটেলার বাঙালিদের দ্বারা বিচার-বহির্ভুত হত্যাকান্ডে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রকারান্তরে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে বলা যেতে পারে। জুম্মদের অধিকার আদায়ের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে গলাটিপে হত্যা করা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার জুম্ম কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করা, যার মধ্য দিয়ে জুম্মদের চিরায়ত ভূমি জবরদখল ও উচ্ছেদসহ জুম্মদেরকে জাতিগতভাবে নির্মূল করা এবং অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার হীনলক্ষ্যে শাসকশ্রেণি এভাবে অভিযুক্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে।
বস্তুত পার্বত্য জনপদে আইনের শাসন নেই বললেই চলে। নিরাপত্তা বাহিনীর অঙ্গুলি হেলনেই চলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার হীনলক্ষ্যে সার্বিকভাবে জুম্ম জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরতে এবং বিশেষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিসহ আন্দোলনরত সংগঠন ও অধিকার কর্মীদের চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী, জঙ্গীবাদী হিসেবে লেবেল দেয়ার লক্ষ্যে চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও ব্যাপক অপপ্রচার। এমন কোন ক্ষেত্র বা ঘটনা নেই যেগুলোতে জুম্মদেরকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জঙ্গীবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে না। বৌদ্ধদের ভাবনা কেন্দ্র থেকে শুরু করে মন্দির ও বুদ্ধমূর্তি স্থাপন, সাম্প্রতিক সাজেকে দুর্ভিক্ষ, বিদেশী সশস্ত্র গ্রুপের উপস্থিতি ও তৎপরতা, অস্ত্র ও মাদক পাচার, জঙ্গীবাদী জেএমবি ও জামায়াতের কার্যক্রম, ২৯৯ পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনের সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদারের আওয়ামীলীগের যোগদানের মিথ্যা সংবাদ, কতিপয় দালালদের দিয়ে জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে ম্রোদের সংবাদ সম্মেলন, রাঙ্গামাটির ডেপ্পোছড়িতে ১৬টি গাড়ি কথিত গণডাকাতি, সম্প্রতি শুভলং-এ বেড়াতে আসা পর্যটকদের মধ্যে নিজেরাই তাদের একজনকে হত্যার ঘটনা ইত্যাদি- এমন কোন ঘটনা নেই যেখানে কল্পকাহিনী তৈরী করে জুম্ম অধিবাসী ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে জড়িত করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে না।
নিরাপত্তা বাহিনীর মদদপুষ্ঠ কথিত সংবাদ কর্মীদের কতটা নিষ্কৃষ্ট অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে তার প্রকৃষ্ট হলো সাজেকে প্রতিবছরের মতো এবছরের খাদ্যাভাব বা দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর চাঁদাবাজিকে দায়ী করা। মূলত জুম চাষের উপর নির্ভরশীল সাজেকের জুম্ম অধিবাসীরা জুম চাষ করে বড়জোর ৬ থেকে ৯ মাসের খাদ্য যোগাড় করতে পারে। বাকি ৩ থেকে ৬ মাস প্রতিবছর তাদের মধ্যে খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সাধারণত মার্চ-এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে এই খাদ্য সংকট জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকে। অথচ দৈনিক জনকণ্ঠে মোয়াজ্জেমুল হক ও জীতেন বড়ুয়ার সংবাদে ‘সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও জুম ফলন কম হওয়ায় সাজেকে খাদ্য সঙ্কট’ দেখা দিয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাসকগোষ্ঠীর এধরনের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে গত ২৪ এপ্রিল ২০১৭ জনকণ্ঠে ফিরোজ মান্নাকে দিয়ে ‘পার্বত্য এলাকায় নতুন অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টায় ভাবনা কেন্দ্র’ শীর্ষক হলুদ সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে বান্দরবানের স্বর্ণমন্দির ও রাঙ্গামাটির বনবিহারে ও রাজবন বিহারকে জুডো ক্যারাতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বনে ঢুকে পড়া, বনে গিয়ে আবার তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেয়া, জুম্ম ল্যান্ড গড়ার আন্দোলন-সংগ্রাম ও সশস্ত্র বিপ্লব গড়ে তোলার মতো কল্পকাহিনীর অবতাড়না করা হয়েছে। এছাড়া মিয়ারমারের ধর্মীয় সংগঠন ‘৯৬৯’-এর তৎপরতা পার্বত্য চট্টগ্রামে বিস্তার করছে বলে জনকণ্ঠের উক্ত সংবাদসহ ২৫ এপ্রিল ‘পার্বত্য অঞ্চলে নতুন আতঙ্ক ৯৬৯’ শিরোনামে দৈনিক মানবজমিনে ও ২৯ এপ্রিল ‘পাহাড়ে নতুন আতঙ্ক ৯৬৯’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে সংবাদ প্রচার করা হয় মুখ্যত নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরবরাহকৃত একতরফা কল্পিত তথ্য দিয়ে। দেশের মাদ্রাসাগুলোতে যেভাবে ইসলামী জঙ্গী তৈরি কারখানা হিসেবে অভিযোগ তোলা হয় সেই আদলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ বিহার বা কিয়াংগুলোকে সন্ত্রাসী তৈরির কারখানা হিসেবে দেশে-বিদেশে তুলে ধরার হীনউদ্দেশ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই অপপ্রচারের ষড়যন্ত্র জোরদার করেছে। এই সংবাদ প্রকাশের পর পরই গত ১ মে ২০১৭ তারিখ বরকলে ভালুভিটায় একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণে বিজিবি বাধা দিয়েছে, যে ভালুভিটায় ১৯৪০ সাল থেকে বৌদ্ধরা পূজা-অর্চনা করে আসছিল। ইতিমধ্যে সেখানে ঘ্যাং-ও স্থাপন করেছে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। অথচ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে সেখানে আজ বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করতে বাধা দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে বরকল থানা থেকে বরকল উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান শকুন্তলা চাকমাকে ফোন করে বরকলের সকল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ফোন নাম্বার খোঁজা হচ্ছে যার পেছনে রয়েছে জুম্মদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও আতঙ্ক সঞ্চার করা।
জিম্পু চাকমা বা রমেল চাকমার মতো কোমলমতি জুম্ম ছাত্রদের হত্যার ঘটনাকে জায়েস করতে গত ৩০ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক ইত্তেফাকে ‘পাহাড়ে শিক্ষার্থীরা তিন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মানবঢাল’ শীর্ষক সংবাদ প্রচার করা হয়েছে যেখানে পরিবারের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগে ছেলেমেয়েদের সন্ত্রাসী বানানো হচ্ছে বলে বানোয়াট কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। গত ১লা মে দৈনিক মানবজমিনে ‘পার্বত্য এলাকায় নিখোঁজ তরুণরা গভীর জঙ্গলে’ শীর্ষক অনুরূপ আরেক সংবাদে মানুষের কল্পনা শক্তিকে হার মানাই এমন কাহিনী তৈরি করে প্রচার করা হয় যে, “একটি ছোট্ট ঘটনা পাল্টে দেয় এক চাকমা যুবকের জীবন। ২০১৩ সালে কর্ণফুলী কলেজে ভর্তি হয়। ক’দিন পরই বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করে। তারপর রাজনৈতিক প্যাঁচে পড়ে মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। পুলিশ খোঁজা শুরু করে। কলেজ থেকে পালায় সে। ভয়ে বাড়ির কাউকে ঘটনাটি জানায়নি। আশ্রয় পায় একই গোত্রের এক বড় ভাইয়ের কাছে। তার পরামর্শে কলেজ ও এলাকা ছেড়ে পাড়ি জমায় পাহাড়ের দুর্গম জঙ্গলে। অস্ত্র তুলে নেয় হাতে। বিনিময়ে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় শুরু হয় তার।” সাদা চোখে পাঠকরা এ ধরনের সাজানো কৌতুহল-উদ্দীপক সংবাদ গোগ্রাসে গিলে খাবে। সহজে কেউ উড়িয়ে দিতে চাইবে না। কিন্তু এর পেছনে কত গভীর ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত অপপ্রচার কাজ করছে তা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যারা সম্যক অবহিত নন তাদের পক্ষে বুঝা মুসকিল হবে বৈ কি।
বস্তুত বর্তমান ছাত্র-যুব সমাজের একটি বিরাট অংশ জুম্মদের উপর দেশের শাসকশ্রেণির অন্যায়-অবিচারের উপর যারপরন্যায় ক্ষুব্ধ ও অসন্তোষ্ট। প্রশাসনযন্ত্রের ছত্রছায়ায় সেটেলার বাঙালি ও বহিরাগত প্রভাবশালীরা তাদের চোখের সামনে বংশ পরম্পরায় ভোগদখলীয় জায়গা-জমি কেড়ে নেয়া ও একের পর এক জুম্ম গ্রাম উচ্ছেদ হয়ে পড়ার ঘটনা তারা প্রত্যক্ষ করছে। স্বচোখে প্রত্যক্ষ করছে তাদের মা-বোনদের নির্বিচারে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরণের মতো লোমহর্ষক ঘটনা। বিশেষ করে ছাত্র-যুবকদের টার্গেট করে নির্বিচারে অবৈধ গ্রেফতার, জেল-জুলুম, খুন করা হচ্ছে। কোন ঘটনায় তারা সুবিচার লাভ করতে দেখেনি। বরঞ্চ এসব মানবতা বিরোধী ঘটনায় জড়িতদেরকে নিলজ্জভাবে দায়মুক্তি প্রদানের উদাহরণ অসহায়ের মতো প্রত্যক্ষ করছে। নিজ ভূমিতে জুম্ম জনগোষ্ঠী দ্রুত সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে তা দেখে তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সরকার একের পর এক জুম্ম বিধ্বংসী ও আগ্রাসী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এসব কিছু দেখে জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজ ক্ষোভে দু:খে হতাশায় ফুঁসে উঠছে। স্বভাবতই আজ জুম্ম জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার যে কোন ন্যায্য আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজকে সম্মুখ ভাগে নেতৃত্ব প্রদানে প্রত্যক্ষ করা যায়। সেজন্যই আজ রাষ্ট্রীয় বাহিনী জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজকে টার্গেট করে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার জোরদার করেছে। জুম্ম ছাত্র-যুব সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিতে প্রশাসনের নাগের ডগায় ইয়াবা, হেরোইনসহ মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে। রমেশ ত্রিপুরার মতো উচ্ছৃঙ্খল জুম্ম যুবকদের লেলিয়ে দিয়ে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটানোর মতো উদাহরণ লক্ষ করা যায়।
গত ৩রা মে রাঙ্গামাটির ডেপ্পোছড়িতে কথিত গাড়ি ডাকাতির ঘটনা কিভাবে রাজনৈতিক রং দিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে তা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিএইচটিটাইমস২৪.কম-এর রিপোর্ট অনুযায়ী সেদিন দিবাগত রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার সময় ‘ভারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা ১৫টি গাড়িতে গণহারে ডাকাতি করে’। লক্ষ্য করার বিষয় যে, সেই সংবাদে ঢালাওভাবে ‘ভারী অস্ত্র-শস্ত্র’ নিয়ে ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসী’ দ্বারা সেই ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সিএইচটিটাইমস২৪.কম-এর ৬ মে আরেকটি রিপোর্টে আরো একধাপ এগিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে দায়ী করে সংবাদ প্রচার করা হয়। উক্ত ডাকাতির সাথে জড়িত করে গ্রেফতারকৃত রমেশ ত্রিপুরাকে বরাত দিয়ে বলা হয় যে, ‘প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের এক নেতার প্রত্যক্ষ মদদে এবং সেই নেতা কর্তৃক প্রদত্ত অস্ত্র দিয়েই সংঘটিত করেছে গণডাকাতি।’ প্রথম রিপোর্টে ‘ভারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে’ এবং দ্বিতীয় রিপোর্টে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের জনৈক ‘নেতা কর্তৃক প্রদত্ত অস্ত্র দিয়েই’ কথিত গণডাকাতির কথা বলা হলেও ৬ মে তারিখের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, অস্ত্র দু’টি ছিল ‘খেলনা পিস্তল ও দুটি কার্তুজভর্তি এলজি’। এ থেকে বুঝা যায়, এ সংবাদের মূল ভিত্তি হচ্ছে হলুদ সাংবাদিকতা। সংবাদের মূল উদ্দেশ্য ঘটনাকে তুলে ধরা নয়, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে সন্ত্রাসী ও ডাকাতচক্র হিসেবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরা।
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, ১৫টি গাড়ি একসাথে থামিয়ে সংঘটিত গণডাকাতির স্থান (ডেপ্পোছড়ি) মানিকছড়ি সেনা-পুলিশ ক্যাম্প এবং অপরদিকে শালবাগান ক্যাম্প- উভয় ক্যাম্প থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরত্বে মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এছাড়া সন্ধ্যার পর থেকে রাঙ্গামাটি-ঘাগড়া-রানীর হাট সড়কে প্রায় সময় পুলিশের ভ্রাম্যমান টহল দল থাকে। আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্য অনুসারে আরো রয়েছে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা, টহল ও নজরদারি ব্যবস্থা। এমনি নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নাগের ডগায় ডেপ্পোছড়ির মতো জায়গায় কীভাবে একসাথে ১৫টি গাড়ি থামিয়ে গণডাকাতি করা হলো তা আশ্চর্যের বিষয়। এর পেছনে আইন-শৃঙ্খলার সাথে যুক্ত কোন গোষ্ঠী জড়িত না থাকলে একসঙ্গে এতগুলো গাড়িতে গণডাকাতি কখনোই সম্ভব হতে পারে না। তাই এই কথিত গণডাকাতি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশেষ কায়েমী গোষ্ঠীর যোগসাজশে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে বলে অনেকে দৃঢ়তার সাথে বলতে চাচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা এবং এ ধরনের ঘটনাকে দোহাই দিয়ে ৭ই মে তারিখের মতো পরিবহন ধর্মঘট পালন করাই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য বলে বিবেচনা করা হয়।
তৃতীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে ধৃত রমেশ ত্রিপুরার কার্যকলাপ সম্পর্কে সিএইচটিটাইমস২৪.কম কোন উচ্চবাহ্য করেনি। রমেশ ত্রিপুরা হচ্ছে একজন উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি ও আওয়ামীলীগেরই এক নেতার পোষ্য সন্ত্রাসী বলে জানা যায়। তার বিরুদ্ধে থানায় অনেক মামলা রয়েছে এবং বিভিন্ন মামলায় কয়েক বছর জেলও খেটেছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। আন্দোলনরত জুম্মদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর হীনউদ্দেশ্যে এই উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে ক্ষমতাসীন মহলের বিশেষ গোষ্ঠী কর্তৃক গণডাকাতির নাটক মঞ্চস্থ করা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
আন্দোলনরত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করতে গত ২৭ এপ্রিলের দৈনিক মানবজমিন-এর “বিদেশি সশস্ত্র গ্রুপের সঙ্গে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর সমঝোতা” শীর্ষক ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করে আরাকান রোহিঙ্গা সলিডিারিটি অর্গানাইজশেন, ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান, আরাকান লিবারশেন পার্টি, পিপলস পার্টি অব আরাকান, আরাকান আর্মী, আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট, ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান ইত্যাদি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সাথেও সম্পৃক্ততার কল্পনাপ্রসূত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের জন্য মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মী থেকে অন্ত্র আনতে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার জনৈক অমুসলিম যুবক মিয়ানমারে গিয়েছিল এবং কয়েক চালান অস্ত্র এনেছিল বলে মুখরোচক গল্প অবতাড়না করে গত ১ মে ২০১৭ দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘ক্রেতা পাহাড়ি সশস্ত্র দল জেএমবি ও জামায়াত’ শিরোনামে কল্পিত সংবাদ প্রচার করা হয়েছে।
বস্তুত এটা সবারই জানা যে, এসব বিদেশী সশস্ত্র সংগঠনের সাথে রাষ্ট্র্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় কায়েমী গোষ্ঠী ও মৌলবাদী শক্তিই জড়িত রয়েছে। সেই সাথে মদদ রয়েছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্থানীয় নেতৃত্বের। স্থানীয় নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় এধরনের একটি সংগঠনের লোকজনকে ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট বান্দরবান থেকে মিয়ানমার সীমানা পাড় করার সময় অবৈধ মালামালসহ নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ধরা পড়েছিল যা সংশ্লিষ্ট মহলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়েছিল বলে জানা যায়। আরো উদ্বেগের বিষয় যে, প্রভাবশালী স্থানীয় মহল এসব বিদেশী সশস্ত্র গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ করে বান্দরবানের গ্রামাঞ্চলে জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে এবং জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর পরষ্পরের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানী প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ২০১৬ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারিতে রোয়াংছড়ির নোয়াপতং ইউনিয়নের বাঘমারা ভিতর পাড়ার কার্বারীকে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে জনসংহতি সমিতির সদস্যসহ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সক্রিয় জুম্ম গ্রামবাসীদের উপর দায়ভার চাপিয়ে জেল-জুলুমের উদাহরণও রয়েছে। এসব অপকর্ম ধামাচাপা দিতেই এধরনের বিদেশী সশন্ত্র গ্রুপগুলোর সাথে উল্টো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বরাত দিয়ে অপপ্রচার চালাতে ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত সংবাদ প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
কল্পকাহিনী তৈরি করে সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অপপ্রচার ও তথ্য সন্ত্রাস কত গভীরে তা দৈনিক জনকণ্ঠের সাবেক সাংবাদিক ফজলুল বারীর তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করা স্টাটাস থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত ফিরোজ মান্নার ‘পার্বত্য এলাকায় নতুন অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টায় ভাবনা কেন্দ্র’ শীর্ষক সংবাদ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “এই রিপোর্টে গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে গালগল্প বেশি। দীর্ঘদিন পাহাড়ে রিপোর্ট করাতে সেখানকার নানা কাঠামো আমি জানি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের বড় দুটি সমস্যা শান্তিবাহিনী আর শরণার্থীদের ভারত থেকে দেশের সীমান্তের ভিতরে নিয়ে আসা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনা নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থা তখনও এর বিরুদ্ধে, পাহাড়িদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করাতে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে বিশেষ ঘরানার সাংবাদিকদের পাহাড়ে নিয়ে যেত। শান্তিচুক্তি হয়ে গেছে, তখনও মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এক শ্রেণীর সেনা কর্মকর্তারা আমাদের বোঝাতেন, এই শান্তিচুক্তি করা ঠিক হয়নি। …ওদের দেখিয়ে বেশি বেশি বাজেট বরাদ্দ করাতেন! তখন তারা চুপ মেরে যেতেন। এক সময় পাহাড়ে সাংবাদিকতা-প্রেস ক্লাব এসব তদারকি-প্রতিষ্ঠার নেপথ্যেও সেনাবাহিনী-গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জড়িত ছিল। আজ পর্যন্ত যে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। এর নেপথ্যেও তারা। এরা নানান সময়ে নানান জুজুর ভয় ছড়ায়। কাজেই পাহাড়ে যে কারও রিপোর্ট করতে এসব মাথায় রাখলে ভালো। আর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টেতো সব পক্ষের বক্তব্য থাকতে হবে।”
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে জনকণ্ঠ, মানবজমিন, ইত্তেফাক ইত্যাদি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে কেবলমাত্র গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বক্তব্য প্রদান করা হয়। যাদের সম্পর্কে সংবাদ তাদের কোন বক্তব্য নেয়া হয় না। ১৩ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের সাথে উষাতন তালুকদারও আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েছি মর্মে উষাতন তালুকদারের কোন বক্তব্য না নিয়ে এভাবে কালের কণ্ঠ, বিডিনিউজ২৪.কম, সিএইচটিটাইমস২৪.কম সহ বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব সম্পর্কে জনমতকে বিভ্রান্ত করতেই এভাবে একতরফা সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে বলা যেতে পারে।
ফজলুল বারীর উক্ত বক্তব্য থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসনযন্ত্রের গভীর ষড়যন্ত্র ও গোয়েবলসীয় অপপ্রচার সম্পর্কে সহজেই ধারণা লাভ করা যায়। এভাবে জুম্ম বিরোধী ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে বরাবরই দূরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আন্দোলন-সংগ্রামের পরিস্থিতি ও ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। এটা ঠিক যে, অন্যায়-অবিচার থাকলে সেখানে কোন না কোনভাবে কোন না কোন প্রজন্ম দ্বারা বৈপ্লবিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠবেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার বা প্রশাসনযন্ত্র কি পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার স্থায়ীত্বশীল রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে? নাকি দশকের পর দশক ধরে চলা সেনাশাসনে এবং জুম্ম বিরোধী ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে অবরুদ্ধতার দিকে ঠেলে দেয়া পার্বত্যাঞ্চলের অর্গল ভেঙ্গে ফেলার জন্য জুম্ম ছাত্র-জনতাকে কঠোর আন্দোলন-সংগ্রামের দিকে ঠেলে দেবে? সেই প্রশ্নের সমাধান দেয়ার দায়িত্ব যতটা না জুম্ম জনগণের, ততধিক হচ্ছে দেশের শাসকশ্রেণির।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *