১৩টি আদিবাসী পরিবার উচ্ছেদঃ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন

নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার মাধনগরে এক প্রভাবশালী খাসজমি দখল নিতে পুলিশের সহায়তায় ১৩টি আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ করেছে। এসময় বাঁধা দিতে গেলে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে বেশ কয়েকজন আদিবাসীকে পুলিশ নির্যাতন চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ।
গত মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার পূর্ব মাধনগর গ্রামে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। সহায় সম্বল হারিয়ে বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীরা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায় গণমাধ্যমকে জানান, উপজেলার পূর্ব মাধনগর গ্রামের ডিগ্রি কলেজের পিছনে ৩০ শতক খাস জমির উপর ১৯৪০ সাল থেকে ১৩টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে আসছিল। পরে ওই ৩০ শতক খাস জমি আদিবাসীরা সরকারের কাছ থেকে পত্তন পায়। কিন্তু ১৯৬৮ সালে বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী ৩০ শতক খাস জমিসহ মোট ৫০ শতক জমি ওই গ্রামের বজলুর রশিদের পিতা ইমাজ উদ্দিনের সাথে বিনিময় করেন। পরে ওই জমির দখল বুঝে পেতে ইমাজ উদ্দিন বাদী হয়ে ১৯৯৬ সালে নাটোর সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর জমিটির ডিগ্রি পায় ইমাজ উদ্দিনের ছেলে বজলুর রশিদ। আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আদিবাসী গোষ্ঠিরা আপিল করলেও আপিলটি খারিজ হয়ে যায়। এরপর গত ২ মে মঙ্গলবার নাটোর সহকারী জজ আদালতের রায়ে ১৩টি আদিবাসী পরিবারকে পূর্ব নোটিশ না দিয়েই বাড়িঘর গুড়িয়ে দিয়ে উচ্ছেদ করেন প্রশাসন। এসময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন আদালতের প্রতিনিধি নাজির সুনীল কুমারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। তবে, উচ্ছেদ অভিযান একজন ম্যাজিস্ট্রেটের এর উপস্থিতিতে হওয়ার কথা থাকলেও সে নিয়ম মানা হয়নি।
রাতেই খবর পেয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ আরিফকে ঘটনাস্থলে পাঠান। এসময় তাদের পুনর্বাসনের জন্য জায়গা এবং বাড়িঘর তৈরির জন্য নগদ টাকা এবং কিছু ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করেন। পাশের একটি স্কুলে পরিবার পরিজন নিয়ে রাত যাপন করছেন আদিবাসীরা।
এদিকে, পূর্ব নোটিশ না দিয়ে আদিবাসীর ১৩টি পরিবারকে পূর্ণবাসন না করে এভাবে উচ্ছেদ অমানবিক বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। উচ্ছেদের আগে বাড়িঘর থেকে আদিবাসীর ১৩টি পরিবারকে কোনো মালামাল বের করতে দেওয়া হয়নি বলেও ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করেছেন।
আদিবাসী গ্রাম পুলিশ রাজ কুমার জানান, আমরা এখানে ৯০ বছর ধরে বাপদাদার আমল থেকেই বসবাস করছি। কিন্ত প্রশাসনের লোকজন ঘর থেকে কোনো কিছু বের করতে না দিয়ে ভেকু দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে।
আদিবাসী কন্ঠশিল্পী করুন সিং বলেন, আমি গানবাজনা করে সংসার চালাই, কিন্তু আমাদের উচ্ছেদ করার আগে যদি কিছু সময় দিত। আমার গান গাওয়ার দেড় লাখ টাকার দামের যন্ত্রাংশ ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে।
তপন সিং বলেন, আগামী ৯ মে আমার ডিগ্রি পরীক্ষা আমার বই খাতা বের করার সুযোগ দেয়নি।
নাটোর আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নেতা নরেশ উরাও বলেন, সারাদেশে সমতলে বসবাসকরা আদিবাসীদের ওপর হামলা মামলা এবং নির্যাতন করা হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতা মাধনগরের ঘটনা। অবিলম্বে আদিবাসীদের জায়গা ফিরিয়ে দিয়ে সেখানেই তাদের পুর্নবাসন করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
মাধনগর ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন দেওয়ান জানান, এই উচ্ছেদ করার বিষয় আমি জানি না। তবে আমি তাদের তিনদিনে খাবার হিসেবে চাল ডাল কিনে দিয়েছি।
পুলিশি নির্যাতনের বিষয়ে নলডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আদালতের রায়ে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। কোনো আদিবাসীকে নির্যাতন করা হয়নি।
এদিকে, আদিবাসীদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে বুধবার দুপুরে নাটোর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। এসময় মানববন্ধনে আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, চলতি মাসের মধ্যে উচ্ছেদ হওয়া জায়গায় পুনরায় আদিবাসীদের পুর্নবাসন করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলন করা হবে। মানববন্ধনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হেমব্রম, জাতীয় আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতি দিভুতিভূষন মাহাতো, সাধারণ সম্পাদক নরেন পাড়ানসহ স্থানীয় আদিবাসীরা বক্তব্য রাখেন।
এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীরা খাসজমির ওপর বসবাস করে আসছিল। কিন্তু প্রভাবশালী এক ব্যক্তি আদালতের রায় নিয়ে আদিবাসীদের অমানবিক ভাবে উচ্ছেদ করেছে। তাছাড়া উচ্ছেদ অভিযানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকার নিয়ম থাকলেও সেটা মানা হয়নি। তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক ভাবে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীদের থাকার জন্য একটি জায়গা, নগদ টাকা এবং কিছু চাল দেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিক ভাবে জেলা প্রশাসনের অনুসন্ধানের উচ্ছেদ হওয়া জায়গাটি সরকারি খাস খতিয়ানের। সরকারি খাস খতিয়ানের জায়গা কেউ দখল করে পারে না। জমিটি উদ্ধারে আদালতে মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *