রোমেল চাকমার মৃত্যু এবং তথাকথিত মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা

ধরুন রোমেল চাকমা একজন বড় সন্ত্রাসী ছিল। তার নামে থানায় একাধিক মামলা আছে। রোমেল চাকমা দুর্ধর্ষ এক গুন্ডা। তাকে দেখলে সবাই কাঁপে। তারপরও একটি স্বাধীন দেশের সংবিধান অনুযায়ী তার আইনি লড়াইয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আছে। রাষ্ট্র তাকে এ সুযোগ দিতে বাধ্য। কিন্তু রাষ্ট্রের সংবিধানকে তোয়াক্কা না করে ‘পাইছি তো মেরে দিছি’ যারা করে তারা কী করে আইনের রক্ষক হতে পারে!
এরপর আসি রোমেলের মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাক্রম নিয়ে। দেশের সরকার ঘরানা তথাকথিত মেইনস্ট্রিম মিডিয়া রোমেল চাকমা বিরাট সন্ত্রাসী বানিয়ে দিয়েছে। অথচ এইসব মিডিয়াগুলো আবার মানবাধিকার নিয়ে বেশী কপচায়। তো আমার প্রশ্ন হচ্ছে রোমেল বড় সন্ত্রাসী হলেই কী তাকে এভাবে নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলা জায়েজ। আপনারা কেন এ ধরনে লিগেসি দিয়ে দিবেন।
পাহাড়িরা পাহাড়ে বাঙালিদের দুই ভাগে ভাগ করে। এক, স্থানীয় বাঙালি। দুই, সেটেলার বাঙালি। স্থানীয় বাঙালিদের সাথে পাহাড়িদের বিরোধ থাকলেও সেটি কখনোয় সাম্প্রদায়িকতার দিকে যায়নি। তাদের সাথে সম্পর্ক ও ভালো। কিন্তু সেটেলার বাঙালিদের সাথে বিরোধ চরমে। তার কারণ কী? আমার পাতে ভাত কেউ কেড়ে নিয়ে খেলে আমি কি চুপ করে থাকবো? যে জমিগুলোতে বংশপরম্পরায় বাস করে এসেছি সেগুলো যদি জোর করে দখল করে তাহলে পাহাড়িরা চুপ থাকবে কেন?
সেটেলাররা নিজেদের বড় রকমের দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রমাণ করতে সর্বদা চেষ্টা করে। পাহাড়ি, খাপ্পোয়া, উপজাতি সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী এই ট্যাগগুলো দিয়ে নিজেদের বড় রকমের দেশ প্রেমিক বানিয়ে ফেলে। এরা যে কোন লেভেলের একটা একটা চিজ সেটি প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের পরিচালিত ফেবু পেজগুলোতে। যেখানে প্রতিনিয়ত পাহাড়িদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কতগুলো ছবি দিয়ে বলা হয় এগুলো নাকিই পাহাড়ে ত্রাস সৃষ্টি করছে। তা বাপু এই ছবিগুলো তোলার সময় তো পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা আপনাদের খায়া ফালাইত। কীভাবে এই ছবিগুলো তুললেন। আপনাদের সাহস তো তারিফ করতে হয়।
এ সেটেলারদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার ঘরানা কতক মিডিয়া। বেসরকারী একটি টেলিভিশনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে একটি রিপোর্টে নিউজ এঙ্কর বলেছে ‘পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা’। এরপর রিপোর্টে যে ছবিগুলো দিয়েছে সে ছবিগুলো সবই পার্বত্য চুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর ছবি। আর অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে সেখানে মিয়ানমার কাচিন বিদ্রোহীদের একটি ছবিও আছে। (ওয়াও ইমোটিকন হপে)
এবার আসি রোমেল চাকমা মৃত্যুর পরে নিরাপত্তা বাহিনীরা কী বলেছে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল রাশেদুল হাসান জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘গত পাঁচ এপ্রিল তাকে ট্রাক পোড়ান এবং বাস লুটের মামলায় সেনা সদস্যরা আটক করেন এবং ওই দিনই (পাঁচ এপ্রিল) তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়৷ এরপর পুলিশের তত্ত্বাবধানে তিনি পরবর্তী ১৪ দিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন৷ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ এপ্রিল তিনি মারা যান৷ সেনাবাহিনীর নির্যাতনে তিনি মারা গেছেন বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়, সত্য নয়৷’
‘১৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাপাতালে মারা যাওয়ার পর ২১ এপ্রিল শুক্রবার দুপুরে নানিয়ারচরের বুড়িঘাট ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের পূর্বহাতিমারা গ্রামে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে রমেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে পুলিশের তত্ত্বাবধানে৷’
অন্যদিকে বিপরীত বক্তব্য পাওয়া গেছে নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ এর কাছ থেকে। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘আমরা রমেলকে আটক করিনি এবং হাসপাতালেও ভর্তি করিনি৷ আমরা পাঁচলাইশ থানা পুলিশের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ এপ্রিল চট্টগ্রামে গিয়ে লাশের সুরতহাল ও ময়না তদন্তের পর লাশটি গ্রহণ করি৷ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সিএমপির পাঁচলাইশ থানা এলাকায়৷ কিন্তু রমেল চাকমার বাড়ি নানিয়ারচরে হওয়ায় লাশ আমাদের নানিয়ারচরে নিয়ে আসতে হয়েছে৷’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রমেলকে আমরা গ্রেপ্তার করব কেন? তার নামেতো কোনো মামলা নেই৷ তাকে কারা আটক করেছে সেটা আর্মির অফিসাররা বলতে পারবেন৷ তাকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা হাসপতালে ভর্তি করেন৷ প্রথমে নানিয়াচর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়৷ তারপর পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান হয়৷’

এছাড়াও রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান জাতীয় পত্রিকা মানবকণ্ঠকে বলেছেন, অপরাধীকে ধরা হলো ভালো কথা। কিন্তু তার জন্য তো আইন আছে। সে অনুযায়ী তার বিচার হবে। কিন্তু তাকে নির্যাতন করে পুলিশের কাছে আনা হলো। তার শারীরিক অবস্থা দেখে পুলিশ তাকে গ্রহণ করেনি। পরে সে মারা গেল। মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়েও টানাটানি। এখন দায় চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে পুলিশের ওপর। মানুষ মরেছে অবরোধ হবে স্বাভাবিক। এখানে মারপিট করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হলো। ফলে পরিবহন ধর্মঘট যোগ হয়েছে। এখন পুলিশকে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এসব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যা হয়েছে এখানে পুলিশের কোনো হাত নেই। যদি আমাদের দায়ী করা হয় তাহলে তদন্ত করে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। অন্যায়কে পুলিশ কখনো প্রশ্রয় দেবে না।’
আসল ঘাপলা তো এই জায়গায়। একটি মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নিরাপত্তার বাহিনীর পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে এটাই প্রতীয়মান যে তাদের নির্যাতনে রোমেল মারা গেছে। এইসব বিষয়কে এক জায়গায় রেখে জনকন্ঠ যে কাজটা করেছে সে জন্য জনকন্ঠ এবং তার সাংবাদিককে ঘৃনার ফুলের তোড়া দিতে চাই। রোমেলের বিষয়কে অন্যদিক মোড় দিতে তারা ইচ্ছে করেই এই রিপোর্টটা বানিয়েছে। এই ধরনের রিপোর্ট আমাকে দিলে বিশ পঁচিশটা বসে বসে করতে পারতাম।
তো সবশেষে কথা হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে এ ধরনের মৃত্যু তো কাম্য নয়। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অন্যদিকে মোড় দেয়াটা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের জন্য অশুভ লক্ষণ ইঙ্গিত করে।
মংক্যথোয়াই মারমাঃ শিক্ষার্থী ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *