ঢাবি’তে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জুম ম্যাগাজিন প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসব:

আইপিনিউজ(ঢাবি প্রতিনিধি): ‘বৈচিত্র্যর ঐকতানই আমাদের শক্তি, বহুত্বের উৎসবে বুনি মুক্তি’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে গতকাল শুক্রবার (১৭ জুন) ঢাবির টিএসসি’তে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জুম ম্যাগাজিন প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসব। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শুভার্থীর নেতৃত্বে অতিথি বরণ পর্ব দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো.আখতারুজাম্মান এবং সম্মানিত অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’র ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক বাঞ্ছিতা চাকমা প্রমুখ। সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ঐতিহ্য চাকমা’র সঞ্চালনায় এবং সভাপতি রাতুল তঞ্চঙ্গ্যার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার শুরুতেই ‘জুম’ ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন জুম ম্যাগাজিনের এবারের সম্পাদক ও সংগঠনটির সহ-সভাপতি সতেজ চাকমা।
স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল এখনো তা পূর্ণতা পায়নি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দর্শন নিয়ে যে দেশটির যাত্রা হয়েছিল তার মূল সৈন্দর্য নিহিত আছে বহুত্বে। বাঙালি ভিন্ন অপরাপর সংস্কৃতিগুলোও যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র উর্বর সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় সমানভাবে চর্চিত হতে পারে তার জন্যই আমাদের এই প্রয়াস। বাংলাদেশ যে বহু ধর্মের, বহু জাতির দেশ এটাই আমাদের বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যকে উৎযাপন করায় আমাদের এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এ ধরনের বৈচিত্র্যমই সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে বহুত্বাবাদী রাষ্ট্র হয়ে উঠুক এই কামনা করি।
প্রধান অতিথি বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান বলেন, পাহাড়ের এ শিক্ষার্থীরা খুবই সরল এবং সরলতায় তাদের সৌন্দর্য্য। এ সরলতার জন্য তারা কারোর সাথে ঠগবাজি করতে পারে না, যেটা করে খুবই মন দিয়ে করে থাকে। আজকের এ জুম ম্যাগাজিন তাদের এই সৃজনশীলতার একটি নিদর্শন। এ জুমে কবিতা আছে, প্রত্যাশা আছে, ক্ষোভ আছে এবং বিকল্প চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের নানা ভাবনা আছে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে জুম্ম শিক্ষার্থীদের শিল্প, সাহিত্য ও স্ব স্ব সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিকাশের নিরাপদ ক্ষেত্র দাবী করে তিনি আরো বলেন, আমাদের বৈচিত্র্য ব্যাপক কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের সতেনতার খুবই কম। পাহাড়ের জুম্ম শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।

ঢাবি জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীদের পরিবেশনা।

সম্মানিত অতিথি’র বক্তব্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, পাহাড়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা জুমের যে উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে এটি আমি মনে করি বহুত্বাবাদি এ বাংলাদেশ তথা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে মুক্ত চিন্তার দ্বার খুলে দিবে। রাজনীতি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা চেতনা পরিপুষ্ট হয়। এটি বলার উপেক্ষা রাখেনা যে, তাদের এই আয়োজন বাংলাদেশের বৈচিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছে। এখানে একক সংস্কতি লালর নয়, বহুজাতিক বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিকরই প্রকাশ ঘটেছে। জুম ম্যাগাজিনের মাধ্যমে জুম্ম শিক্ষার্থীদের ভাবনা, চিন্তা, ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও সৃজনশীলতা প্রতিফলিত হয়েছে বলে তিনি এই ম্যাগাজিন প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রসংশা করেন।
এছাড়াও বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা বলেন, আমরা বহুজাতীর একটি দেশে বসবাস করি। মনোকালচার কোনো ক্ষেত্রেই ভালই নয়। আমার প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীরা যারা জগন্নাথ হলে অবস্থান করে, আমি সবসময় তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমাদেরকে একে অপরের হাত ধরে পথ চলতে হবে। এভাবেই দেশ আরো এগিয়ে যাবে এবং উন্নত সমৃদ্ধ হবে বলেও মনে করেন তিনি।

সাংস্কৃতিক আয়োজনে গান পরিবেশন করে আদিবাসীদের গানের দল -মাদল।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও অধ্যাপক বাঞ্চিতা চাক্মা বলেন, শত প্রতিক‚লতার পেরিয়ে পাহাড় থেকে আসা এ পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা নিজের শেকড়, সমাজের কথা ভাবছে, দেশের অসংগতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলছে এটি আমাদের আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে আশাবাদী করে। তারা যেন পড়ালেখার সাথে সাথে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনেও মনোনিবেশ করেন তার জন্য পাহাড়ের তরুণ জুম্ম শিক্ষার্থীদেরকে আহ্বানও জানান।
এছাড়া সমাপনী বক্তব্য রাখেন জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠণের সভাপতি রাতুল তনচংগ্যা। তিনি তার সমাপনীর বক্তব্য তার জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা গতিশীলতার জন্য সাংস্কৃতিক উর্বরভূমি ও বহু সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র টি.এস.সি. তে সংগঠনের জন্য একটি রুম বরাদ্ধের দাবিও জানান। আলোচনা সভার পরেই অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়। ঢাবি জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীদের আবৃত্তি, গান ও নৃত্য পরিবেশনার পরেই গান পরি্েবশন করে আদিবাসীদের গানের দল মাদল। এছাড়া উক্ত অনুষ্ঠানে ঢাবি জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের সাবেক সদস্য ও উদীয়মান বক্সার সুরকৃষ্ণ চাকমা’কে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এরপর ঐতিহ্য চাকমা’কে সভাপতি, শ্রেয়া চাকমা’কে সাধারণ সম্পাদক ও অনন্ত তঞ্চঙ্গ্যা’কে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৩৭ সদস্যের নতুন কমিটির ঘোষণা করা হয়।
দিনবাপী উক্ত আয়োজনে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়ুয়া জুম্ম শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ আর্ট ক্যাম্প।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.