পানিবন্দি নেত্রকোনার আদিবাসী অঞ্চল: শুরু হয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট

কাঞ্চন মারাক: টানা বর্ষন ও ভারতের উজান থেকে আসা ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা, বারহাট্টা ও দুর্গাপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত। এতে পানিবন্দি জীবন যাপন করছে লক্ষাধিক মানুষ। তবে একটু ভয়াবহ বন্যাদুর্গত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কলমাকান্দা উপজেলাকে।

উপজেলা সদরসহ ৮ ইউনিয়নের ৩৪৩ গ্রামের সবখানেই প্লাবিত হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন কলমাকান্দা উপজেলা প্রশাসন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াল থাবা হতে বাদ যায়নি ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন আদিবাসী অঞ্চল। জানা গেছে, উপজেলার রংছাতি, খারনৈ ও লেংগুড়া উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তবে নদীর পাশে থাকা এলাকাতে ব্যপক ক্ষতিসাধন করেছে।

রাস্তা-ঘাট, বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর পানিতে ডুবে গেছে। গাছ-পালা, পশু-পাখি ও মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানিবন্দি জীবন যাপন করছে উপজেলার প্রায় ১২ হাজারের অধিক আদিবাসী।

বেশ কিছুদিন ধরে টানা বর্ষন ও পাহাড়ি ঢলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনো খাবারের অভাবে নির্বিকার জীবন যাপন করছে আদিবাসীরা।

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্যার্তদের করুণ জীবনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এভাবেই জানা গেলো, পানিবন্দি সবচেয়ে বেশি সংকটে রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাও ও গোবিন্দপুরের মানুষ।
সেচ্ছাসেবী ও কন্ঠশিল্পী চৈতী মানখিন ওয়ালে লিখেছেন, ‘এখনো না খেয়ে আছে পাঁচগাও এর জনগণ। (নংক্লাই নদীর এপাড়-ওপাড়, ধারাপাড়া, পশ্চিম হাজংপাড়া, দক্ষিনপাড়া।) আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি শুকনো খাবার পৌঁছে দিতে।’

পরবর্তি লেখাতে জানা গেলো এই মানবেতর ও জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পীর অসহায় হয়ে পড়ার কষ্ট মাখা লেখা।

“সর্বত্র পানিতে প্লাবিত, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাই সবার কাছে খাবার পৌঁছে দিতে পারছেন না। তিনি লিখলেন, ‘টেনশনে কিছু ভালো লাগছে না। আজ রাতেও আর ঘুমুতে পারবো না। কষ্ট করে আর একটি রাত সহভাগিতা করে কাটিয়ে দাও।’

কতটা অসহায় হয়ে পড়েছেন তা লেখা থেকেই স্পষ্ট।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘মহেশখোলা নদীতে পাহাড়ি ঢলে পানি ছড়িয়ে পড়েছে পাঁচগাও গ্রামে। ভেসে গেছে মুসলিমসহ গারো-হাজং আদিবাসীদের শতাধিক বাড়িঘর ও গবাদি পশু-পাখি। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে না খেয়ে আছে ৩ শতাধিক আদিবাসী পরিবার।’

তিনি আরোও বলেন, ‘পাঁচগাও গ্রামের পাশে ভারতীয় এক পাহাড় ধ্বসে পানি ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে। পুকুর ও ডোবায় থই থই করছে শুধু পানি। এদিকে একজন নিঁখোজ। আমরা স্থানীয় যুবক-যুবতী মিলে তহবিল গঠন করে যথাসাধ্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছি।’

পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর গ্রামের মঙ্গলশ্রী বা গণেশ্বরী নদীর পাহাড়ি ঢলে বিলিন অর্ধশতাধিক বাড়িঘর। পানিবন্দি মানুষ খাদ্য সংকটে হাহাকার করছে।

বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন কলমাকান্দার সভাপতি তামস মানখিন বলেন, ‘আমরা নিরুপায়। সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছি। তবে স্রোতের কারনে সবখানে গিয়ে খাবার পৌঁছাতে কষ্ট হচ্ছে।’

তিনি দেশের সকল মানবতাবাদি ভাই-বোনদের কাছে আর্থিক সহায়তার আহবান জানান।

খারনৈ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকেও একইরকম তথ্য পাওয়া গেলো। মহাঢেউ নদীর ঢলে আশ-পাশের গ্রামগুলির ব্যপক ক্ষতিসাধন হয়েছে।

সন্যাসীপাড়া থেকে শীতল জাম্বিল জানান, ‘ভারত থেকে আসা পাথর ও বালি আশপাশের আবাদি ফসল ঢেকে ফেলেছে। বাড়ির খাবার সামগ্রি ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নষ্ট হয়ে গেছে।’

ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ক্ষয়-ক্ষতি সবখানেই হয়েছে। তবে তীরবর্তী বাড়িঘর ও পশু-পাখি ভেসে গেছে। আহত হয়েছে অসংখ্য মানুষ। যার ভেতর শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাটাই বেশি।

খারনৈ ইউনিয়নের মধুকুড়া ও সুন্দরীঘাটের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। গলা পানিতে চালের উপর বসে না খেয়ে দিন-যাপন করছে শতাধিক পরিবার।

মধুকুড়ার ভূক্তভোগী সুনীল রিছিল দ্রুত মুঠোফোনে জানালেন, ‘দুইদিন ধইরে কারেন নাই। না খায়াই থাকতাছি। আমাগোরে বাঁচান?’

লেংগুড়া ইউনিয়নে যোগাযোগ করে জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলে নদী পাড়ের মানুষের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। এতে আদিবাসীদের ফসল ও খাবারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাস্তা-ঘাট ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় যুবনেতা যাকোব নকরেক বলেন, ‘আপাততো মানুষের খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে এভাবে চলতে থাকলে ইয়ারপুর, বালুচড়া, শিবপুর, তাঁরানগর, রাধানগর, মানিকপুর ও নলচাপ্রা গ্রামের মানুষগুলি সংকটে পড়বে।’

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক জনাব অঞ্জনা খান মজলিস আইপি নিউজকে বলেন, ‘কলমাকান্দায় ২০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। একই সাথে শুকনো খাবার সহ ত্রান তৎপরতা অব্যহত আছে।’

কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব মো: আবুল হোসেন বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ভেতরেও পানি ঢুকেছে। সবখানেই পানিবন্দি মানুষ। তাই একসাথে সবখানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের বিশেষ নজরে দেখা হবে।’

……………………………………..
বন্যার্ত আদিবাসীদের পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছুক মানবতাবাদীরা যোগাযোগ অথবা সাহায্য পাঠাতে পারেন।
পাঁচগাও গ্রাম :
চৈতী মানখিন – 01969162410 (বিকাশ)
গোবিন্দপুর :
তামস মানখিন
01965013895-6 রকেট
01965013895 বিকাশ

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.