বাজেটে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দের পাশাপাশি সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন -সোহেল হাজং

সাধারণত মে-জুন মাস আসলে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্লাটফর্মে আমরা জাতীয় বাজেট নিয়ে বেশি সরব হতে দেখি। কিন্তু নতুন অর্থ-বছরের খসড়া বাজেট তৈরির কাজ তারও আগে থেকে শুরু হয়। এরকম একটি কথা প্রায়ই শুনি, আদিবাসী ও অন্যান্য অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও পেশাজীবির মানুষ যখন আসন্ন বাজেটে তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে শেষ মুহুর্তে এসে কথা বলে তখন বাজেটে আসলে সময়ের অভাবে ঐ বিষয়গুলি অন্তর্ভূক্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এমনকি সংসদে অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত বাজেটের ওপর প্রায় একমাস আলোচনার পর কণ্ঠভোটে পাস হওয়া চূড়ান্ত বাজেটে তেমন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করি না।

এই জায়গায় আমার প্রশ্ন হল- সরকারের যদি ইচ্ছে থাকে, বাজেট প্রণয়ন কমিটি কেনইবা অন্তত বিগত বছরের এই মানুষগুলোর দাবিগুলোকে আমলে নিয়ে নতুন বাজেট পরিকল্পনায় তার প্রতিফলন ঘটান না? কারণ আদিবাসীসহ বিভিন্ন অনগ্রসর মানুষের জাতীয় বাজেটে প্রায় একই রকম দাবি-দাওয়ার কথা আমরা সবসময় শুনি।

এখন আসা যাক- সমতলের আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ প্রসঙ্গে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়টি নাহয় পরবর্তী আলোচনায় নিয়ে আসব।

আপনারা জানেন কি- চলমান ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সমতলের প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসী মানুষের জন্য বরাদ্দ কত ছিল?

মাত্র ১০০ কোটি টাকা। এই থোক বরাদ্দটি দেওয়া হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” নামক একটি খাতে। কারণ সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য এখনও পৃথক কোনো অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় নেই। তাই এরকম থোক বরাদ্দের এই খাতটিই প্রধান অবলম্বন হয়ে কাজ করছে।

যাহোক- জাতীয় বাজেটের যেখানে মোট ৬ লক্ষ ৩ হাজার ৬শত ৮১ কোটি টাকার (জাতীয় বাজেট ২০২১-২২ অর্থবছর) বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন হয়। তার মধ্যে এই ১০০ কোটি টাকা আসলে কিছুই না। কোনো কোনো আদিবাসী নেতা অংক কষেন এইভাবে, যদি দেশের সমতলে মোট ২০ লক্ষ আদিবাসী জনসংখ্যা হয়, তাহলে এই ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ফলে একজন আদিবাসীর ভাগে মাথাপিছু গড় অর্থ পড়ে বছরে মাত্র ৫০০ টাকা। গত অর্থবছরে যখন এই মানুষগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল ৮০ কোটি টাকা তখনও তাদের মাথাপিছু বরাদ্দ ছিল গড়ে মাত্র ৪০০ টাকা।

তাহলে আপনারাই বলুন- এই ৪০০ কিংবা ৫০০ টাকায় একজন অসহায় আদিবাসীর ভাগ্য একবছরে আসলে কতটুকুই পরিবর্তন আশা করা যায়? যদিও দরিদ্র আদিবাসীদের মধ্যে ৯০-৯৫% আদিবাসীই এ বরাদ্দের কোনো সুবিধা পান না কিংবা এ বরাদ্দ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।


এই অবহেলিত মানুষগুলোর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন তো আছেই কিন্তু আমি বরাদ্দের চেয়ে বাস্তবায়নের দিকে এখন একটু বলতে চাই।

১০০ কোটি টাকা বরাদ্দও আসলে একেবারেই তুচ্ছ কোনো ব্যাপার নয় আদিবাসীদের জন্য। আমরা যখন এইখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে ১০-১২ বছর আগে আন্দোলন শুরু করেছিলাম তখন সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮ কোটি টাকা। সে সময়, কোনো এক সাংসদ সংসদে বলেছিলেন সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। আজ তাদের বরাদ্দের আকার সেই ৮ কোটি টাকা থেকে ১৪, ১৫, ১৬, ১৮, ৩০, ৪০, ৫০, ৮০ কোটি টাকা এভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির এই যে ধীর গতি, তার ধারাবাহিকতা থাকলে, হয়তো আগামী বাজেটে এটি দাঁড়াবে ১২০ কোটি টাকায়। যদিও জনসংখ্যা অনুপাতে তাদের জন্য ন্যায্য বরাদ্দ ধরলে তা কয়েক হাজার কোটি টাকা হওয়ার কথা ছিল।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। তার প্রথমটি হচ্ছে, এ বরাদ্দ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে আদিবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণের কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই । আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে- এ বরাদ্দ বাস্তবায়নে উপজেলা পর্যায়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, উপকারভোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে মোটা অংকের অর্থ আদায়, নানা জটিলতা ও আদিবাসীদের নামে অ-আদিবাসীদের কাছে এ সেবা প্রদানে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি বরাদ্দ যেহেতু বাড়ছে- আদিবাসী অধ্যুষিত উপজেলা পর্যায়ে এসব মানুষের জন্য সেবাটিও কিন্তু বাড়ার কথা। ধরুন, সমতলে যদি আদিবাসী অধ্যুষিত ২০০টি উপজেলা হয়, তাহলে ১০০ কোটি টাকা বার্ষিক বরাদ্দের ফলে প্রত্যেকটি উপজেলায় গড়ে ৫০ লক্ষ টাকা এমনিতেই বরাদ্দ বন্টিত হওয়ার কথা। যদিও এখান থেকে একটি অংশ প্রধানমন্ত্রী নিজে তার কার্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত সমতলের দরিদ্র আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মাঝে এককালীন শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে থাকেন।

বরাদ্দের বাকি অংশ বাস্তবায়িত হয় উপজেলা পর্যায়ে- উপজেলায় চাহিদা মোতাবেক গাভী পালন, গৃহ নির্মাণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ল্যাট্রিন ও টিউবওয়েল স্থাপন, স্থানীয় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ প্রদানসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। অনেক উপজেলাতেই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সততা ও সুষ্ঠু হস্তক্ষেপে এ বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন আমরা লক্ষ্য করি। আবার কোনো কোনো উপজেলায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও নানা জটিলতার খবরও পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু সুবিধাবাদী স্থানীয় আদিবাসী লিডারদের নিয়েই সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে কন্ট্রিবিউশনের নামে একটি মোটা অংকের অবৈধ অর্থ আগে থেকেই গরীব উপকারভোগীদের কাছ থেকে উত্তোলন করা হয়। পত্র-পত্রিকায় আমরা এসবের কিছু খবর ছাপাতেও দেখি। আবার দেখা যায়, কোনো কোনো উপজেলাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী না থাকলেও বরাদ্দ নিয়ে তাদের নাম দেখিয়ে অন্যরা এসব সুবিধা আত্মসাৎ করছে। এই বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো উপজেলায় একটি করে সুবিধাবাদী চক্রও তৈরি হচ্ছে বলে শোনা যায় যারা ‘আদিবাসী’ নাম ব্যবহার না কওে সরকারের পছন্দনীয় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ নামে সংগঠন খুলে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নিবন্ধন নিয়েছে এবং এ বরাদ্দ বাস্তবায়নের কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এসব জায়গায় আমাদের আরো বেশি করে নজর দেয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে বলব, শুধু বাজেটে অনগ্রসর আদিবাসী মানুষের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ প্রদান ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই চলবে না। আদিবাসীদের নিকট সরকারি সেবাটি যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আদিবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণে সরকারের উচ্চ থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বরাদ্দের সুষ্ঠু বন্টন প্রয়োজন। যেন এ বরাদ্দ বাস্তবায়নের অনিয়ম ও অপচয় রোধ হয়।

সোহেল হাজং, কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.