জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রংপুর জেলা কমিটি গঠন প্রস্তুতি ও কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবিতে কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ। রংপুর সদর উপজেলা কমিটি গত ২৮ শে এপ্রিল বেলা ১১ টায় রংপুর জেলা ওয়ার্কাস পার্টি অফিসে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে রংপুর জেলার পাঁচটি উপজেলা রংপুর সদর,বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ ও পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠক নেতৃত্ব বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

রংপুর সদর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক বিমল খালকো এর নেতৃত্বে উক্ত কর্মী সম্মেলন সভা শুরু করা হয়, সভার শুরুতে তিনি পাঁচটি উপজেলার যে সমস্ত আদিবাসী সংগঠকরা স্বাগত বক্তব্য দেন এবং তাদের এলাকাভিত্তিক যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো তার উপস্থাপন করেন।

বক্তব্যের শুরুতেই বদরগঞ্জের আদিবাসী শিক্ষক ক্ষুদিরাম কেরকেটা ত বলেন,আদিবাসীদের আদিকাল থেকে জমি-জমা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে এবং চলছেই এতে করে বাঙ্গালী প্রভাবশালীদের ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে আদিবাসীদের জমি তাদের দখল করে নিচ্ছে যার জন্য অনেক আদিবাসী পরিবার অনেকেই ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে, এর জন্য আদিবাসীদের কে একত্র হতে হবে। আন্দোলনের ডাক দিতে হবে এবং যাতে করে বাঙ্গালীরা শুরু করে অন্য কেউ যেন জোরজবস্তি করে জমিজমা দখল করতে না পারে সেসব বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মিঠাপুকুর আদিবাসী নেতা গোলাপ বাড়া বলেন, বর্তমানে আদিবাসীদের সমাজে মাদকের প্রভাব টা বাড়িয়ে যাচ্ছে যার জন্য আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ঝাড়িয়ে পড়তেছে। এগুলো বিষয়ে নজরদারি করার জন্য আদিবাসী অভিভাবকদের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য সকলকে আহ্বান করেন। তিনি আরো বলেন, শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়লে আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়বো এবং উন্নতি থেকে পিছিয়ে পড়বো। আমরা যদি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারি তাহলে আমাদের জাতিকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। তখনই আমাদের জাতি শিক্ষায় পরিপূর্ণতা লাভ করবে এবং উন্নত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। আর আমরা তখনই একটি উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে জায়গা করে নিতে পারবো।

মিঠাপুকুর উপজেলার আদিবাসী শিক্ষক মোহনলাল কুজুর তিনি বলেন, শুধু শিক্ষার দিকে অগ্রসর হলে হবে না। আদিবাসীদের যে সংস্কৃতি-কৃষ্টিকালচার রয়েছে সেগুলোকে চর্চা করতে হবে ও ঠিকিয়ে রাখতে হবে। চর্চা করার জন্য রংপুর জেলায় একটি সংস্কৃতি একাডেমির দাবী তুলে ধরেন এটি থাকলে আমরা সহজেই চর্চা করতে পারবো।

এছাড়াও বক্তারা বলেন, বর্তমানে আদিবাসীদের মাঝে যৌতুক প্রথা প্রচল দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আদিকাল থেকে আদিবাসীদের বিয়ে রীতিতে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া হতো না। এগুলো পরিহার করার জন্য আমাদের প্রত্যেক আদিবাসী নেতাদের কে অগ্রসর হতে হবে এবং সচেতনতা করতে হবে। কারন যৌতুক দেওয়া-নেওয়া বেআইনি।

বদরগঞ্জ উপজেলার বাবু ধীরেন কর্মকার তার বক্তব্য বলেন, এখনো অনেক জায়গায় আদিবাসীদের খাস জমিগুলোতে কবরস্থান হিসাবে ব্যবহার করতো কিন্তু বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সেগুলো দখল করে তারা ভোগ করতেছে যার ফলে আমাদের কবরস্থান গুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে তারা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।

উক্ত কর্মী সম্মেলন সভায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টির রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সরকার উপস্থিত ছিলেন, তিনি সবার বক্তব্যের আলোকে বলেন, আদিবাসীদের আরো সচেতন হতে হবে বিশেষ করে নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে লড়াই করতে হবে, প্রয়োজনে রাজপথে নামতে হবে। যেমন করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকবাহিনীদের কে পরাধীন করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি ঠিক সে ভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করতে হবে।

কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক রামপ্রসাদ মাহাতো তিনি উক্ত কর্মী সম্মেলনে উপস্থিত থেকে বলেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সকল আদিবাসীদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং যেখানে সমস্যা সেখানেই সমাধান আছে, কাজেই জাতীয় আদিবাসী পরিষদের যে ১৬ দফা দাবিগুলো আছে সেগুলোর জন্য আন্দোলন চলবে। সমতলের সকল আদিবাসীদের একতা বদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে বলে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, সমতলের আদিবাসীদের আরো অগ্রসর হতে হবে রাজপথে যুদ্ধ করতে হবে কেননা কেউ এমনি এমনি কিছু দেয় না,তাই আমাদের কে লড়াই করে বাঁচতে শিখতে হবে। যেমন, আদিবাসীদের সাংবাধিনিক স্বীকৃতি এখনো দেয়নি সরকার, কিন্তু আমরা কি এদেশের নাগরিক না? আমরা কি এদেশের জন্য যুদ্ধ করিনি? তাহলে আমাদের কেনো আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিবে না সরকার? সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে, তবেই আমাদের ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো। আদিবাসীদের ভাষা,সাহিত্য ও সংস্কৃতি রক্ষা
ও চর্চার অনুকুল পরিবেশ,গবেষণার ক্ষেত্রে প্রস্ততসহ আদিবাসী একাডেমি গঠন করতে হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আদিবাসীদের সকলকে রাজপথে আসার জন্য আহ্বান করেন,যতদিন আমাদের দাবি পূরণ করেনি ততো দিন আমাদের সংগ্রাম চলবে এবং চলবেই।
আরও তিনি জানিয়ে দেন, আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন, আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি পূরণসহ ১৬ দফা দাবিতে জেলায় জেলা ডিসি অফিস ঘেরাও এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি হবে। সমতলের সকল আদিবাসীদের কে দলে দলে যোগদান করার জন্য আহ্বান করেন।

উক্ত সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রংপুর জেলা সভাপতি মনিলাল রবিদাস, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রংপুর সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি শ্রী আলাল সিং, সাংগঠনিক সম্পাদক, তুলিপ এক্কা। মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ,পীরগঞ্জ,ও পীরগাছার দুলাল কেরকেটা, বৈদ্যনাথ খালকো,ক্ষুদিরাম কেরকেটা,ধীরেন কর্মকার,সুমন খালকো,নীল শিকারী,মামুন তুরী,ইলিয়াস হাসঁদা,গোলাপ বাড়া, মোহন লাল কুজুর, বিক্রম কর্মকার,মিলন তিগ্যা,রেফায়েল মার্ডী, শ্রীকান্ত সিং,রতন তুরি,রনজিত কেরকেটা,দেশা কিসপট্টা,ফিলিমন মিনজী,শ্যামল মিনজী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা বিষ্ণু সরেন প্রমুখ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.