পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা গণমুখী ও বাস্তবমুখী হতে পারেনি-সন্তু লারমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা গণমুখী ও বাস্তবমুখী হতে পারছে না। যার কারনে পাহাড়ের অসহায় মেহনতি মানুষের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মাননীয় চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু লারমা)। ২০ মার্চ ২০১৭ শিজক কলেজ মাঠে কলেজের এইচএসএসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন।

শিজক কলেজ মাঠে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ সুভাষ দত্ত চাকমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমা, শিজক কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমান, শিজকমুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জ্ঞানময় চাকমা, সারোয়াতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তুষার কান্তি চাকমা ও কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অন্তর চাকমা প্রমূখ।

সন্তু লারমা আরো বলেন, শিজক কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে অত্রাঞ্চলের মানুষের শুধু উদ্যেগ নয়-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এটা খুবই প্রশংসনীয় মনে করি, এই কলেজে যারা শিক্ষার্থী সমাজ রয়েছেন, শিজক কলেজকে পরিচালনা দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষক সমাজ এবং এখানকার অভিবাবক সমাজ সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশকে ঘিরে পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষার অনুকুল পরিবেশকে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছে। আমার প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে এই কলেজ থেকে চলে যাচ্ছেন আপনাদের মধ্যে থেকে অনেকেই পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উচ্চ শিক্ষার আশায় আরো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবেন। আজকে এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা আছে-নিঃসন্দেহে সেই ব্যবস্থাপনা, সেই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের উৎসাহিত করতে পারেনা। আমাদের দেশে শিক্ষাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে-সাধারণ শিক্ষা, কারিগরী শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষা। বস্তুতঃ আমাদের জুম্ম ছাত্র সমাজকে যেই শিক্ষায় শিক্ষিত করার দরকার সেই শিক্ষা আমাদের দেশে এখনো গড়ে উঠতে পারেনি।

আমাদের দেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা নিযুক্ত আছেন, যারা নীতি নির্ধারণ করেন তাদের সম্পর্কে যদি এই শিক্ষা ঘিরে বলা যায়-তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, সেখানে যথাযথ নীতি আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। আজকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বছরকে বছর ধরে পরীক্ষামূলক একটা ব্যবস্থা চলছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা হতে হবে গণমুখী ও শিক্ষা হতে হবে বাস্তবমুখী। আমাদের দেশে প্রাষ্ঠানিক যে শিক্ষা হয় সেখানে শিক্ষার অর্জনের প্রক্রিয়াটা অপূর্ণতা থেকে যায়। যে শিক্ষা ব্যবস্থা সমাজ ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে বা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে যদি শিক্ষা দেওয়া হয় তাহলে সেই শিক্ষা যথাযথ হতে পারে না। প্রসঙ্গত তিনি আরো বলেন, যারা বয়স্কো এই পার্বত্যাঞ্চলে যে শিক্ষা ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল বলা যেতে পারে বিগত শতাব্দী শুরু থেকে আমরা দেখেছি আমাদের পার্বত্যাঞ্চলে যারা বসবাস করতেন-যারা জুম্ম জাতি নিজেদের জীবনকে যারা নিজস্বভাবে গড়ে তোলা, নিজস্বভাবে জীবনকে পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন-সেই সময়ের কথা আমরা এক কথায় বলবো, এই পার্বত্যাঞ্চলে যারা বসবাস করেছেন তারা স্বাধীনভাবে বসবাস করতেন।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা জর্জরে অবস্থা। শতশত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজারো শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। এই অঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থা সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। যারা শিক্ষক নিয়োগ করেন সেই কতৃপক্ষ দুর্নীতি মধ্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠতে না পারলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ব্যবস্থা ও মুখ ঠুবরে পড়ে থাকবে। এই অব্যবস্থার মধ্যে শিক্ষা এগিয়ে যেতে পারে না। এখানে শিক্ষকের অভাব-শিক্ষাক্ষেত্রে যে অসঙ্গতি ও নানাবিধ সমস্যা রয়েছে সেগুলো দুর করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে কলেজের শিক্ষা কিভাবে ভাল হতে পারে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা যদি এভাবে থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে কয়জন অংশগ্রহণ করতে পারবে। আজকে রাজনৈতিক কারনে অথবা বিশেষ উন্নয়নের কারনে যদি এধরণের শিক্ষা আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হতে থাকে তাহলে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারবো না, সেটাই নির্মম বাস্তবতা। আমাদের শিক্ষার্থী বন্ধুদের এসবগুলো অনুভব করতে হবে।

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ সম্পর্কে সরকারের কাছে আমরা দাবী করেছিলাম প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা এবং যে সমস্ত সরকারী কলেজ আছে সেগুলো যাতে আরো যথাযথভাবে পরিচালিত হতে পারে সেই ধরণের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের নিকট বারেবারে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সরকার সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তারা রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় গণবিরোধী ভূমিকা নিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে এই পার্বত্যাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে আমরা দাবী করেছিলাম একটা প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউট। এসকল প্রাথমিক বিষয়গুলো আগে গুরুত্ব না দিয়ে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা যথাযথ নয় বলে জুম্ম জনগন মনে করে।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, শাসকগোষ্ঠীর ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন কার্যকর করা হচ্ছে না। আঞ্চলিক পরিষদ এখনো তার দায়িত্ব ক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। আঞ্চলিক পরিষদ কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখী। পার্বত্যাঞ্চলে সামগ্রিক জীবনধারায় এই পরিষদ ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবারও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বান্তবায়নে সরকারকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.