মাংরুদাম রক্ষায় গারোদের খিম্মা স্থাপন

টাঙ্গাইলের মধুপুরে ‘মাংরুদাম’ (শ্মশান) রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন গারো আদিবাসীরা। বুধবার এই মাংরুদাম দখলের প্রতিবাদ হিসেবে খিম্মা (মৃত লোকের উদ্দেশ্যে স্মৃতিস্তম্ভ) স্থাপন করেছেন তারা।

মধুপুর শালবন আচ্ছাদিত টেলকি গ্রামে গারোদের প্রাচীন মাংরুদামে (শশ্মান) সাবেক সং নকমা (গ্রাম প্রধান) পিটিশন হাদিমার নামে গ্রামের মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে গারো রীতি অনুসারে ঐতিহ্যবাহী খিম্মা স্থাপন করা হয়। খিম্মা স্থাপনের পর গারোদের সর্বোচ্চ সন্মাননার প্রতীক হিসেবে খিম্মায় খুতিপ, দমি পরানো হয়। এরপর মৃত লোকের উদ্দেশ্যে খামাল নরেশ মৃ-এর পরিচালনায় পূজা নৈবেদ্য ও পুরোহিতের সহযোগীর মাধ্যমে খ্রিকা (রণনৃত্য) পরিবেশন করা হয়।

আদিবাসীরা জানান, টেলকি গ্রামে তথাকথিত আরবোরেটাম বাগান সৃজনের নামে আদিবাসীদের প্রাচীন মাংরুদাম (শশ্মান) এর স্থানে প্রাচীর নির্মাণ ও প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করেছে বনবিভাগ। মাংরুদাম গারো আদিবাসীদের কাছে পবিত্র স্থান। ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান শাসনামল পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছরেও মধুপুর গড়াঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা ও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। উপরন্তু বিভিন্ন সরকারের সময় জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক, ইকো-ট্যুরিজম, ফায়ারিং রেঞ্জ ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের নীল নকশা করেছে। বিভিন্ন সময় সরকারের বনবিভাগ অপরিকল্পিত, পরিবেশ আগ্রাসী ও বন বিনাশী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিউ চিরান বলেন, টেলকি গ্রামের পূর্ব পুরুষদের এই পবিত্র মাংরুদামের উপর বনবিভাগ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তথাকথিত আরবোরেটাম বাগান ও প্রাচীর নির্মানের নামে ঐতিহ্যবাহী এই মধুপুর বনের সন্তানদের শিল্প, সংস্কৃতির উপর আগ্রাসন চালাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব বনবাসী মানুষের শিল্প ও সংস্কৃতি রক্ষা করা। আদিবাসীদের সাথে আলোচনা না করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন আদিবাসীদের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং মাংরুদামের জায়গায় আরবোরেটাম প্রকল্প নির্মাণ বন্ধ করারও জোর দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস) এর কেন্দ্রীয় সভাপতি জন জেত্রা বলেন, বন বিভাগ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে যে আরবোরেটামের নামে কৃত্রিম বন সৃজন করছে, এটা গারোদের ঐতিহ্যবাহী পবিত্র মাংরুদাম তথা সংস্কৃতির উপর চরম আঘাত।

গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশন (জিএসএফ) এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিয়াং রিছিল বলেন, মধুপুর গড়ে সরকার উন্নয়নের নামে যে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তা আসলে আদিবাসী উচ্ছেদেরই নামান্তর। বনবিভাগ মাংরুদাম তথা শশ্মানের মত এই পবিত্র স্থানের উপর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গারোদের এই খিম্মা স্থাপন প্রতিবাদ বলেও মনে করেন এই ছাত্র নেতা। অবিলম্বে আদিবাসীদের নামে মিথ্যা বন মামলা প্রত্যাহারসহ টেলকীর প্রাচীন শশ্মান ভূমিতে প্রাচীর নির্মাণ ও প্রকল্পের সব স্থাপনা বন্ধ করারও জোর দাবি জানান এই আদিবাসী ছাত্রনেতা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.