পয়মনি চিরানের বেদনাগাথাঃ যাকে জ্যান্ত পুতে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল-কাঞ্চন মারাক

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি শেরপুর। ছোট-ছোট পাহাড় আর সবুজ অরণ্যে ঘেরা সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুর। এই জেলার দুর্গম এলাকাজুরে হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যে অন্যতম গারো, কোচ, হাজং ও বর্মন ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী। পাহাড়ি এই অঞ্চলকে অনেকেই গারো পাহাড় বলেও ডাকেন। প্রতিবছর হাজারো পর্যটক আসেন শেরপুরের সৌন্দর্য দেখতে। একরাশ মুগ্ধতা ও প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরেন। কেউ কেউ কৌতুহলবশত আদিবাসী এলাকায় প্রবেশ করে আদিবাসীদের নিয়ে নানান তথ্য সংগ্রহ করেন। উৎসব কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খোজ নিলেও এলাকার নানা উন্নয়নের শ্লোগানে আদিবাসীদের বেদনার কথাগুলো চাপা পড়ে থাকে।

এই পৃথিবীতে কষ্টহীন মানুষ পাওয়া মুস্কিল, কিন্তু কিছু মানুষের কষ্টগুলো সবার থেকে আলাদা। কেউ যদি পাহাড়ের পাদদেশে বাস করা আদিবাসী জনগনের কষ্টের গল্পগুলি শুনেন, তবে শুধু সৌন্দর্যে মুগ্ধতা বা প্রশান্তি নিয়েই নয়, হয়তো ফিরতে হবে অব্যক্ত কিছু কষ্ট নিয়ে। ভাববেন উন্নয়নের মহাসড়কে আজও এত অসহায় মানুষ থাকতে পারে!

পাহাড়ি গাছ-গাছালীতে ভরা শ্রীবরদী থানাধীন সীমান্তঘেষা ছোট্ট গ্রাম বালিজুরি খ্রিষ্টান পাড়া। গ্রামের ছোট্ট একটা ঝুপড়িতে বাস করে পয়মনি চিরান।

পয়মনি চিরান (৪০), পিতৃহীন পরিবারে স্বামী রুপন রেমা (৪৫) ও বয়স্ক মা জর্মন চিরানকে (৭৫) নিয়ে বাস করেন ছোট্ট কুটিরে। ছেলে-মেয়ে নেই। ৩ জনের সংসারে স্বামী রুপন রেমা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি দিনমজুরের কাজ করেন, সেটাও আবার মাঝে-মাঝে জুটেনা।

পয়মনি শারীরিক প্রতিবন্ধি, ওর পায়ের পাতা নেই। তাই বসে বসে যতটুকু সামর্থ ততটুকুই কাজ করে। ঠিকমতো চলতে ফিরতে পারে না। হাটার জন্যে পায়ে বিশেষভাবে তৈরী করা জুতা পরতে হয়। যা প্রতি ৬ মাস অন্তর ৭ হাজার টাকায় অর্ডার করে বানিয়ে আনতে হয়। স্বামীর সামান্য আয়ে একবেলা খাবার পেটে জুটেনা, তাহলে জুতা মিলবে কোথা থেকে? তাই ৬ মাসের জুতা ৮ মাস ৯ মাস পর, আর মাঝে-মাঝে ১ বছর পর পাল্টান। ছিঁড়া-ফাটা জুতো পড়ে প্রস্রাব-পায়খানা বা হাত-মুখ ধোবার টিউবওয়েল পর্যন্ত তার নেই। এসব সারতে হয় পাশের বাড়িতে গিয়ে।

এই অসহায় মহিলার বাসায় টিউবওয়েল, পায়খানা, বিদ্যুৎ-সংযোগ এসব তো দুরে থাক থাকার মতো ঘর পর্যন্ত নেই। যে ভিটায় ঘর করে আছেন, সে জমিটা বনবিভাগের। তাকে ভূমিহীন, সম্বলহীন, অর্থহীন, সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় অর্থাৎ, এককথায় একেবারে নিঃস্ব বলা যায়।

পয়মনি জন্মগত প্রতিবন্ধি, আবার জন্ম পরবর্তি প্রতিবন্ধি। তার জন্ম পরবর্তি প্রতিবন্ধি হবার লোমহর্ষক গল্পটা শেরপুরের সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি জনাব রফিক মজিদের ২০০৪ সালে লেখা “ফারমনির নির্বাসিত জীবন ” নামক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। যেখানে উল্লেখযোগ্য উক্তি ছিলো, “হয়েছিলো জীবন্ত পুতে ফেলার সিদ্ধান্ত”। এই দুটো লাইন থেকেই আঁচ করা সম্ভব কত ভয়ংকর পয়মনির অতীত।

গল্পটি জানতে ফিরে যেতে হবে ২০ বছর আগের সেই দিনে, যখন তিনি ২৪ বছরের যুবতী। এলাকায় তখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি, অনেকটাই জঙ্গলে ঘেরা ছিলো। দিন-দুপুরে ছিলো বন্যপ্রাণী বাঘ-শেয়ালের উৎপাত। তার বাড়িটা ছিলো মার্সি নদীর ওপার পাশের খারামোড়া গ্রামে। পয়মনি খুব ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়ে, খাবার খেয়ে – না খেয়ে বড় হয়েছেন। মা জর্মন চিরান পরের বাড়িতে কাজ করে কষ্টে সংসার চালাতেন। হঠাৎ একদিন পয়মনির পায়ে ঘা দেখা দেয়। ডাক্তার-কবিরাজ কেউ সাঁড়াতে পারেনা। তখন শ্রীবরদীতে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশনে যোগাযোগ করা হয়। তারা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয় এবং কিছুটা সুস্থ্যতা লাভ করেন। কিন্তু, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, কয়েক মাস পর আবারো ঘা দেখা দেয়। চিকিৎসাহীনতায় দিন-দিন অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এক সময় গ্রামবাসীরা একে প্রাণঘাতী ছোঁয়াচে রোগ বলতে থাকে এবং পয়মনিকে পাশের জঙ্গলে ফেলে রেখে আসে। যদিও দূরত্ব মেনে খাবার দিয়ে আসা হতো কিন্তু, এভাবেই চলে দুই মাস। অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। পয়মনির পা পঁচে ক্ষয়ে যেতে থাকে, গ্রামবাসী আরোও আতঙ্কিত হয়। একটা গ্রাম্য বৈঠক ডাকা হয়, যেখানে তার মা জর্মন চিরান ছিলো। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় – ‘তাকে জীবন্ত পুতে ফেলার’!!! সকলে মিলে দিন-তারিখ নির্ধারণ করে!!!

একদিন ভায়াডাঙ্গা বাজারের কর আদায়কারী মিন্টু রাম জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা মেয়ের গুঙানী শুনতে পান এবং সামনে গিয়ে পয়মনিকে দেখেন। তারপর গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ভয়ংকর সিদ্ধান্তের ব্যপারটা জানেন এবং দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কম্প্লেক্সে ভর্তি করান। বিষয়টা শেরপুরের মাদার তেরেজা ও মানবাধিকার কর্মী রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার কানে যায়। তিনি দ্রুত ছুটে আসেন এবং অবস্থা বেগতিক দেখে শেরপুর সদর হাসপাতালে নেন। পরবর্তিতে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকাতেও নেন। এরপর পুরোপুরি সুস্থ্যতার জন্যে নিজের বাসায় বহুদিন পরিচর্যা করেন। বহুদিনের যত্ন ও পরিচর্যায় ঘা ভালো হয়। তবে ক্ষয়ে যাওয়া পায়ের পাতা সেভাবেই থাকে।

সাংবাদিক রফিক মজিদের প্রতিবেদনে এমনটাই জানা যায়। তখনকার সময়ে অনলাইন নিউজপোর্টাল সেভাবে বিস্তার লাভ করেনি, পত্রিকা পড়তো গুটিকয়েক সচেতন ব্যক্তি। তবুও প্রতিবেদনটি ব্যপক সাঁড়া ফেলে দেয়। এক আদিবাসী মানবতাবাদী বোন এগিয়ে আসেন এবং পয়মনিকে তার বাসায় থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা করেন।

সেখান থেকে কয়েক বছর পর চলে আসেন গ্রামে এবং স্বামী রুপন রেমাকে বিয়ে করে সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। এভাবেই অভাব অনটনে চলতে থাকে তার দিন। স্বামীর সামান্য আয় ও প্রতিবন্ধি ভাতার টাকায় কোনরকমে সংসার চলে। পরবর্তিতে খাড়ামুড়া গ্রাম ছেড়ে বালিজুড়িতে আসেন।

বাড়িটা পাহারের নিচে, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট একটা ঝড়না। কিন্তু, মনমুগ্ধকর এ জায়গা তার মনে শান্তি এনে দিতে পারেনা। বন্য হাতির আক্রমন ও বনবিভাগের অত্যাচারে এখানে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাটা অসম্ভব হয়ে উঠে।

ভুমিহীন পয়মনির বাড়িটা বনবিভাগের জমিতে, তাছাড়া চাষাবাদের জায়গা না থাকায় বাড়ির পাশে খালি পড়ে থাকা বনবিভাগের ৬ শতাংশ জমিতে কিছু সবজি চাষ করেন। এতে নিজের খোরাকটুকু চলে। একদিন এখানেও হামলা চালায় বনবিভাগ।গতবছর ১২ আগস্ট বনবিভাগের বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম গং ভারতী, সভানী, সবিতা, কমলা ও তার কষ্টে ফলানো সবজি বাগান ও বাড়ির আঙিনায় লাগানো গাছ কেটে ধ্বংস করে দেয়। এর প্রেক্ষিতে ১৩ আগস্ট বাগাছাসের নেতৃত্বে ‘৫ আদিবাসী পরিবারের সবজি বাগান ও ফলজ গাছ কেটে ফেলার প্রতিবাদে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও রেঞ্জ অফিস ঘেরাও কর্মসূচি’ পালন করা হয়। বাগাছাস ৭ দিনের আল্টিমেটাম ঘোষনা করে। তারপর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা থেকে সম্মিলিত নাগরিক সমাবেশ আসে, সংবাদ সম্মেলন করেন। প্রশাসন সুবিচার ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেন।

কিন্তু পরবর্তিতে তেমন কিছুই দেখা যায়নি বলে জানিয়ে পয়মনি চিরান বলেন, “আমি অশিক্ষিত-বোকা ও অসহায় মানুষ। কিছু বুঝিনা বলে যে যা সিদ্ধান্ত নেয়, শুধু চুপচাপ দেখে যাই। আমার নিজের জীবনের প্রতি একটা ক্ষোভ তৈরী হয়েছে (গারো ভাষা থেকে অনুবাদকৃত)।” তবে বাগাছাস, টিএনও, টিডব্লিউএ, অমর্ত্য ফাউন্ডেশন, পাশে আছি ইনিশিয়েটিভ, সম্মিলিত নাগরিক সমাজ অর্থাৎ যেসকল সংগঠন বা ব্যক্তি তার দুর্দিনে ছিলেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

পয়মনির অভাব বা কষ্টকে আরোও গুছিয়ে প্রকাশ করেছেন আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও বাগাছাস কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ। পয়মনির সাথে সাক্ষাৎ শেষে তিনি লিখেছিলেন, যখন তিনি তার উঠানে পৌঁছালেন, তখন অনেকটা থমকে গেলেন। এতোসব সরকারী-বেসরকারী বাজেট কোথায় বাস্তবায়িত হয়, নিজেকে প্রশ্ন করেন। কারন পয়মনির ঘরটা এতোটাই ছোট যে দুটো গরু একসাথে থাকতে পারবে না। বসার কোন ব্যবস্থা নেই। কারিতাস বাংলাদেশের দেয়া একটা ঘরে মা থাকেন, উপরে ৫০ ওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল। রাতে আলো জ্বলে কী জ্বলে না। মা জর্মন চিরান বৃদ্ধ মানুষটা পাশের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন। টিউবওয়েল, পায়খানা, ভিটে, ঘর, গবাদী পশু-পাখি, আবাদী জমি অর্থাৎ কোন কিছুই নেই তার। জুতো ৮ মাস চলে বদলানো হচ্ছে না। সব মিলিয়ে একটা মানুষের এতো অভাব থাকতে পারে ভেবে খুবই ব্যথিত হলেন। আবার ক্ষোভ প্রকাশ করলেন স্থানীয় সরকারী-বেসরকারী অফিস ও সচেতন ব্যক্তিবর্গের উপর। কারন অনেক বাজেট থেকে কেউ কী পয়মনিকে খুঁজে পায়না! কেউ কী দেখিয়ে দিতেও পারে না!

তারপর নিজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন থেকে পাশে দাঁড়ালেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ত্রান ও আর্থিক সহায়তা, অমর্ত্য ফাউন্ডেশনের ত্রান ও আর্থিক সহায়তা, পাশে আছি ইনিশিয়েটিভের ত্রান ও ঘরের চাল হিসেবে টিন বিতরন ইত্যাদি।

তাতে কী সব অভাব ঘুচে!

মা জর্মন চিরানের সাথে কথা বলে জানা যায়, কিসের বড়দিন-কিসের নববর্ষ-কিসের উৎসব। তার কাছে শুধুই শীতকাল। পাতলা চাদর জড়িয়ে কাটাবেন পুরো শীত। সবার মতো পিঠা তৈরীর মতো বিলাসিতা তাদের নেই।

তিনি কেঁদে বলেন, “সৃষ্টিকর্তা যেনো কষ্ট জিনিষটা এই বাবামরা অভাগীকে দিয়েছেন। আজ ১০ মাস চলে, ছিঁড়া-ফাটা জুতো পড়ে চলছে। আশা করি ভাতার টাকা পেলে জুতো নেয়া যাবে। এদিকে কয়েকবছর ধরে আমার চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমি মরলে কে দেখবে আমার মেয়েকে।”

পাশ থেকে রুপন রেমা ছল-ছল চোখে বলে উঠেন, “আমি পরের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাই, সবসময় কাজ জুটে না। মাঝে-মাঝে না খেয়ে থাকতে হয়, তাহলে তার জুতা বা শাশুরীর চোখের চিকিৎসা কিভাবে হবে। এদিকে নিজের আবাদ বা কর্মসংস্থান থাকলে নাহয় চলতো।”

পয়মনির বাঁচার আকুতি কোন পর্যটক মন শুনলে পাবে কী পাহাড় মুগ্ধতার সুখ? হয়তো বিবেক থেকে মানবতাবাদি মনটা ভেতর থেকেই হু-হু করে উঠবে। জানুয়ারি-মার্চ মাস ভ্রমন পিপাসুদের শিক্ষাসফরে শেরপুর আসার সময়। পর্যটকদের সমাগমে মূখরিত হবে সীমান্তঘেষা এলাকা। কিন্তু সৌন্দর্যের ফাঁকেই বাস করছেন পয়মনি। যার কাছে জীবন মানে অভিশাপ, কষ্ট যেনো তার কষ্টে ব্যথিত হয়। আনন্দ শেষ কবে এসেছিলো জানা নেই। শুধু জানে, একদিন এই অবহেলাময় জীবনে যন্ত্রনা নিয়েই মরতে হবে তাকে। কিছু মানুষের গল্প শুনলে মনে হয়, কষ্ট নামক শব্দটি এদের জন্যে বিশেষভাবে সৃষ্টি করা।

পয়মনি মরেছেন বহুবার, প্রতিটি মুহুর্তে মরেন। যমদূতকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পয়মনি জানেনা তার অদূর ভবিষ্যৎ কেমনে কাটবে। তবুও আশাবাদী, হয়তো কোন এক দেবদূত এসে রূপকথার মতন ঘুচিয়ে দেবেন পয়মনির কষ্ট। পয়মনি আশা করেন বাকিটা জীবনে অন্তত উচ্ছেদ আতঙ্ক, অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও সমস্যা না দেখে সহজ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সৌভাগ্য।

কাঞ্চন মারাক, বাবেলাকোনা
১০ জানুয়ারী ২০২২ খ্রি:

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.