ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে আদিবাসীরাঃ ’২১ সালের মানবাধিবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশিষ্টজনরা

ফিরে দেখা ২০২১-

বিশেষ প্রতিবেদনঃ আর একদিন পরেই বিদায় নিচ্ছে ২০২১ সাল। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসীরা পার করল আরেকটি বছর । এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, বাঙালি জাতির পিতা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মজয়ন্তীর আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মত। কিন্তু এসব মহা-আয়োজন ও উৎসবের রং কী দেশের নানাক্ষেত্রে প্রান্তসীমায় বসবাসরত আদিবাসীদের’কে স্পর্শ করতে পেরেছে?

এমন প্রশ্নে আদিবাসী সমাজের বিশিষ্টজন, জাতীয় পর্যায়ের আদিবাসী গবেষকরা বলছেন, ২০২১ সালে আদিবাসীরা যে ধরণের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেল তা ক্রমশ তাদেরকে সংকুচিত করছে।ক্রমশ অবনতি হচ্ছে তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি।

২০২১ সালে আদিবাসীদের আলোচিত কিছু মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা:

লাকিংমে চাকমা অপহরণ ও অস্বাভাবিক মৃত্যুঃ

২০২১ সালের শুরুর দিকে একটি আলোচিত ঘটনা হল কক্সবাজারের লাকিংমে চাকমা’র অপহরণ এবং অপহরণের পর অস্বাভাবিক মৃত্যু। ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারী কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নিজ বাড়ী থেকে অপহৃত হন ১৪ বছর ৯ মাস বয়সী সপ্তম শ্রেণীর এই কিশোরী। স্থানীয় যুবক আতাউল্লাহর নেতৃত্বে অপহরণের পর জোরপূর্বক লাকিংমে’কে অবৈধভাবে বিয়ে করে আতাউল্লাহ। পরে সেবছরই ৯ ডিসেম্বর মারা যান লাকিংমে চাকমা। এই মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক, যার ১২ দিন আগে একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন লাকিংমে চাকমা। কিন্তু মৃত্যুর পর আইনী জটিলতায় ২৬ দিন তার লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে ছিল। পরে লাশ পান লাকিংমে’র বাবা লালাঅং চাকমা। এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়নি।

চিম্বুকে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণঃ

ঢাকায় শাহবাগে চিম্বুকবাসী ম্রো জনগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংহতি সমাবেশ।। ২ মার্চ ২০২১।

এদিকে ’২১ সালের ফেব্রুয়ারীতে বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে সিকদার গ্রুপ ও আইনরক্ষাকারী বাহিনীর একটি ডিভিশনের উদ্যোগে ‘ম্যারিয়ট হোটেলস এন্ড রিসোর্টস’ নামে একটি পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে। এ নিয়ে নাগরিক সমাজ ও চিম্বুকের ম্রো আদিবাসীরা ২ মার্চ ঢাকার শাহবাগে একটি সমাবেশ করে এবং সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারক লিপিও পেশ করা হয়। এ নিয়ে জাতিসংঘ, দেশের নাগরিক সমাজ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ বিষয়ে উদ্বেগ জানায়। সর্বশেষ ২০২১ সালের ৭ মার্চ চিম্বুকের রামহরি পাড়া থেকে ৩০ কিলোমিটার পথে লংমার্চ করে ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ এর প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে এই হোটেল নির্মাণের কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।

কুলাউড়ার খাসিয়াপুঞ্জির পানগাছ কর্তন:

মোলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের বেলুয়া পুঞ্জির খাসিয়া আদিবাসীদের ২৮০০ পানগাছ স্থানীয় কিছু বাঙালি দুষ্কৃতিকারী দ্বারা কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে । গত ২৫ আগষ্ট রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় মামলা হলেও এখনো কোনো সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি।
কেটে দেয়া পান লতা টেনে নিচ্ছেন এক খাসিয়া শিশু।। ছবি: সংগ্রহীত


বাগদা ফার্মের সান্তাল’দের জমিতে ইপিজেড নির্মাণের ঘটনা:

এদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাগদাফার্মের সান্তালদের জমিতে ইপিজেড নির্মাণের ঘোষণার প্রতিবাদে সান্তাল আদিবাসীরা গত ৬ নভেম্বর সমাবেশ করে। বাপ-দাদার তিন ফসলী জমিতে ইপিজেড নির্মাণ বন্ধ করতে সমাবেশ থেকে হুশিয়ারীও দেয় সান্তাল আদিবাসীরা।

পটুয়াখালীতে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রাখাইন আদিবাসীদের উচ্ছেদঃ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মোটুটিয়াখালীতে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ছয়টি রাখাইন পরিবারের ২৮ জন’কে উচ্ছেদের ঘটনাটিও আলোচনায় এসেছে। কর্তৃপক্ষ বার বার নোটিশ দিয়ে ক্র্যান নিয়ে উক্ত জায়গায় গেলে সেখানে প্রতিবাদ জানায় রাখাইন আদিবাসীরা। এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হলে কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। কিন্তু উন্নয়নের বলি হল রাখাইন আদিবাসীদের বাস্তুভিটা, তাদের চিরাচরিত ঐতিহ্যিক বৌদ্ধ বিহার ও পবিত্র চৈত্যগুলি। এছাড়া পুরো বরিশাল অঞ্চলে গত শতকের ৬০-৭০ দশকে লক্ষাধিক রাখাইন আদিবাসী থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যাটা নেমে এসেছে ২৪০০-তে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের আদা-হলুদ চাষ বন্ধে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা:

গত ২৯ আগষ্ট সশস্ত্র বাহিনীর বহির্বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের পক্ষে মেজর এইচ এম মোহাইমিন বিল্লাহ’র স্বাক্ষরিত “বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জুম চাষ (হলুদ/আদা) চাষের নিমিত্তে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পার্বত্যঞ্চলে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টকরণ প্রসঙ্গ” র্শীষক এক নির্দেশনায় উক্ত পদক্ষপে গ্রহণ করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করা হয়।

উক্ত নির্দেশনায় বলা হয়, “পার্বত্যাঞ্চলের বসবাসরত পাহাড়ি সম্প্রদায়ের লোকজন ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত জীবনধারণের জন্য প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ‘জুম’ চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন লাগিয়ে জমি প্রস্তুত করে থাকে যা একটি নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়। কিন্তু র্বতমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে জুম চাষ প্রর্বতিত হওয়ায় পার্বত্য এলাকায় জীববৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির উপর চরম ও সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে”- এই ধরণের নির্দশনা পাহাড়ী আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।

এদিকে সর্বশেষ গত ২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের চেয়ারম্যানবাড়ী এলাকায় ইউটার্নে একটি দ্রুতগতির বিএমডব্লিউ গাড়ির ধাক্কায় আহত হন মনোরঞ্জন হাজং। পরে তাঁকে প্রথমে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে তাঁর ডান পা বাদ দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে বারডেম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় মনোরঞ্জন হাজং এর মেয়ে পুলিশ সার্জেন্ট মহুয়া হাজং মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো গাড়ি চালক বিচারপতি রেজাউল হাসান এর ছেলে সাইফ হাসান থানায় জিডি করে মনোরঞ্জন হাজং এর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নাগরিক প্রতিবাদ উঠলে পরে পুলিশ মহুয়া হাজং এর মামলা গ্রহন করে। তবে এই মামলায় আসামিকে ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে দেখানো হয়। এতে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়।

উপরোক্ত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল আইপিনিউজকে বলেন, আমরা আশা করি যে, রাষ্ট্রের নীতিকাঠামোগুলোর মধ্যে যে সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটিগুলো আছে তা সংশোধন করে অধিকতর “গণতান্ত্রিক ও মানবিক” ব্যবস্থার দিকে উত্তোরিত হবো। কিন্তু ২০২১ সালে আদিবাসী পরিস্থিতি নিয়ে যা হলো তা দেখে বোঝার উপায় নেই যে আমরা সামনে এগোচ্ছি। বরং আমরা ক্রমাগত পেছনের দিকে হাঁটছি।
মুখে আমরা বলছি এসডিজি বাস্তবায়ন করবো এবং কাউকে পেছনে ফেলে নয় বললেও আদিবাসীদেরকে দূরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে দাবী করে অধ্যাপক মেসবাহ কামাল আরো বলেন, আমাদের রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আদিবাসীদের বেপারে ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। (রাষ্ট্রের) নীতিকাঠামোতে একটা মৌলিক পরিবর্তনসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি খুবই জরুরী বলে মনে করেন এই আদিবাসী গবেষক।

পাহাড়ের আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, ২০২১ সাল আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক। মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতিশীল এবং আশংকাজনক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আমরা পাহাড়ের নাগরিক-সমাজ প্রত্যেকটি ঘটনায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করেছি। (চিম্বুক এর ঘটনা নিয়ে) প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও পেশ করেছি। কিন্তু সরকার তো কর্ণপাত করছে না।

আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরিণ আইপিনিউজকে বলেন, আদিবাসীদের অনেক ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ হলেও সেগুলো এখনো অব্যাহত আছে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘পানিশম্যান্ট ট্রান্সফার’এর বিষয়টিও এখনো অব্যাহত আছে। করোনার মধ্যেও পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক সরকারী কর্মকর্তাকে পানিশম্যান্ট দিয়ে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রেও পাহাড়ীদের মত করে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হলেও সেটা না পাহাড়ীদের উপর শাসন-শোষণ ও অধিকার হরণের চর্চাটি অব্যাহতভাবে চলছে বলে মনে করেন এই আদিবাসী গবেষক।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীর মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে বলে মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই। রাষ্ট্র আদিবাসীদের উপর বৈরী আচরণ করছে দাবী করে আইপিনিউজকে তিনি আরো বলেন, কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফল। কারণ ‘ভাগ কর শাসন কর’– এই নীতি’তে সরকার অনেকটায় সফলতা পেয়েছে। তবে এসব থেকে উত্তোরণে আদিবাসীদের সংগঠিত হয়ে লড়াই করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন এই আদিবাসী অধিকারকর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *