লড়াই করতে না পারলে টিকে থাকা যাবে নাঃ পিসিপি’র নেতৃবৃন্দকে বললেন ঊষাতন তালুকদার

আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে, ইস্পাত কঠিন আর্দশিক শক্তিতে বলিয়ান হই’ স্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, ঢাকা মহানগর শাখা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাসাবো এবং ঢাকা পলিটেকনিক শাখা কাউন্সিল ও ছাত্র সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে।

আজ শুক্রবার ( ২৬ নভেম্বর ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ক্যাফেটেরিয়ায় অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি এবং সাবেক সাংসদ ঊষাতন তালুকদার এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান ও বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ।

উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক লিটন চাকমা ও সঞ্চালনা করেন রেং ইয়ং ম্রো। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে ব্যবিলন চাকমা বলেন , ” আমরা এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বসবাস করি যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতে পারিনা। এখানে তুমাচিং ধর্ষিত হয়। স্বাধীনভাবে মতামত দেয়ার অধিকার এখানে নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্র সমাজকে এসব সমস্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আপনারা যে যেখানেই থাকেন না কেনো এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি”।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক সাংসদ শ্রী ঊষাতন তালুকদার বলেন, “আমাদের ইস্পাত কঠিন আদর্শিক শক্তিতে বলিয়ান হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগ্রাম করে যেতে হবে। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছে। যুবসমাজ ঘুমিয়ে থাকলে ভয়-ভীতি দ্বিধা, সংশয় নিয়ে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা দূর হবে না। আন্দোলন-সংগ্রাম সবাই করতে পারে না, যারা অগ্রণী, সাহসী এবং সামনের সারির তারাই এগিয়ে আসে। লড়াই করতে না পারলে টিকে থাকা যাবে না। জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সকলের দায়িত্ব। আমরা সম-অধিকার, নিজেদের আত্মপরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের কাজে কর্মে একাত্ম হয়ে এগিয়ে যেতে হবে”।

পিসিপি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা বলেন, “আপনারা জানেন কিছুদিন আগে ফেসবুকে সাজেকে মসজিদ নির্মাণের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। বান্দরবান জেলা পরিষদ বগালেকে মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থায়ন করেছে। এগুলো সূক্ষ্ণ পরিকল্পনার মাধ্যমে করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি। বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়নি, আমাদেরকে বাঙালি হয়ে যেতে বলা হয়েছিল। কাপ্তাই বাঁধের মতো জুম্ম বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সামরিকীকরণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত নিধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পাহাড়ের জনমিতি পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ম্রোদের উচ্ছেদ করে চিম্বুকে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা যদি আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারি তাহলে আমাদেরকেও আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মত কর্ণফুলীর বাঁকে কবর দিতে হবে। শাসকগোষ্ঠী পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক আচরণ করছে। বাংলাদেশের বড় বড় মোড়লরা এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিক। পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা ভাঙতে না পারলে জুম্ম জনগণের দুঃখ নিরসন করা সম্ভব হবে না”।

সংহতি বক্তব্যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ” আমরা একটি লড়াইয়ের মধ্যে আছি। আমরা স্বাধীন দেশে অধিকার নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তা সম্ভব হয়নি। দেশের সাম্প্রদায়িক হামলা, পাহাড়ের অস্থিরতা- এগুলো জাতির বিদ্বেষী মনোভাব থেকে করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৪ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে কিন্তু কোন সরকারই তা বাস্তবায়ন করছে না। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প জিইয়ে রাখা হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এবং পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু সরকার এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি। সঠিক শিক্ষার আলো পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্ম হতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই-সংগ্রামে ছাত্র ইউনিয়ন সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে”।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিউ চিরান তার সংহতি বক্তব্যে বলেন, “আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের লড়াই সংগ্রাম করতে হয়। এদেশেই আদিবাসীদের ঘরে আগুন লাগে, ৯৬ সালে কল্পনা চাকমাকে অপহৃত হতে হয়। এদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি বাতিলের ষড়যন্ত্র চলছে। এই দেশ আর অসাম্প্রদায়িক নেই। তাই আমাদের আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সরকার ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবহেলা করছে। এ অবস্থায় আমাদের রাজপথে আন্দোলন আরো বেগবান করতে হবে। ইস্পাত কঠিন আদর্শের দ্বারা আদিবাসী মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি পরিবেশ ছাত্র পরিষদ যে বলিষ্ঠ শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল তাকে আরো দ্বিগুন শক্তিতে এগিয়ে নিতে হবে”।

সম্মেলন থেকে রেং ইয়ং ম্রো’কে সভাপতি এবং লিটন চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা মহানগর শাখার ২১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয় । এছাড়াও সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি; ১৫ সদস্য বিশিষ্ট বাসাবো কমিটি এবং ১৩ সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা পলিটেকনিক্যাল শাখার কমিটি ঘোষণা করা হয়।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *