পাহাড়ে করোনায় ক্ষতির চিত্র বুঝতে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা দরকার: আইপিনিউজ এর আলোচনায় বক্তারা

সুমেধ চাকমা: করোনায় ক্ষতির বৃহৎ চিত্র বুঝতে বস্তুনিষ্ঠ জরিপ ও গবেষণা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। আইপিনিউজ এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘আদিবাসী জীবনে করোনার প্রভাব : প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শীর্ষক অনলাইন অনুষ্ঠানে বক্তারা এ মন্তব্য করেন।

গতকাল বুধবার ( ১৭ নভেম্বর ) বিকালে অনলাইন প্লাটফর্ম জুম- এ আইপিনিউজ এই আলোচনার আয়োজন করে।

ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী জেসি চাকমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় সংযুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অষ্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক অনুরাগ চাকমা, বান্দরবানের প্রথম আলোর প্রতিনিধি বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, জাবারাং কল্যাস সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা ও বিএনকেএস এর নির্বাহী পরিচালক হ্লা ছিং নু প্রমুখ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কোভিড আক্রান্তের হার কম কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কোভিডের প্রভাব বেশি পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলোর বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি বুদ্ধ জ্যোতি চাকমা।

সাংবাদিক বুদ্ধ জ্যোতি চাকমা আরো বলেন, “কোভিডের সময় তৃণমূলে নিউজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাকে নিশ্চিত করেছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোভিড আক্রান্তের হার কম কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কোভিডের প্রভাব বেশি পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা কম কারণ পাহাড়িদের জীবনযাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের চেয়ে ভিন্ন। এছাড়া মহামারী বা সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পাহাড়ী সমাজে নিজস্ব ঐতিহ্য ব্যবস্থা রয়েছে। পাহাড়ের মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ কিন্তু জুমে উৎপাদিত ফসল তারা বিক্রি করতে পারেনি কিংবা ন্যায্য দাম পায়নি ফলে অর্থনৈতিকভাবে তারা আরো পিছিয়ে গেছে”।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অনুরাগ চাকমা ৩টি তাত্ত্বিকদিক থেকে বিশ্লেষণ করে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ” করোনাকালে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ আরো নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। শ্রেণিভেদে করোনার প্রভাব ভিন্ন ছিল। ধনীদের জন্য করোনার প্রভাব এক রকম হলেও গরীবদের জন্য তা ভিন্ন ছিল। রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব করোনাকালীন সময়ে আরো বেড়েছে কিন্তু বিলাইছড়িতে টিকা বিতরণের ক্ষেত্রে আমরা অনিয়ম দেখেছি। এগুলো যতটা না আর্থিক বিষয় তার চেয়েও বেশি ম্যানেজমেন্টের বিষয়”।

মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নিরুপা দেওয়ান বলেন, ” পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু এলাকা এতো দুর্গম যে সেখানে সরকারি প্রণোদনা পৌঁছায়নি। বাল্যবিবাহ, শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার বহুগুণে বেড়েছে। সরকার যদি এগিয়ে না আসে তাহলে এসব সমস্যা আরো বাড়বে। করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে”।

এছাড়া করোনায় ক্ষতির বৃহৎ চিত্র বুঝতে বস্তুনিষ্ঠ জরিপ ও গবেষণা হওয়া দরকার বলে আলোচকরা জানিয়েছেন। সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণি নির্ধারণ, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারণ, দ্রুত টিকার ব্যবস্থা করা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য আলোচকরা মত দেন।

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, করোনার সময়ে শহরতলীর আদিবাসী শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল ডিভাইজ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পেলেও গ্রামের শিশুরা সেগুলো থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কাজেই শিক্ষাক্ষেত্রেও এক ধরণের বৈষম্য তৈরী হয়েছে। শহরতলীর শিশুরা ১৮ মাস পিছিয়ে গেলে গ্রামের আদিবাসী শিশুরা ৩৬ মাস পিছিয়ে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।

এছাড়া আলোচনায় যুক্ত থেকে হ্লা সিং নু বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরসহ অন্যান্য শহরগুলোতে যেসব আদিবাসীরা কাজ করতো তাদের কয়জন ফিরে এসেছে, কাজ হারিয়েছে সেই সংখ্যাটা নিরূপন করা প্রয়োজন। তাঁদের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করাটা সরকারের দায়িত্ব বলেও মনে করেন এই উন্নয়ন কর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *