নিপীড়িত মানুষের শক্তি ছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা- সোহেল হাজং

১০ নভেম্বর ২০২১। এদেশের নিপীড়িত ও জুম্ম জনগণের অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ ও বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের এইদিনে বিভেদপন্থি ঘাতকদের আক্রমণে তিনি নিহত হন।

মানবন্দ্রে নারায়ণ লারমার (এম এন লারমা) ডাক নাম মঞ্জু। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদ সদস্য ও সাবেক সাংসদ। তার জন্ম রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট মৌজার মাওরুম (মহাপুরম) গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। তার জন্মস্থানটি এখন কাপ্তাই কৃত্রিম বাঁধের তলায় ডুবে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র অন্যতম স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু) বড় ভাই তিনি।

বিপ্লবী এম এন লারমা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তিনি ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫৪ হাজার একর ভূমির ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করতে গিয়ে সেখানকার প্রায় এক লক্ষ আদিবাসীদের কোনো ধরণের ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প বাসস্থান ব্যবস্থা না করেই স্থানচূত করা হয়। ১৯৬০ থেকে ৬৫ সাল পর্যন্ত কাপ্তাই বাঁধ বিরোধী আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন তিনি। এ আন্দোলনে জেল জুলুম সহ্য করেও তিনি সংগ্রামে অটল ছিলেন। তিনি ১৮৬৫ সালে বিএ এবং ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাস করেন। কর্মজীবনে তিনি একসময় শিক্ষকতাও করেছেন এবং চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশনে আইনজীবী হিসেবেও যোগদান করেছিলেন।

তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা। প্রথমে এ সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরবর্তীতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-এর পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তরাঞ্চল থেকে বিপুল ভোটে সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকেই সরাসরি আন্দোলনের দায়িত্ব কাঁধে তোলে নেন। গড়ে তোলেন ‘শান্তিবাহিনী’- জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা।

এম এন লারমাই সর্বপ্রথম দেশের জাতীয় পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য স্বায়ত্তশাসনের কথা তোলে ধরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন ছাড়া ভাষাগত সংখ্যালঘু পাহাড়ি আদিবাসীদের মুক্তি নেই। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট চারদফা দাবি পেশ করেন।

তাকে জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বলা হলেও তার চিন্তা ও চেতনার ব্যাপ্তি যে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি তারও প্রমাণ আমরা পাই। স্বাধীনতা পরবর্তী গণ পরিষদে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের পাশাপাশি দেশের শোষিত-বঞ্চিত কৃষক-শ্রমিক-মাঝি-মাল্লা-কামার-কুমার-জেলে-তাঁতীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। বিশেষ করে, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৪-৭৫ পর্যন্ত সময়ে এসব অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে গণপরিষদে তার দেওয়া বক্তব্য, ভাষণ ও যুক্তি-তর্কগুলো এম এন লারমাকে বোঝার জন্য অসাধারণ একটি দলিল ও সংকলন হয়ে আছে।

গণপরিষদে ও প্রথম জাতীয় সংসদে দেশের ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাঝে গুটি কয়েক স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে অন্যতম এম এন লারমা। তিনি নির্ভীক চিত্তে বেশিরভাগ সময়ই একাই বঞ্চিত মানুষের পক্ষে সংগ্রাম করে গেছেন। গণপরিষদে প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও এম এন লারমা যেসব ভাষণ দিয়েছেন কিংবা একেকটি অধিবেশনে বিল সম্পর্কে মূল্যবান মতামত দিয়েছেন তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।

মেহনতি মানুষের নেতা এম এন লারমা ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবরে সংবিধান বিলের ওপর সাধারণ আলোচনায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা পুরোপুরি এই সংবিধানে নেই। যদি সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা এই সংবিধানে থাকত, তাহলে আমার আপত্তির কোন কারণ থাকত না। কিন্তু আজ আমি দেখতে পাচ্ছি পদ¥া, মেঘনা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, মাতাভাঙ্গা, শঙ্খ, মাতামুহুরী, কর্ণফুলী, যমুনা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর ধরে নিজেদের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে নৌকা বেয়ে দাঁড় টেনে চলেছেন, রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা শক্ত মাটি চষে সোনার ফসল ফলিয়ে চলেছেন, তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি। আমি বলছি, আজকে যারা রাস্তায় রাস্তায় রিক্সা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করে চলেছেন, তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আজকে যারা কল-কারখানায় চাকা, রেলের চাকা ঘুরাচ্ছেন, যাদের রক্ত চুঁইয়ে আজকে আমাদের কাপড়, কাগজ প্রতিটি জিনিস তৈরি হচ্ছে সেই লক্ষ লক্ষ মেহনতি মানুষের কথা এখানে নাই।’

তিনি বলেছেন, ‘আমরা করুণার পাত্র হিসেবে আসিনি। আমরা এসেছি মানুষ হিসেবে। তাই মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আমাদের আছে।’ তিনি ছিলেন নারী অধিকারেরও বলিষ্ঠ প্রবক্তা। পুরুষ যে অধিকার ভোগ করে নারীদের সে অধিকার প্রদানের জন্য তিনি ছিলেন সোচ্চার।

যে বিষয়ে তার পরিস্কার দাবি ছিল তা হলো- দেশের বহু জাতির সত্তা ও অবদানকে সংবিধানে স্বীকৃতি দেয়া। তিনি আদিবাসীদের জাতিগত পরিচয়ের সাংবাধানিক স্বীকৃতির জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন। তার মতো করে এ সত্য কথাটি সংসদে তোলে ধরার মতো এখন আর কেউ সাহস রাখেন না। আমাদের দেশে বাঙালি জাতি ছাড়াও ৫০টির অধিক জাতিসত্তা রয়েছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধে এসব জাতিগোষ্ঠীর লোকেরাও স্বেচ্ছায় অংশ গ্রহণ করে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এসব প্রত্যেকটি জাতিসত্তার মানুষ সংখ্যায় কম হলেও সংস্কৃতির দিক থেকে তাদের ভিন্নতা রয়েছে। তাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার রয়েছে। কিন্তু সংবিধানে যখন একক সত্তাবিশিষ্ট শুধুমাত্র বাঙালি জাতির কথা তোলে ধরা হয় তখন তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর, সংসদে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ সংশোধনী প্রস্তাব- ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ উত্থাপিত হলে এম এন লারমা তা মেনে নিতে পারেন নি। এর প্রতিবাদ করে তিনি বলেছিলেন, –
‘আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখাপড়া করে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সব দিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ – কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা কোনোদিনই নিজেদেরকে বাঙালি বলে মনে করি না।’ ‘আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশী বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।’

এদেশে ৫০টিরও অধিক ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা এদেশের পাহাড় ও সমতলে এখনও বিদ্যমান যারা জাতি হিসেবে বাঙালি নয় এবং তাদেরকে ‘উপজাতি’ বলাটাও অগ্রহণযোগ্য। এসব ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোকদের আমরা একসঙ্গে ‘আদিবাসী’ বলি। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য সেদিন গৃহীত হয় নি। সংবিধানে বাঙালি ছাড়া চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, হাজং, কোচ, মণিপুরী, খাসি, সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, রাখাইন, মুন্ডা .. .. .. এসব ৫০টির অধিক জাতিসত্তার স্বীকৃতি মেলেনি। প্রতিবাদ স্বরূপ এম এন লারমা সেদিন অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণপরিষদ বৈঠক বর্জন করে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন।

আজ মানবন্দ্রে নারায়ণ লারমাকে শুধু শ্রদ্ধাভরে স্মরণই করছি না, তার মতো অধিকার আদায়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সংসদে ও রাজপথে যে কতটা প্রয়োজন সেটাও অনুধাবন করছি। এমএন লারমার সংগ্রাম ও সাধনা বৃথা যেতে পারে না। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাদের দাবি স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তিটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এম এন লারমার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ অনেকটা সার্থক হবে বলা যায়। কিন্তু চুক্তির স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রায় ২৪ বছর হতে চলেছে, মূল বিষয়গুলিসহ চুক্তির অনেক ধারা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি সারাদেশে আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার পথগুলোও যেন আরো সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। আদিবাসীদের চিরাচরিত ভূমিগুলোতে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা, ইকো-পার্ক, পর্যটন কেন্দ্র ও নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়ে আদিবাসীদের মনে ভীতি ও উচ্ছেদের আতঙ্ক বিরাজমান। এছাড়া ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘণের নানা ঘটনা ঘটেই চলেছে। তাই যেখানে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সত্য কথা বলা ও পাশে থাকার সাহসগুলো দিন দিন যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক এই সময়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মতো অজেয় শক্তিমান প্রতীক ও জোরালো কণ্ঠস্বর অনেক বেশি প্রয়োজন বলে মনে করি।

মাত্র ৪৪ বছর বয়সে অবসান ঘটে বিপ্লবী এম এন লারমার বর্ণাঢ্য জীবন। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর বিভেদপন্থি গ্রুপের এক বিশ্বাসঘাতকতামূলক সশস্ত্র হামলায় তার আটজন সহযোদ্ধাসহ তিনি নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। বিপ্লবী চে গুয়েভারা মনে করতেন, ‘বিপ্লবীকে হত্যা করা যায়, কিন্তু বিপ্লবকে কখনও নয়। বিপ্লবীকে হত্যা করলেও বিপ্লবের সুফল ঠিকই থেকে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।’ এম এন লারমা বলেছিলেন, ‘অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়।’ আমাদের বর্তমান যুব প্রজন্মের কাছে এম এন লারমার বিপ্লবী চেতনা ও আদর্শ প্রেরণা হিসেবে কাজ করে যাবে।

সোহেল হাজং: বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *