স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা- পাভেল পার্থ

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সবসময়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিদারুণভাবে তাঁর নামে একটি মহাসড়ক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণও হয়নি কিংবা ঘোষিত হয়নি তাঁর নামে কোনো জাতীয় স্মারক পদক। এমনকি আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সন্নিবেশিত হয়নি তাঁর জীবনকর্ম কিংবা মূলধারায় তাঁর চিন্তা-দর্শন-কর্মপ্রক্রিয়া নিয়ে খুব বেশি আলাপ বা তৎপরতাও দৃশ্যমান নয়। দীর্ঘদিন যাবত তাকে ‘চাকমা’ হিসেবে ‘আদিবাসী প্যাকেজ মোড়কে’ বন্দী করে আড়াল ও অপর করে রাখবার প্রশ্নহীন প্রক্রিয়া চালু ছিল। খুব বেশি দিন হবে না, হয়তো গত মাত্র ১০/১৫ বছরে তাঁর চিন্তা-দর্শন-রাজনীতি নিয়ে মূলধারায় কিছুটা আলাপ শুরু হয়েছে। তবে তাও খুব যথেষ্ট নয়, মূলত তাঁর মৃত্যু ও জন্মদিবসকে কেন্দ্র করেই। কেবল বাঙালি সমাজ নয়, আদিবাসী বা এমনকি চাকমাদের নতুন প্রজন্মও তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি ওয়াকিবহাল নয়। এই দীর্ণ অবস্থা স্পষ্টতই রাষ্ট্রের অস্বীকৃতির সংস্কৃতি এবং জাত্যাভিমানী বর্ণবাদী চরিত্রকে প্রকাশ করে এবং এর ভেতর দিয়ে এক বিকশিত বৈষম্যের ময়দান চাঙ্গা হয়ে ওঠে। প্রশ্নহীন আঘাত আর বৈষম্যের লম্বা ফিরিস্তিকে টেনেই ক্রমশ জিডিপির সূচকে উন্নতির শিখর স্পর্শ করছে দেশ। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এই গৌরবদীপ্ত টগবগে সময়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কতখানি জরুরি? তাঁর চিন্তা-দর্শন-রাজনীতি ও কর্মউদ্যোগ স্বাধীনতার এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমরা কীভাবে পাঠ করবো? কেন তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক? সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এখনো আমাদের কী দিকনির্দেশনা দিতে পারেন? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি. মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে নতুন প্রজন্মের সামনে বহুমুখী সৃজনশীল কায়দায় উন্মুক্ত ও উপস্থাপন করা জরুরি। চলতি আলাপে আমরা খুব সংক্ষেপে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার কিছু উল্লেখযোগ্য চিন্তা-দর্শন ও কাজকে আলাপে টানছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গড়ন, গঠন এবং সামগ্রিক রূপান্তরে এই দর্শন এক মৌলিক জিজ্ঞাসা ও চিন্তাবীজ হিসেবে এখনো জরুরি হয়ে আছে।

আত্মপরিচয় বিতর্ক
আত্মপরিচয় ঘিরে রাষ্ট্রের জাত্যাভিমানী দেনদরবার দেশের জাতিগত নিম্নবর্গের ‘জাতীয়তার নির্মাণ-বিনির্মাণ’ প্রশ্নে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে আরো জটিল হয়েছে। হয়েছে বৈষম্যমূলক। একজন চাকমা কি কোল বা লালেং কি কড়া বা কন্দ কি মুন্ডা বা কোচ যে কোনোভাবেই ‘বাঙালি’ নয়, এটি রাষ্ট্র তার নথি ও কাঠামোগত জায়গাতে বুঝতে চাইছে না। রাষ্ট্র জোর করে পরিচয়ের অন্যায় ব্যাকরণ চাপিয়ে দিচ্ছে অবাঙালি জনগণের উপর। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাই প্রথম রাষ্ট্রের কাছে আত্মপরিচয় নিয়ে কাঠামোগত বিশ্লেষণ এবং বিতর্ক তুলে ধরেন। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে দেশের সকল জাতিদের একত্রে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রতিবাদে গণপরিষদ অধিবেশন বর্জন করেন। রাষ্ট্র ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি কাঠামোগত স্বীকৃতি না দিলেও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ‘উপজাতি’, ‘নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ‘সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘ট্রাইবাল’, ‘এবরিজিনাল’ এরকম বৈষম্যমূলক পরিচয়গুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

উন্নয়ন বনাম জীবন
বৃহৎবাঁধসহ করপোরেট খনন কী বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষ করে দুনিয়াজুড়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তু করে। বাংলাদেশেও ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন কেন্দ্র প্রায় লাখো মানুষের পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করেছিল। বন্যপ্রাণী, পাহাড়, বৃক্ষলতা হয়েছিল নিরুদ্দেশ। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৬১ সনেই কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সনে সংগঠিত করেন এক বিশাল পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলন।


কৃষি ও ভূমিপ্রশ্ন

যে কৃষি এবং জুমের সাথে এই জনপদের মানুষের উৎপাদন ও মালিকানা সম্পর্ক সেইসব বিষয়ের প্রতি রাষ্ট্রীয় আইনগত মনোযোগ স্পষ্ট করার আহবান জানিয়েছিলেন এম এন লারমা। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত দেশের প্রথম বাজেট আলোচনায় এম এন লারমা দেশের জনগণের উৎপাদন সম্পর্কের বিষয়ে বাজেটকে প্রশ্ন করেন এবং কৃষকের জায়গা থেকে বাজেটের আলোচনা তুলে ধরেন। বলেছিলেন, … রাষ্ট্রীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষা, কৃষি, দেশরক্ষা এবং তারপর হচ্ছে শিল্প।

উন্নয়নের মূলধারায় প্রান্তজন
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বারবার দেশের প্রান্তজনের আয়নায় রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেছেন, প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। হরিজন, বেদে, ভিখারি, কারখানার মজুর, রিকশাচালক, যৌনকর্মী সকলের কথাই তিনি জোরদারভাবে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। ১৯৭৪ সনের গণপরিষদে জাতীয় বাজেট বক্তৃতার বিবরণী পাঠ করা যাক। সেসময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাই দেশের প্রথম জনপ্রতিনিধি যিনি বেদেসহ সকল বঞ্চিত মানুষের কথা সংসদে উত্থাপন করেছিলেন এবং তাদের উন্নয়নে বিশেষ বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করেছিলেন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সেদিনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়নি, তখনকার কোনো সাংসদই তাকে সমর্থন করেননি। তাকে তিরস্কার করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে রাষ্ট্র দীর্ঘসময় পরে বেদে, হিজড়া, দলিতসহ সকল প্রান্তজনকে দেশের মূল উন্নয়নধারায় যুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বনাম মেহনতি মজদুর
পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতি নিম্নবর্গের বিপ্লব কাঁপিয়ে দিয়েছিল ১৯১৭ সনের রাশিয়াসহ এক শৃংখলিত দুনিয়াকে। বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্ম অক্টোবর বিপ্লবের ২২ বছর পর। কিন্তু তার বেড়ে ওঠার ভেতর দিয়েই তিনি সক্রিয়ভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। প্রশ্ন তুলেছেন। বৈশ্বিক পুঁজিবাদ, অর্থনৈতিক ধারা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শ্রেণিচরিত্র সম্পর্কে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভাষ্য বারবার জানান দেয় তিনি মেহনিত মজদুর জনগণের ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠায় সাহসী উচ্চারণ করেছেন বারবার।

পাহাড়ের মুক্তি
পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রশ্নহীন বলপ্রয়োগের এক ‘বিশেষ চিহ্নিত’ সীমানা। যে সীমানাকে অবহেলা আর ঐতিহাসিক কায়দায় অনস্তিত্বশীল করে তোলার ভেতর দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের কাছে এক বিশেষ পরিসর। পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সায়ত্ত্বশাসনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে চার দফা দাবি পেশ করেছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। পরবর্তীতে এক দীর্ঘ সংগ্রামী সময়। শেষে ১৯৯৭ সনে রাষ্ট্র পার্বত্যচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার’ সক্রিয় উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়।

নারীমুক্তি
এম এন লারমা সংসদ অধিবেশনে প্রথম রাষ্ট্রের সংবিধানে ‘নারীর জন্য স্পষ্ট কোনো অধিকারের জায়গা নাই’ এমন একটি বাহাস তুলেছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানকে পুরুষতান্ত্রিক হিসেবে পাঠ করার এই আদিগন্ত সাহস মানবেন্দ্রের লিঙ্গীয় রাজনীতি সম্পর্ককেও স্পষ্ট করে তুলে। এম এন লারমা লিঙ্গীয় পরিসরকে আরো শ্রেণীবিভাজনের জায়গা থেকেও দেখতে চেয়েছেন। তিনি সংসদে বলেছেন, … তারপর আমি বলব, সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হচ্ছে এই যে, আমাদের মা-বোনদের কথা এখানে নাই। নারীর যে অধিকার সেটা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত। নারীকে যদি অধিকার দিতে হয়, তাহলে পুরুষ যে অধিকার ভোগ করে, সে অধিকার নারীকেও দিতে হবে। কারণ, তারাও সমাজের অর্ধেক অংশ।

মাতৃভাষা প্রসঙ্গ
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ সকল আদিবাসী জাতির ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা স্বীকার করেছে। ২০১২ সনে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি, ত্রিপুরা ও ওঁরাও আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তৈরি হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতি দেশ স্বাধীনের পর এমন ছিল না। বাংলা ছাড়া দেশে প্রচলিত অপরাপর মাতৃভাষার প্রসঙ্গ সবসময়ই আড়াল করে যাওয়া হয়েছে। যদিও দীর্ঘসময় পরে রাষ্ট্র সকল মাতৃভাষার মর্ম উপলদ্ধি করবার সাহস করছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার কারণেই। তিনিই প্রথম সংসদে দেশের বাংলা বাদে অন্যান্য আদিবাসী ভাষা নিয়ে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, উন্নয়নচিন্তা বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন।


পরিবেশপ্রশ্ন ও প্রকৃতিপ্রেম

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এক কেন্দ্রীয় পরিবেশপ্রশ্নের ভেতর দিয়েই তার জিজ্ঞাসা গুলো তুলে ধরেছেন বারবার। এছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। তার সাংগঠনিক অনেক কাজে কর্মী ও প্রতিনিধিদের নানাভাবে পরিবেশপ্রশ্নে দায়বদ্ধ হতে তিনি বাধ্য করেছেন, তাদের ভেতর পরিবেশ সুরক্ষার চর্চা গড়ে তুলেছেন। একটা পাহাড়, বনভূমি বা প্রাকৃতি বাস্তুতন্ত্র থেকে কতখানি প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে আহরণ করা জরুরি এই পরিবেশগত নীতিশিক্ষা তিনি চালু করেছিলেন তার নিজের সংগঠনে।

আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মানবেন্ত্র নারায়ণ লারমা উত্থাপিত প্রশ্ন, দর্শনচিন্তা সমূহ বাংলাদেশের সামগ্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় খুব জরুরি ও প্রাসঙ্িগক হয়ে দাঁড়ায়। জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য এম এন লারমা ১৯৬৯-১৯৭১ এর সময় রাঙ্গামাটির কন্ট্রাক্টর পাড়ার শেষ মাথায় একটা বাঁশের বেড়া, শণের ছানি অতি সাধারন মাটির ঘর ছিল। এই ঘরেই তিনি সপরিবারে বাস করতেন। এই ঘরেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তার কাচে অত্যন্ত শ্রদ্ধা নিয়ে মানুষ আসতেন। ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে হাসি মুখে তিনি সকলকে আতিথেয়তা দিতেন। তার ঘরে কোন কাঠের সোফা এমনকি কাঠের চেয়ার পর্যন্ত ছিল না । পাটিতে বসেই মানুষের সমস্যার কথা শুনতেন। পাহাড়ী অতিথিদেরকে বাজ-দাবা(বাঁশের হুক্কা) আর পান সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন করা হত। একজন মানুষ, একজন কর্মী, একজন রাজনীতিক এবং একজন সমাজ পরিবর্তনকারী হিসেবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনচিন্তাই কেবল উপযোগী নয়, তার কম কার্বনভিত্তিক জীবনযাপন আজকে এই দু:সহ জলবায়ু সংকটের দুনিয়ায় খুব বেশি উপযোগী এবং গ্রহণযোগ্য। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আমাদের কাছে এমনি অজস্র জিজ্ঞাসা আর অনুশীলনসমেত এক গর্বিত উদাহরণ। আজকের তরুণ প্রজন্ম চাইলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে পাঠ করতে পারে, বাংলাদেশের রূপান্তরে তাঁর চিন্তাবীজ ও অনুশীলন থেকে শক্তি ও কারিগরি নিয়ে দেশকে বাহাত্তরের সংবিধানের সত্যিকার আবহে সাজাতে পারে।
…………………………………………………..

লেখক ও গবেষক, ই-মেইল:
[email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *