সাঁওতাল তিন বন্ধুর হত্যার বিচার চাইলেন সুলতানা কামাল

সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম (গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে ফিরে): জাতি হিসাবে আমাদের মনে রাখা দরকার যে দেশে ঘটিত অন্যায় অপরাধের বিচার করে না সেই কলঙ্ক জাতির গায়েও লাগে এবং আমরা এই দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে সেটা হতে দিতে পারি না। আমরা এই কলঙ্ক বহন করতে রাজি নই। রাষ্ট্র যদি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে অর্থাৎ অন্যায়ের বিচার সম্পূর্ন না করে তাহলে এই কলঙ্ক রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। এই দায়িত্ব তাদের ছিল, তারা যদি এই বিচার যদি না করে তাহলে এই কলঙ্ক থেকে তারা মুক্ত হতে পারবে না। তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে গিয়ে আমাদের উপর এই কলঙ্ক আরোপ করে নিশ্চিতে থাকতে পারবে না, আমরা তাদের নিশ্চিন্তে থাকতে দেব না। আমরা বার বার এই বিচারের দাবি করব। বার বার তাদের মনে করিয়ে দেব তারা তাদের দায়িত্বে কর্তব্যে অবহেলা করেছে, ব্যর্থ হয়েছে সেই ব্যর্থতা তাদেরকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে এবং এই ব্যর্থতা থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমরা এই তিন বন্ধুর হত্যা কান্ডের বিচার চাই এবং যারা এই অপকর্ম ও অপরাধ করেছিল তারা বিচারের আওতায় এসে শাস্তি পেয়েছে তা আমরা দেখতে চাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল গতকাল সাঁওতাল হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে তার প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ সব কথা বলেন।

৬ নভেম্বর ২০১৬ সালে সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাংচুর ও নির্যাতনে জড়িত আসামীদের গ্রেফতার ও বিচার এবং হামলায় নিহত ও অহতদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে গতকাল শনিবার সকাল ১০ টায়, কাটামোড়, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধাতে শোক র্যালি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে ।

উক্ত শোক র্যালি ও সমাবেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে সাহেবগঞ্জ – বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ,
আদিবাসী ইউনিয়ন, জনউদ্যোগ, আদিবাসী- বাঙালি সংহতি পরিষদ, সিডিএ, কাপেং ফাউন্ডেশন নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ।

সাহেবগঞ্জ- বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা আয়োজনে ৬ নভেম্বর ২০২১ সকাল ১১ টা থেকে কাটামোড় এলাকায় সমাবেশ করে। এর আগে জয়পুর- মাদারপুর – দিনাজপুর ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে সমাবেশ স্থল কাটামোড়ে এসে শেষ হয়।

সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি সভাপতি ডাঃ ফিলিমন বাস্কে’র সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সমাবেশের প্রধান অতিথি মানবাধিকার কর্মী ও এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এএলআরডি এর নির্বাহী পরিচালক জনাব মো শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও সাংবাদিক রোবায়েত ফেরদৌস, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য এ্যাড. বাবুল রবিদাস, সাধারণ সম্পাদক সবিন চন্দ্র মুন্ডা, সাংগঠনিক সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়াড়, দপ্তর সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম, রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মানিক সরেন, আদিবাসী যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি সভাপতি হরেন্দ্রনাথ সিং, নগরের স্বাস্থ্য উন্নয়ন আন্দোলন সমন্বয়কারী আমিনুল রসুল, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কেন্দ্রীয় নেতা দীপায়ন খীসা,জাতীয় আদিবাসী পরিষদ নাটোর জেলা সভাপতি প্রদীপ লাকড়া, কাপেং ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর খোকন সুইটেন মুরমু, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি সহ-সভাপতি সাবিত্রী হেমব্রম, নববাগঞ্জ শাখার সভাপতি বাবলু টুডু, সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) রেজাউল করিম মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন শেখ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সুফল হেমব্রম, গাইবান্ধা জেলা বার এ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর কবির তনু, সিডিএ এর নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী শাহ্ মমিন জিন্নাহ, নাগরিক উদ্যোগ নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, মানবাধিকার কর্মী সন্ধ্যা মালো, উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম দিনাজপুর শ্যামল মার্ডী, রায়গা কলেজ নওগাঁ অধ্যক্ষ আরিফুর রহমান আরিফ প্রমূখ। সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন প্রিসিলা মুরমু।

বক্তারা বলেন, সম্প্রীতি বেপজার চেয়ারম্যান সাহেব গত ২৩ আগস্ট ২০২১ গাইবান্ধার ডিসি অফিসে আদিবাসী সাঁওতাল বাঙালির বাপ-দাদার পৈত্রিক জমি বাগদা ফার্ম এলাকায় ইপিজেড করার একতরফা ঘোষণা দেয়। বাগদা ফার্ম এলাকার জমি তিন ফসলি জমি। সাঁওতাল বাঙ্গালীদের বাপ-দাদার পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত। সাঁওতাল জনগোষ্ঠী উক্ত জমিতে চাষাবাদ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তিন ফসলী জমি নষ্ট করে এ ধরনের প্রকল্প করা যাবে না। এছাড়াও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাঁওতাল আদিবাসীরা যেসব জমিতে তিন ফসল চাষাবাদ করেছে। ইপিজেড এর মত প্রকল্পের নামে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন ও উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র বটে। গাইবান্ধার ভূতপূর্ব জেলা প্রশাসক জনাব ড.কাজী আনোয়ারুল হক গাইবান্ধার সাঁকোয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল ইপিজেড করার প্রস্তাব করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করেছিলেন। যাহা গাইবান্ধাবাসী সার্বজনীন ভাবে গ্রহণ করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে কিছু ষড়যন্ত্র কারী মহল তৎকালীন ডিসি গাইবান্ধার প্রস্তাবনা ধামাচাপা দিয়ে বিরোধপূর্ণ একটি জায়গায় আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীতে ইপিজেড করার পায়তারা করেছে।

সার্বিক বিবেচনায় গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্ম এলাকায় বেপজার প্রস্তাবিত একতরফা ইপিজেড এর ঘোষণা প্রত্যাহার পূর্বক মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর সাঁওতালদের বাপ দাদার জমি ও আশ্রয় স্থল কেড়ে নেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য বেপজার কর্তৃপক্ষ সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *