সাজেকের প্রান্ত জনপদে স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা আহ্বান

সতেজ চাকমাঃ গহীন `সাজেক’। প্রত্যন্ত এক জনপদের নাম। এই নাম শুনেননি এমন কাউকে সাম্প্রতিক পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু সাধারণ মহলে যারা সাজেক দেখেছেন বা নাম শুনেছেন, তারা কেবল জানে ‘রঙিন বাহারী কটেজ’ বেষ্টিত একগুচ্ছ সাজেক’কে। অতি সাম্প্রতিক সময়ে রুইলুই পর্যন্ত যে পিছঢালা রাস্তা তৈরী হয়েছে তারই পথ ধরে পর্যটন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা। প্রতিদিন জড়ো হওয়া হাজারো পর্যটকদের কাছে হয়ত এই সাজেকের আসল চেহারা অজানা। কিছু রঙিন কটেজ আর সাদা মেঘগুচ্ছের নিচে প্রান্তিক সাজেকের চেহারা বেশ নির্মম ও জর্জরিত। জুম নির্ভর এই এলাকার আদিবাসীদের ‘দ্রারিদ্রতা’ রঙিন কটেজের নিচে লুকায়িত থেকে গেছে। ‘খরা’র কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে খাদ্যভাবে ভোগা’ এই এলাকার মানুষের নিত্যদিনের ঘটনা। এমনি দারিদ্র পীড়িত জীবনব্যবস্থায় ‘শিক্ষা’র চাহিদা পূরণের সুযোগ সেখানে অলিক কল্পনার সামিল। এমনি একটি প্রান্ত জনপদ থেকে উঠে এসেছেন বিশিষ্ট সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কাচালং বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভদ্রসেন চাকমা। তারই উদ্যোগে রুইলুই পাহাড়ের পাদদেশে সুরেন্দ্র চাকমা ও তাঁর পরিবারের দান করা ১.৫ একর জমির উপর নির্মিত হচ্ছে ‘সাজেক রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ’

আইপিনিউজ এর সাথে এক মুঠোআলাপে বাঘাইছড়ি উপজেলার এই শিক্ষাবিদ বলেন, পুরো সাজেক ভ্যালীতে ৭০-৮০ টি গ্রাম রয়েছে। এই গ্রামগুলোর শিশুদের শিক্ষার বাহন কেবল ১০-১২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এগুলো ছাড়া কোনো ধরণের মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই বিস্তৃত এই জনপদে। আর কলেজের কথা তো চিন্তাই করা যায় না।

অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীবৃন্দ
দুর্গম এই জনপদের শিশুদের প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য উপজেলা সদর কিংবা অপেক্ষাকৃত শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে এমন জনপদের সন্ধান করতে হয়। অন্য কারো বাড়িতে বার্ষিক এককালীন বা মাসিক ভাড়ায় এবং আনুষাঙ্গিক খোরাক যোগাড় করেই করতে হয় মাধমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা। এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে অনেকেই ঝরে যায় আর অনেকেই পায় না শিক্ষার সুযোগ। তাই নিজ শেকড়ের প্রতি দায় থেকেই এই মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বলে জানান শিক্ষক ভদ্রসেন চাকমা।

তিনি আরো বলেন, ২০১৯ সালে আমি এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই। স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাঁদের সাথে দেখা করি। তারা রাজী হলে স্বেচ্ছাশ্রমে প্রথমে বিদ্যালয়টি’র ভিত্তি দাঁড় করানোর পরামর্শ দিই। ধাপে ধাপে ২০২০ সালে বাঁশের বেড়া ও টিনের চালা দিয়ে পত্তন হয় এটি’র।

গ্রামগুলোর বিচ্ছিন্নতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ‘রেসিডেন্সিয়াল’ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই সেখানে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে স্কুলে পৌঁছাতে দু্ই থেকে তিন দিন পর্যন্ত সময় লাগে। তাই বর্তমানে ২২ জন রেসিডেন্সিয়াল শিক্ষার্থী এবং স্নাতক শেষ করা স্থানীয় ৩ জন শিক্ষক ও ১ জন শিক্ষিকার পরিচালনায় চলছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

নতুন পত্তন হওয়া এ বিদ্যালয়টির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও পরিচালক ভদ্রসেন চাকমা আরো বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় দেশে বিদেশের অনেক শুভানুধ্যায়ী ও শিক্ষানুরাগী মানুষ সাড়া দিচ্ছেন। তাঁদের সহায়তায় এখনো পর্যন্ত কোনো মতে এটি পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছি। সেই সাথে আবাসিক শিক্ষার্থীদের আহার ও অন্যান্য সংস্থানের জন্য বুদ্ধ রঞ্জন চাকমা ও তুষার কান্তি চাকমা’র দান করা ৪ একর ও ২.৫ একর জমি এবং গ্রাম-সমাজের সামষ্টিক মালিকানার ১.৫ একরসহ মোট আট একর জমিতে চলছে আয় বর্ধনমূলক কর্মকান্ড। এরমধ্যে মুরগীর খামার, শাকসব্জির খামার ও কাজু বাদাম চাষ প্রকল্পও চলছে বিদ্যালয়টি পরিচালনায় সহায়ক প্রকল্প হিসাবে।’

বিদ্যালয়ের আয়বর্ধনমূলক কৃষি কার্যক্রমে আবাসিক শিক্ষার্থীরা
তবে গত কিছুদিন আগে বিদ্যালয়টি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য প্রিয় নন্দ চাকমা প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন বলে জানান ভদ্রসেন চাকমা। এছাড়া প্রতিষ্ঠালগ্নে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা’র অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রতিষ্ঠার শুরুতে ব্যক্তিগত তরফ থেকে ৩ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন সাবেক এই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তারপরেও এখনো বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বেতন-ভাতা, ক্লাসরুমের বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, অনলাইন শিক্ষণের জন্য অন্তত একটি ল্যাপটপসহ আনুষাঙ্গিক নানা অভাব রয়েছে বলে আইপিনিউজকে জানান তিনি।

জেলা পরিষদ সদস্য প্রিয়নন্দ চাকমা সরেজমিন পরিদর্শনের সময় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কর কমিশনার হেমল দেওয়ান ও তাঁর কয়েক বন্ধু বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গেলে বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের মাসিক বেতনসমূহ ব্যবস্থা করে দিয়ে সহায়তার আশ্বাস দেন। তাঁদেরকেও কৃতজ্ঞতা জানান এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ভদ্রসেন চাকমা।

এদিকে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ভিত্তিক বিকাশের জন্য একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। শুভানুধ্যায়ী ও শিক্ষানুরাগীদের প্রেরিত বই দিয়েই গড়ে তোলা হচ্ছে এই লাইব্রেরী।

দেশ-বিদেশের শিক্ষানুরাগী ও মানবতাবাদী মানুষদের সহায়তায় এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে সাজেকের প্রান্ত জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে এবং সেই অঞ্চলের শিশুরা পুনর্জন্ম পাবে বলে বিশ্বাস এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও শিক্ষক ভদ্রসেন চাকমা’র।

প্রতিষ্ঠানটিতে সহায়তা পাঠাতে পারেন নিম্নোক্ত একাউন্টেঃ
০১৮২০৪২৯৩৮১ (বিকাশ)
এবং
যৌথ ব্যাংক হিসাব নং- ৩৫০৭-০৩১১১০০৭৫৩
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বাঘাইছড়ি শাখা
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *