পাহাড়ের সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা: মিশ্র কৃষি উদ্যোগে ভাগ্য ফেরানো এক সফল উদ্যোক্তা

সতেজ চাকমাঃ দু’একর টিলা জমিতে ছিটানো বিলাতি ধনিয়ার বীজই বুনে দিয়েছিল নতুন স্বপ্ন। প্রথম বছরেই দু’একর টিলা জমিতে চাষ করা ধনিয়া বিক্রিতে ৩৫০০০ টাকা লাভ হয়। সে টাকা বিনিয়োগ করে ২০১৫ সালে পাঁচ একর টিলা জমিতে বরই ও লিচু বাগান গড়ি। নিজ হাতে গড়া বাগান ঘুরতে ঘুরতে এই কথাগুলো বলছিলেন রাঙ্গামাটির সফল কৃষি উদ্যোক্তা সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা। ছয় বছর পেরিয়ে তাঁর উদ্যোগে ধরা দেয় কাঙ্খিত সফলতা। মাত্র মাধ্যমিক পাশ করা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সদর উপজেলার সোনারাম কার্বারী পাড়ার এই সফল কৃষি উদ্যোক্তার বাগানের আয়তন বেড়ে এখন পনের একর। সেইসাথে বেড়েছে তাঁর চাষ করা ফসলের সংখ্যাও।

সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার বিস্তৃত বাগানে এখন রয়েছে ৬০০ টি বরই গাছ, ৫০০ লটকন, ৩০০ মাল্টা, ৩০০ আম, ৫০ টি কাঠাল , ৫০০ লিচু গাছ, ২০টি লেবু চারা, ৫ টি জামুরা, ৫০০ টি সুপারি, ৫০০ রেড লেডি পেঁপে, ৫০০ বাংলা কলা, ১০০ টি রাম্বুটান চারা ও ৫০ টি তেতুল গাছ। বিভিন্ন ফলজ গাছেরও রয়েছে নানা জাতের বৈচিত্র্যময় সমাহার।

বাগান ঘুরতে ঘুরতেই সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, গত সপ্তাহেই পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে ১০০ আলু বোখরার চারা (এক প্রকার মসলা জাতীয় ফসল), ২০০ টি থাই পেয়ারা চারা এবং ১০০ টি দারুচিনি’র চারা পেয়েছি এবং এগুলো অতিশীঘ্রই বাগানে লাগানো হবে। এছাড়া গত জুনের শেষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ১৫০ টি মাল্টার চারা পেয়েছি। সেগুলো ইতিমধ্যেই লাগানো হয়ে গেছে।

কীভাবে এই উদ্যোগে জড়িয়ে পড়লেন জানতে চাইলে সুশান্ত আইপিনিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৪-১৫ কিলোমিটার হেঁটে, কখনো নৌকায় করে কষ্টে স্কুলে গিয়েছি। কোনোমতে মাধ্যমিক শেষ করে কৃষি উদ্যোগের প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মে। স্বাধীন পেশা বেছে নেওয়ার ঝোঁক থাকায় আর পড়ালেখা করিনি। পতিত টিলা জমিতেই প্রথমে বিলাতি ধনিয়ার চাষ শুরু করি। সেখান থেকেই যাত্রা।’

সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা আরো বলেন, আমরা কাপ্তাই বাঁধের ফলে প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্থদের অন্যতম। নিচু ধান্য জমির পানি কমে যায় বৈশাখে আর বর্ষার পানি আসে আষাঢ়ে। এই তিনমাসে ধানের আবাদ হয় না, তাই টিলা জমির উপরই ভরসা। সারা বছর যেন বাগান থেকে আয় করতে পারি তার জন্য মিশ্র ফল বাগানের চিন্তা।

এদিকে ১৫ একর টিলা জুড়ে বিস্তৃত তাঁর এই উদ্যোগে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ জন স্থানীয় যুবক ও নারী অর্থের বিনিময়ে নিয়মিত মজুরি দেন। তিনি বলেন, এই বাগানকে ঘিরে আমি নিজে স্বাবলম্বী হচ্ছি এবং সাথে কিছু মানুষকেও কাজের সুযোগ করে দিচ্ছি, যা আমার কাছে বেশ আনন্দের।

ফসল বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সুশান্ত বলেন, এসব বিক্রির জন্য আমাকে দূরে কোথাও যেতে হয়না। স্থানীয় বাজারে সাপ্তাহিক বাজার বার’কে ধরেই ফসল বিক্রি করি। এছাড়া রাঙ্গামাটি এগ্রো ফার্ম সার্ভিস নামে আমার একটি ফেসবুক পেইজও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েও ফসল বিক্রি করি। অনেক সময় ফসলের ছবি দেখে ব্যবসায়ীরা সরেজমিনে বাগানে এসেই ফসল নিয়ে যাচ্ছেন আবার অনেকেই অগ্রিম অর্ডার দেন। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবিধা নিচ্ছি।

ছবিঃ সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যা
বাগান থেকে সুশান্ত তঞ্চঙ্গ্যার বার্ষিক আয় এখন দুই লক্ষাধিক। পরিচর্যাকরণ, মজুরি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বাঁচিয়ে সে এখন স্বাবলম্বী। কিন্তু তাঁর যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। তিনি বলেন, স্বভাবতই পাহাড়ী টিলা চাষ করা, জঙ্গল সাফ করা অনেক কষ্টের । তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্গমতায় অনেক সংকটের সম্মুখীন হয়েছি, এখনো হচ্ছি। গত মার্চে আম, লিচু ও লটকন বাগানের একাংশ পুড়ে যাওয়ার পরও হতাশ না হয়ে স্বপ্ন বুনেছি নতুনভাবে। এখন সেখানে নতুন চারা বসাচ্ছি।

তিনি বলেন, এই বাগান গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছি ঠিক। তবুও অনেক দূর পাড়ি দিতে হবে। নিজে যেহেতু পড়ালেখা বেশি করিনি, বাচ্চাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে সাহস যুগিয়ে যাবো। এক্ষেত্রে হয়ত এই বাগানটাই আমার একমাত্র সম্বল। তাছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে যে সহায়ক তা আমি অনুভব করতে পেরেছি।

এতদূর আসার পেছনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজের প্রতি ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম এবং ধৈর্য্য। তবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নানা প্রশিক্ষণ প্রাপ্তি তাঁর সফলতার সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই কৃষি উদ্যোক্তা।

সুশান্ত বলেন, এযাবৎ রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বনরূপা হর্টিকালচার থেকে কমপক্ষে ৫-৬ বার নানা প্রশিক্ষণ পেয়েছি। সেগুলো আমাকে বেশ কাজে দিয়েছে। তাঁদের একান্ত সহযোগীতা ও অবদান ভুলবার নয়।

মিশ্র ফলবাগানে ঔষুধ ছিটানো এবং রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতির উপর তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কয়েকবার। এছাড়া বানিজ্যিক ফলবাগান গড়ে তোলার কলাকৌশল, মাল্টার চাষ নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও নতুন চারা গ্রাফতিং পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেশী চাষীর কাছ থেকেও আগ্রহ নিয়ে শিখেছেন । এখন নিজের বাগান বাদেও অন্যের জন্য চারা গ্রাফতিং করে আয় করেন তিনি।

তবে গত দু’মাস আগে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে ‘মোটিভেশন ট্যুরে’ যাওয়ার পর কাজের প্রতি তাঁর উৎসাহ দ্বিগুন বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুশান্ত সহ জেলার ৬০ জন কৃষি উদ্যোক্তাকে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে মিয়াজাকি আমের বিশাল বাগানে উদ্ধুদ্ধকরণ ভ্রমণে নিয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নিজেও বাগান করি আর অন্যের বাগান দেখে আরও প্রেরণা পায়। এছাড়া কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার ফলে সময়মত নানা ধরণের সেবা নিতে পারি।

এদিকে সুশান্ত তঞ্চঙ্গার কৃষি উদ্যোগ সরাসরি তত্ত্বাবধান করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তিন পার্বত্য জেলার সদ্য সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক পবন কুমার চাকমা আইপিনিউজকে বলেন, আমি তাঁর (সুশান্তের) বাগান পরিদর্শন করেছি। প্রথমত সে গ্রাফতিং করতে পারে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষ বলে কিছু ইতিবাচক দিক আছে। যার জন্য তাঁকে বিভিন্ন ট্রেনিং ও ট্যুরে পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছি যাতে সে সবদিক দিয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

পাহাড়ের কৃষি উদ্যোক্তাদের নানা সংকট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাবেক এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে পাহাড়ী উদ্যোক্তারা কম যুক্ত হন। অন্যান্যদের তুলনায় এক্ষেত্রে পাহাড়ীরা একটু পিছিয়ে। কৃষি কর্মকতাদের সাথে তাদের যোগাযোগ তুলনামূলক কম। যার ফলে বিভিন্ন সেবা থেকে তারা আপনা আপনিই বঞ্চিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সচেতনতা ও আগ্রহ বাড়ায় তারা আগের তুলনায় এগিয়ে আসছে। করোনার প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব বাড়ায় কৃষি উদ্যোগের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।

এদিকে বেশ কিছুদিন আগে রাঙ্গামাটির হিল রিসোর্স সেন্টার কর্তৃক আয়োজিত ‘উদ্যোক্তা ক্যাফে’তে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন সুশান্ত। ক্যাফের সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন উদ্যোগে জড়িত উদ্যোক্তাদের সাথে পরিচয় ঘটেছে তাঁর। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীক উদ্যোগ সফল করতে যে নেটওয়ার্কিং দরকার সেটা এখানে যুক্ত হয়ে বুঝতে সক্ষম হয়েছি।

যারা কৃষি উদ্যোক্তা হতে চান তাঁদের জন্য সুশান্তের পরামর্শ- ছোট কোনো উদ্যোগ দিয়ে শুরু করা। তিনি বলেন, পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক পতিত টিলা জমি দেখা যায়। এইসব ফেলে না রেখে ধীরে ধীরে বাগান গড়তে হবে। একদিনে সফল হওয়া যায় না, প্রয়োজন পরিশ্রম ও সীমাহীন ধৈর্য্য। কেবলমাত্র গতানুগতিক চাকুরীর পেছনে না ছুটে আমাদের উচিত পাহাড় জুড়ে কৃষি উদ্যোগের যে অপার সম্ভাবনা সেটাকে কাজে লাগানো।

পাহাড়ী উদ্যোক্তাদের একটি দুর্বলতার দিক তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, সচরাচর আমাদের পাহাড়ী উদ্যোক্তারা কেবলমাত্র একমুখী ফলনের দিকে নজর দেন। এতে কোনো মৌসুমে ফসল ফলনে ক্ষতিগ্রস্থ হলে হতাশ হয়ে পড়েন। তাই এক ফলনের ক্ষতি অন্য ফসলের লাভ দিয়ে যেন পুষিয়ে নিতে পারে তার জন্য মিশ্র ফলজ বাগানের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। তাছাড়া কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা ও বিভিন্ন সেবা নেওয়ার উপর তাগিদ দেন এই সফল কৃষি উদ্যোক্তা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *