বাগদা ফার্মের জমিতে ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা বাতিলের আহ্বান ৪২ বিশিষ্ট জনের

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ (বাগদা) ফার্মের জমিতে ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে এবং তার অংশ হিসেবে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান সে এলাকা ঘুরে এসেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে জানা গেছে। এরই প্রতিবাদে স্থানীয় আদিবাসী সাঁওতালরা বিক্ষোভ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, চিনিকলের জন্য আখ চাষ করা ছাড়া অন্য কিছু করা হবেনা এই শর্তে সরকার তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এসব জমি রিকুইজিশন করে। সে শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় জমিগুলো তাদের কাছে ফেরত দিতে হবে, ইপিজেড নির্মাণের প্রশ্নই ওঠে না। এই দাবির সাথে সংহতি জানিয়ে ইপিজেড স্থাপন পরিকল্পনা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ৪২ নাগরিক। গতকাল শনিবার, ২৮ আগষ্ট এক বিবৃতিতে তারা এই আহ্বান জানান।

বিবৃতিদাতারা বলেন, স্থানীয় যে স্বার্থান্বেষী দুর্বৃত্ত চক্র ঐ ঘটনার নেপথ্যে থেকে বিভিন্ন দুস্কর্ম ও অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে তাদেরই অতি উৎসাহী তৎপরতার কারণে সরকারি উদ্যোগ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। ইপিজেড করতে হলে সেটির জন্য সরকারের জায়গার অভাব নেই। খাসজমিসহ লক্ষ লক্ষ একর সরকারি জমি ভূমিদস্যুরা বেদখল করে আছে, সেগুলো উদ্ধার করার বিষয়ে সরকারি প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ ইকোনমিক জোন, বন্দর, পর্যটন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে আদিবাসী, প্রান্তিক কৃষকদের উচ্ছেদ করে তাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি কেড়ে নেবার বেলায় প্রশাসনের একটি অংশ অত্যন্ত তৎপর বলে মনে করেন বিবৃতিদাতারা।

ভুমিদস্যুদের হাত থেকে সরকারি জমি উদ্ধার করে এরকম এক বা একাধিক ইপিজেড করা সম্ভব, সেটি না করে বাগদা ফার্মে ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা কেন করা হয়েছে প্রশ্ন রেখে বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, আবারো কেন আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার পাঁয়তারা চলছে সেটিই আমাদের প্রশ্ন। এছাড়া তিন ফসলি জমিতে কখনোই শিল্প-কারখানা নয় বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছেন, তার সেই নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে বাগদা ফার্মের তিন-চার ফসলি জমির ওপর ইপিজেড নির্মানের পরিকল্পনা কারা করেছে সেটিও দেশবাসী জানতে চায় বিশিষ্টজনরা।

বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, ফার্মের এই জমি সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা চলমান আছে, সেগুলোর নিস্পত্তি হওয়ার আগেই ইপিজেড নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার সামিল এবং বেআইনী। তাই এটির তীব্র নিন্দা জানার বিবৃতিদাতারা। এছাড়া আন্দোলনরত সাঁওতাল ও অন্যান্য প্রান্তিক কৃষকদের দাবি মেনে নিয়ে অবিলম্বে তাদের পূর্বপুরুষের জমি ফেরত দেয়াই হবে একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলেও মনে করেন তারা। সেটি না করে ইপিজেড কিংবা অন্য কিছুর জন্য জমি বরাদ্দ দেয়া হবে অন্যায়, অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত বলে দাবি বিবৃতিদাতাদের। অবিলম্বে এ ধরনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার জন্য বেপজাসহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি কর্তৃপক্ষকে আহ্বানও জানান এই বিশিষ্টজনরা।

বিবৃতিদাতারা এ সম্পর্কে চারটি দাবি জানান। সেগুলো হল- অবিলম্বে গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মের কৃষি জমিতে ইপিজেড স্থাপনের প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দেয়া, বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলির নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ঐ কৃষিজমির ৩/৪ ফসলি আবাদ অব্যাহত রাখতে, আন্দোলনরত সাঁওতাল আদিবাসী এবং তাদের সহযোগী বাঙ্গালী কৃষক পরিবারগুলিকে অস্থায়ী লিজ প্রদানের দায়িত্ব গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের কাছে ন্যস্ত করতে হবে, চলমান মামলাসমূহের নিস্পত্তি সাপেক্ষে রিকুইজিশন পূর্ববর্তী জমির মালিক সাঁওতালদের উত্তরাধিকারী পরিবারসমূহকে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেবার পদক্ষেপ অবিলম্বে নিতে হবে এবং ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর যে ৩ জন সাঁওতালকে হত্যা করা হয় তাদের পরিবারসহ নিহত-আহতদের সকল পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

উক্ত বিবৃতিতে সাক্ষর করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঐক্যন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন সুলতানা কামাল, নিজেরা করি’র সমন্বয়ক ও এএলআরডি’র চেয়ারপার্সন খুশি কবির, বিচারপতি (অব: ) মো. নিজামুল হক, সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দীন আহমেদ, নারীপক্ষ সদস্য শিরিন হক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাণা দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি সুব্রত চৌধুরী, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সভাপতি অ্যাড. জেড আই খান পান্না, আইনজীবি ও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সহ-সভাপতি তবারক হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত, কবি ও লেখক রাহনুমা আহমেদ, টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. উফতেখারুজ্জামান, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আলোকচিত্রী ও সমাজকর্মী ড. শহিদুল আলম, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাবি অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, ব্রতি’র নির্বাহী পরিচালক শারমিন মুর্শিদ, কোস্ট ট্রাস্ট্রের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী, ঢাবি অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক গোলাম মনোয়ার কামাল, বাপা’র সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, মানবাধিকার কর্মী মো. ইুর খান লিটন, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ক্লিনিক্যাল নিউরোসায়েন্স সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক নায়লা জামান খান, নংগীত শিল্পী ও লেখক অরুপ রাহী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, ব্রাক বিশ্বাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম, ঢাবি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিম উদ্দীন খান, ঢাবির অরেক শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন কণা, কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা, মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক রেজাউল করিম লেনিন, ঢাবি’র শিক্ষক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র উপ-পরিচালক ও আইনজীবি নীনা গোস্বামী, আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারাহ তানজীন তিতিল প্রমুখ।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫৪-৫৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রথমে চিনিকলের আখচাষের জন্য বাগদা বাজার সংলগ্ন এ জমিগুলো মূলত স্থানীয় সাঁওতালদের কাছ থেকে রিকুইজিশন করে, এরপর ১৯৬২ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাথে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে সরকার ১,৮৪২ একর জমি সরকারি ঐ কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। সে চুক্তিপত্রের শর্ত ছিল এ জমিতে আখ চাষ ছাড়া অন্য কিছু করা যাবেনা, যদি এ শর্তের লঙ্ঘন হয় তাহলে জমিগুলো পূর্বতন মালিকদের কাছে ফেরত দেয়া হবে। এরপর এ জমিগুলোতে গড়ে ওঠে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু ফার্ম, যেটির তত্ত্বাবধান করত ২০ কিলোমিটার দূরে মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড। স্থানীয় সাঁওতালদের দাবি রিকুইজিশন করা ১৮৪২ একর জমির সাথে তাদের আরো প্রায় ৬০০ একর জমি ফার্মের নামে অবৈধভাবে কুক্ষিগত করা হয়েছে। প্রায় ১৭ বছর আগে সুগার মিলে আখমাড়াই বন্ধ হওয়ায় ফার্মের জমিগুলো মিল কর্তৃপক্ষ লিজ দেয়া শুরু করে, যে জমিতে শুধু আখচাষ হওয়ার কথা তাতে ধান, গম, সব্জিচাষ এমনকি পুকুর খনন করে মাছচাষও চলছিল। এরই প্রেক্ষিতে জমিগুলো ফেরতের দাবিতে সাঁওতাল ও স্থানীয় বাঙ্গালী কৃষকেরা আন্দোলন করে আসছিল। এক পর্যায়ে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের যোগসাজসে এবং সুগার মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সহায়তায় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ ২০০৬ সালের ৬ নভেম্বর বাগদা ফার্ম এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালায়, এতে ৩ জন আদিবাসী সাঁওতাল নিহত হন। কিছু পুলিশ সদস্য ও দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে সাঁওতালদের সহস্রাধিক বাড়িঘর ভস্মিভূত হয়। সেই ঘটনা সাড়া দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তোলপাড় তৈরি করে। এরপর থেকে জমিগুলোর বেশিরভাগই সাঁওতালরা দেখভাল করছেন এবং তারা এসব জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন করছেন।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *