নারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিভাগে পক্ষপাতিত্বের প্রতিবাদে ‘স্ফুলিঙ্গ’ এর গোলটেবিল বৈঠক

আজ সকাল ১১টায় ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে ‘স্ফুলিঙ্গ’ এর পক্ষ থেকে ‘নারীর বিরুদ্ধে মোরাল পুলিশিং, গণমাধ্যমের অসংবেদনশীলতা এবং আইন ও বিচার বিভাগে পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে আমরা’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

স্ফুলিঙ্গ নারীদের সম্মিলিত উদ্যোগে একটি স্বতঃস্ফুর্ত প্ল্যাটফর্ম যা আজকের গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে।

উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে স্বশরীরে এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলোচক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সানজিদা নীরা, আইনজীবি সুলতানা আক্তার রুবি, আলোকচিত্রী এবং বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলনের সদস্য জান্নাতুল মাওয়া, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য লুনা নুর, নারী মুক্তি কেন্দ্রের ঢাকা নগরের সভাপতি তাসলিমা বিউটি, বিপ্লবী নারী ফোরাম ঢাকা নগরের সদস্য আমেনা আক্তার, আইনজীবি তাসমিয়াহ নুহাইয়া আল আমিন, কথাসাহিত্যিক নুরন্নবী শান্ত, কবি ও সাংবাদিক রহমান মুফিজ, উন্নয়নকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী, ওয়াইডাব্লিউসি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জেসমিন দিনাসহ প্রায় চল্লিশজন একটিভিস্ট উপস্থিত ছিলেন। গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতেই উল্লেখিত কর্মসুচির অবস্থানপত্র পাঠ করেন স্ফুলিঙ্গের সদস্য পূরবী তালুকদার। পুরো বৈঠকটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করে স্ফুলিঙ্গের সদস্য মোশফেকা আরা শিমুল এবং ইশরাত জাহান উর্মি।

বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে, নারীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোরাল পুলিশিং এবং গণমাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগতজীবনকে উন্মুক্ত করে কেলেঙ্কারিকরণের সংবাদ প্রচার করে সমাজের প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক জনমতকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং তাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রভাবশালীদের অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। এর পাশাপাশি বিচারবিভাগের বিশেষ ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক আইনের অপব্যবহার করে নারীদের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করার বিষয়টি প্রায়শই পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্ফুলিঙ্গ মনে করে, একটি রাষ্ট্র এবং তার প্রতিষ্ঠানসমূহের দীর্ঘদিনের অগনতান্ত্রিক এবং পুরুষতান্ত্রিক চর্চাই নারীর বিরুদ্ধে এই অন্যায্যতা তৈরি করছে।

সভায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্ফুলিঙ্গের সাথে সংহতি প্রকাশ করে জানান যে, “এই মুহুর্তে বাংলাদেশ আইন আদালত বলে কিছু নেই। তাই ক্রস ফায়ার,গুমের মত অহরহ ঘটনা আমরা দেখতে পাই যেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী যাকে গুলি করতে চায়, তাকেই মেরে ফেলতে পারে। ক্রসফায়ারের পর এইসকল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিবৃতি যে মিথ্যা তা সমাজের সবাই জানে”।

তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম নারীবিদ্বেষী এইসকল সংবাদ পরিবেশন করে মুলত জনমত তৈরি করতে যা ইতোমধ্যে ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালা দিয়ে সমাজে প্রচলিত রয়েছে।

এই প্রসংগে তিনি উল্লেখ করেন যে, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক নারীকে মজুরি কম দিতে এবং প্রতিবাদ থামানো সহজ হয় যখন তার ব্যক্তিগত চরিত্রকে উন্মুক্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডামুলক তথ্য প্রচার করা হয়।

বৈঠক চলাকালীন অনলাইন মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সানজিদা নীরা জানান যে, “গণমাধ্যম এবং বিজ্ঞাপনসমূহ তাদের কাটতি বাড়াতে নারীদের নিয়ে এই ধরণের অসংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন করে। নারীকে এভাবে উপস্থাপন না করেও যে গণমাধ্যম চলতে পারে এই ধারণায় আসতে হবে”।

গোলটেবিল বৈঠকে আলোকচিত্রী এবং বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলনের সদস্য জান্নাতুল মাওয়া তার সাংবাদিক পেশাজীবনের একটি উল্লেখ্য ঘটনা শেয়ার করেন। তিনি অতীতে একটি গণমাধ্যমে কাজ করতেন। ওই গণমাধ্যমটি একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশ করতে দায়িত্ব তাকে দিলে তিনি সেই দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য লুনা নুর বলেন যে, “সংবেদনশীলতা এবং অসংবেদনশীলতার বিষয়ের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, এইসকল বিষয় একজন নারীর অধিকারের বিষয়। সমাজে যেকোনো দৃষ্টিভংগি এবং মনস্তত্ত্বের মানুষ নারীর এই অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে না”।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আইনজীবি সুলতানা আক্তার রুবি ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ঘটনাটি স্মরণ করে বলেন যে, “তখন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল ইয়াসমিনের ন্যায়বিচারের পক্ষে। পুরো দেশের সামাজিক আন্দোলন, জনমানুষের আন্দোলন ইয়াসমিন ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ড অপরাধে ন্যায়বিচারকে সম্ভব করেছিল। অথচ আমাদের এখন সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশটাই নেই”।

আজকের গোলটেবিল বৈঠকে নারীর বিরুদ্ধে মোরাল পুলিশিং, গণমাধ্যমের অসংবেদনশীলতা এবং আইন ও বিচার বিভাগে পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে স্ফুলিঙ্গের পক্ষ থেকে ৮ দফা দাবি আহবান করা হয়।

দাবিগুলো হচ্ছেঃ
১. গণমাধ্যমকে মুক্ত এবং স্বাধীন করতে হবে।
২. আইনের অপব্যবহার করে নাগরিকের ব্যক্তিপরিসরে ঢুকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা বন্ধ করতে হবে।
৩. প্রতিটি গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমুহকে নারীর বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল আচরণ, শব্দ চয়ন এবং ছবি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
৪. গণমাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন, শব্দ চয়ন এবং ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. প্রতিটি সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উল্লেখিত নীতিমালা বিষয়ে অবগত করতে হবে এবং জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৬. নারীর বিরুদ্ধে সমাজের প্রচলিত মোরাল পুলিশিং এর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে সোচ্চার থাকতে হবে।
৭. নারীর সহিংসতা সংক্রান্ত অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। এসকল অভিযোগে তদন্ত না করে অভিযুক্তকে আইনি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া যাবে না।
৮. বিচার বিভাগকে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ করতে হবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *