পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণকারী খাসিদের পাশে দাঁড়ান- সিলভানুস লামিন

এক
আবারও হামলার শিকার খাসিদের পানজুম ও পান গাছ। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় (প্রিন্ট ও ইলেক্টনিক) বিভিন্ন শিরোনামে এই সংবাদটি গতকাল দেখেছি। এই মাসের ঠিক এক সপ্তাহ আগে খাসিদের পিতৃভূমিতে বনবিভাগের ‘সামাজিক বনায়ন’ বাস্তবায়নের সংক্রান্ত সংবাদও দেখেছি। ডলুছড়া নামে খাসিদের একটি গ্রামের পানবাগানকে এই সামাজিক বনায়নের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে! এই গ্রামের খাসিদের যত্নে গড়ে ও বেড়ে ওঠা গাছ ও পানলতা বিনষ্ট করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। নিকটবর্তী খাসি গ্রামগুলোর মানুষ ডুলছড়া খাসিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের পান বাগান পাহাড়া দিয়েছেন যাতে তাদের ঘামেশ্রমে গড়ে ওঠা পানবাগান ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়, রক্ষা পায় তাদের জীবিকা! তবে ডলুছড়া খাসিদের পাশে দাঁড়ানোর অপরাধ হিসেবে স্থানীয় স্বার্থান্বেষীমহল কুকিজুড়ী ও বেলুয়া পুঞ্জির দুই হাজার ৮শ’টি পানের লতা কেটেছে গত ২৫ আগস্ট! এ সংক্রান্ত সংবাদ বাংলাদেশের বেশ কিছু জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে! আজ ২৭ আগস্ট একজন খাসি আদিবাসী উপজেলায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে স্থানীয় একটি বাজারে মারধরের শিকার হয়েছেন। তাঁর অপরাধ তিনি একজন খাসি আদিবাসী!

স্থানীয় খাসিদের সাথে আলোচনায় আমরা জানতে পারি, খাসিদের লালন-পালন করা গাছপালাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানকে ধ্বংস করে সামাজিক বনায়ন বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা চালিয়েছে বনবিভাগ! পত্রিকান্তরে জেনেছি, এই সামাজিক বনায়নের ‘উপকারভোগী’ হিসেবে বনবিট কর্মকর্তারা স্থানীয় অ-আদিবাসীদের নির্বাচন করেছেন যারা এর আগে খাসিদের পানজুম বা বাগান (ইছাছড়া, নুনছড়া পুঞ্জি) দখল করার চেষ্টা করেছেন, যারা খাসিদের পানলতা কেটে এই আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করেছেন! এর আগে বড়লেখার আগাড় ও বনাখলা পুঞ্জিতে চা বাগান কর্তৃপক্ষ, কুলাউড়ার নুনছড়া পুঞ্জি বনবিভাগ এবং বরমচালের ইছলা ও সিঙ্গুর পুঞ্জিতে স্থানীয় অ-আদিবাসীদের দ্বারা খাসিদের পানজুম বা বাগান বিনষ্ট করার চিত্র ও সংবাদ আমরা দেখতে পাই! তাই খুব জানতে ইচ্ছে করে, খাসিরা আসলে কী দোষ করেছেন? কেন বারবার তাদের জীবন ও জীবিকা হুমকির সন্মূখীন? কেন বারবার হামলা শিকার হয়েছে তাদের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর পানবাগান, প্রাকৃতিক বন, পরিবেশ ও গাছপালা? আশপাশের অ-আদিবাসীদের এলাকায় এরকম হামলা ও নির্যাতনের চিত্র তো আমরা দেখিনি কিংবা শুনিনি? আমরা এটাও শুনিনি বা দেখিনি যে, খাসিরা দেশের ক্ষতি করেছেন, আশপাশের মানুষের (আদিবাসী ও অ-আদিবাসী) জানমালের ক্ষতি করেছেন? তাহলে কেন তাঁদের জীবন ও জীবিকা বারবার হামলার শিকার হবে? কেন তাঁরা শরীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন? স্থানীয় প্রশাসন (ইউনিয়ন পরিষদ), উপজেলা প্রশাসনসহ জাতীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা কী করছেন? তাঁরা কী এ নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখতে পাননি?

দুই
খাসিদের প্রতিটি গ্রামকে ‘কার্বনসিঙ্ক’ (Carbon Sink) বললেও অতুক্তি হবে না। কারণ প্রতিটি খাসি গ্রাম বা পান বাগানই কার্বন শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল করে। এসব পান বাগানে হাজার হাজার গাছ বায়ুমন্ডলের কার্বনকে শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া প্রতিটি খাসি গ্রাম ও পান বাগানই এক একটি প্রাণবৈচিত্র্যের আধার। এখানে রয়েছে নানান ধরনের উদ্ভিদ, প্রাণী এবং এসব উদ্ভিদ ও প্রাণীদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক! অথচ বনবিভাগ এ খাসিদের পানজুম বা বাগানকেই বেছে নিয়েছে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কর্মধা ইউনিয়নের ডলুছড়াপুঞ্জি ও নুনছড়া পুঞ্জি তাঁর বড় প্রমাণ! এ খাসিগ্রামগুলোতে বসবাস করা খাসিদের যত্নে গড়ে ওঠা হাজার হাজার গাছ কেটে সামাজিক বনায়নের এক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ডলুছড়া ও নুনছড়া পুঞ্জির বাসিন্দারা তাই উচ্ছেদ আতংকে আছেন এখন। এছাড়াও কর্মধা ইউনিয়নের কুকীজুড়ী, বেলুয়া ও বেলকুমা পুঞ্জির মানুষেরাও আজ আতংকে দিনাতিপাত করছেন। নিজের জীবন ও জীবিকাকে বাঁচানোর জন্য প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। ডলুছড়াসহ খাসিদের পানপুঞ্জিগুলো খুবই দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এ গ্রামগুলোতে বসবসাকারী খাসিরা এখানে দীর্ঘদিন থেকে বসবাস এবং পানচাষ করে আসছেন। তাদের পানজুম এলাকায় অন্তত ৩০/৪০ বছরের পুরনো লাখ লাখ প্রাকৃতিক গাছপালা রয়েছে। রয়েছে বাঁশ বাগানও। বনবিভাগ কেন এই খাসিদের গ্রামগুলোতেই সামাজিক বনায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। যতদূর জানি, সামাজিক বনায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন বন সৃষ্টি করা এবং খালি জায়গায় গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ করা। তাহলে যেখানে ইতিমধ্যে বন ও গাছপালায় পরিপূর্ণ সেখানে নতুন করে বনায়ন করার কী কোন প্রয়োজন আছে? সেখানে যদি বনায়ন করা হয় তাহলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ও খাসিদের যত্নে বেড়ে ওঠা গাছগুলোর কি হবে? কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, সামাজিক বনায়ন করতে হবে খালি জায়গায়। যেখানে প্রকৃতিকভাবে গাছপালা আছে, সেখানে এসবের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না (সিলেটটুডে২৪, ১৯ আগস্ট, ২০২১)। তাই মাননীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, খাসিরা প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন ও জীবিকা আর্বতিত হয়। সামাজিক বনায়নের নামে যাতে তাদের জীবিকাকে বিপন্ন করা না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার বিনীত অনুরোধ করি। খাসিরা সামাজিক বনায়নের বিপক্ষে নয়; তবে বনায়ন সেখানে করা হোক যেখানে প্রাকৃতিক কোন বন ও গাছপালা নেই।

তিন
খাসিদের প্রতিটি পুঞ্জিই এক একটি প্রাণবৈচিত্র্যর আধার। এখানে রয়েছে পাহাড়ি উচু-নীচু টিলার বনজঙ্গল, পাহাড়ি ঝর্ণা, নালা, খাদ, নানান বাহারের গাছ-গাছালি, বনলতা, গুল্ম। খাসিরা এসব প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে, তাদের সহচার্য, সংস্পর্শ, এবং ভালোবাসায় গড়ে তুলেছেন প্রকৃতিনির্ভর এক জীবনব্যবস্থা। নিজে একজন খাসি আদিবাসী মানুষ হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে খাসি মানুষের সংগ্রাম দেখেছি, প্রকৃতি ও পরিবেশকে সঙ্গী করে তাদের জীবন ও জীবিকা পরিচালনা কৌশল দেখেছি। প্রকৃতপক্ষে, খাসিরা জন্মের পর থেকে প্রকৃতি ও পরিবেশে সাথে আমাদের মিথষ্ক্রিয়া শুরু হয়। প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন পরিচালনার কৌশল সেই শৈশব থেকে তাদের হাতেখড়ি হয়। খাসিরা প্রকৃতি ও পরিবেশকে আহত না করে বনজঙ্গল থেকে তাদের খাদ্য, পুষ্টি, ওষুধসহ নানান প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করেন। প্রকৃতির সাথে খাসিদের আত্মিক সম্পর্ক, যা কলমের আচড়ে বর্ণনা করা সম্ভব নয়! প্রকৃতি ছাড়া খাসিদের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না। কারণ প্রকৃতিই তাদের জীবন রক্ষার একমাত্র অবলম্বন! প্রকৃতি থেকে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করেন তারা। প্রকৃতপক্ষে, প্রকৃতির সাথে প্রতিটি আদিবাসীদের একটি আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতিকে সহিংস করে এমন কর্মকান্ড তারা কখনও পরিচালনা করেন না। প্রকৃতিকেে আগলে রেখেই তাদের জীবিকা পরিচালনা করে আসছেন সেই স্মরণাতীতকাল থেকে। কিন্তু দুঃখের সাথেই বলতে হয় যে, দেশের বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প, পর্যটন অবকাঠামো আদিবাসীদের এলাকাতেই বেশি গড়ে তোলা হয়েছে। সামাজিক বনায়ন, রিসোর্ট, ইকোপার্ক নির্মাণের জন্য সরকারসহ প্রভাবশালীমহল আদিবাসীদের এলাকাকে বেছে নিয়েছে অনেকবার (সম্প্রতি খাসি পুঞ্জি ডলুছড়া ও নুনছড়া সামাজিক বনায়ন বাস্তবায়ন, পার্বত্যের চিম্বুক মাধবকুন্ড, মধুপুর)। অথচ বন রক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় সবচে’ বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছি খাসিসহ অন্যান্য আদিবাসীরাই। তাই তো দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে এলাকায় এখনও বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে সেখানেই রয়েছে আদিবাসীদের আবাসস্থল। আদিবাসীরা ওই এলাকা থেকে চলে গেলে কিংবা উচ্ছেদ হলে সেই এলাকায় গড়ে ওঠা এসব বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তো বনসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য খাসিসহ অন্যান্য আদিবাসীদের সরকারি সহায়তা, স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত। এছাড়া আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কারণ খাসিসহ অন্যান্য আদিবাসীরা বাঁচলে এ দেশের অবশিষ্ট বনাঞ্চলও বাঁচবে, বাঁচবে বন, প্রকৃতি ও পরিবেশ।

সিলভানুস লামিনঃ গবেষক ও সাংবাদিক

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *