সি আর দত্ত মুক্তিযুদ্ধের পতাকা নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেনঃ ঐক্য পরিষদ

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীরউত্তম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা যতদিন থাকবে, বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ যতদিন প্রতিষ্ঠিত হবে না, ততদিন তিনি থাকবেন আমাদের সামনে আলোকবর্তিকা হয়ে। সি আর দত্ত চিরকালের মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর মৃত্যু নেই ।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীরউত্তমের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল ২৪ আগস্ট ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক ভাচ্যুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। গত বছর এই দিনে তিনি ৯৩ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি ও সাবেক সাংসদ ঊষাতন তালুকদার। আলোচনা সভায় নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত হন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। সূচনা বক্তব্য রাখেন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. রানা দাশগুপ্ত। আরও বক্তব্য রাখেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মানববাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব, সিনিয়র সাংবাদিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুণ হাবীব, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্মল রোজারিও, সুইজারল্যান্ড থেকে ঐক্য পরিষদের সর্ব ইউরোপীয় ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী অমরেন্দ্র রায় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐক্য পরিষদের নেতা এ্যাটর্নি অশোক কুমার কর্মকার। জেনারেল দত্তের মেয়ে ব্যারিস্টার চয়নিকা দত্ত কানাডা থেকে এবং ছেলে ডা. চিরঞ্জীব দত্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্ত হয়ে পিতার স্মৃতিচারণ করেন। ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সমন্বয়ক মনীন্দ্র কুমার নাথ সভা সঞ্চালনা করেন।

পরিষদের সাধারন সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত সূচনা বক্তব্যে বলেন, যতদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ, প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে না, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ থাকবে বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল দত্ত আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও তিনি আমাদের চেতনায় আছেন মুক্তিযুদ্ধের পতাকা নিয়ে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন প্রয়াত সি আর দত্তকে নিয়ে আজ আলোচনা হচ্ছে প্রথত মৃত্যুবার্ষিকীতে, কিন্তু এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আলোচনা যেন শুধু সভায় সীমাবদ্ধ না থাকে। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অংশ, ইতিহাসের অংশ। ঐক্য পরিষদকে তাদের পথচলায় জেনারেল দত্তের দেখানো পথে চলতে হবে।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, জেনারেল দত্ত আজীবন মুক্তিযুদ্ধের পতাকা বহন করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর পাকিস্তানি ধারা প্রতিষ্টার ষড়যন্ত্র হলে রুখে দাঁড়িয়েছেন। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও অন্যদিকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি রাজপথে নেমেছেন। আজ যারা তালেবানি স্বপ্ন দেখছে তাদের রুখে দাঁড়াতে জেনারেল দত্ত আমাদের পথ দেখাবেন।

অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা না হলে আগামি ১০ বছরে এদেশ থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা হারিয়ে যাবেন। গোঁজামিলের বাংলাদেশে একদিকে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা আছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্ম। বাহাত্তরের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় জেনারেল দত্ত লড়াই করেছেন, এই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সাংবাদিক হারুণ হাবিব বলেছেন, ১৯৪৭ সালের পর এদেশ থেখে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অনেকে চলে গেছেন। সি আর দত্ত যাননি। একজন হিন্দু হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কীভাবে যোগ দিলেন তা আমাদের ভাবায়। তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি এ মাটির মানুষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, তাঁর শিক্ষা আমাদের অনুপ্রাণিত করলেই দেশ বাঁচবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে এক পর্যায়ে রাজনীতিকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ রক্ষায় যখন ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখন জেনারেল সি আর দত্ত একাত্তরের পতাকা নিয়ে রাজপথে দাঁড়ান। অন্যরা ব্যর্থ হলেও তিনি ব্যর্থ হননি। জয় বাংলা বলতে যখন রাজনীতিকরাও ভয় পেতেন তিনি নির্দ্ধিধায় জয় বাংলা বলেছেন, ভয় পাননি বলে দাবী করেন তিনি।

অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক বলেন, একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা সি আর দত্ত আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন হতে হয়। রাজনীতিকরাও এক পর্যায়ে যখন সাহস হারিয়েছেন, বুদ্ধিজীবীরা দুদিক রক্ষার চেষ্টা করেছেন জেনারেল দত্ত পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনীর বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সাহস আমাদের সাহসী করেছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *