বালিজুরীর গারো বসত-ভিটায় বনবিভাগের আগ্রাসন- উন্নয়ন ডি. শিরা

শেরপুরের বালিজুরীতে আদিবাসীদের আবাদি ফসল কেটে ফেলার পরিপ্রেক্ষিতে দু’দিন আগে ঢাকার নাগরিক প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে আমিও সঙ্গী ছিলাম। পরিদর্শন করে আমরা যা দেখলাম— সেখানে ৫টি গারো পরিবারের লাগানো বরবটি, করলার বাগান, সুপারি গাছ বন কর্মকর্তা রবিউল আলমের নেতৃত্বে নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়। এতে গারো পরিবারগুলো আর্থিক মানসিক সামাজিকভাবে যে ক্ষতি অপদস্তের শিকার হয়েছেন তা অর্থমূল্যে বিচার করা যাবে না। এই ঘটনায় বনবিভাগ ও বনবাসীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস অনাস্থা আর বিরোধপূর্ণ শ্লেষ মনোভাব।

ক্ষতিগ্রস্থদের একজন প্রতিবন্ধী গারো নারী ফৈমনি চিরান (৪০)। উনার দু’টো পায়ের পাতা নেই। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। বিশেষভাবে তৈরীকৃত জুতার সাহায্যে তিনি হাঁটাচলা করেন। ছয় মাস অন্তর অন্তর এই জুতা পাল্টাতে হয়। জুতা তৈরীতে লাগে ৭ হাজার টাকা। যেদিন (১২ আগস্ট) বনবিভাগের লোকজন তথাকথিত বনভূমি উদ্ধার অভিযানে নামেন সেদিন তিনি নিজের বাড়ির পাশে লাগানো করলা বাগানে নিড়ানি দিচ্ছিলেন। সেইসময় হঠাৎই ঝড়ের গতিতে এসে বন কর্মীরা করলার বাগান কাটা শুরু করেন এবং তাৎক্ষনাৎ সরতে না পেরে জাংলার নিচে চাপা পড়েন। অসহায় সন্ত্রস্ত ফৈমনি কি করবেন বুঝতে পারেন না।

নাগরিক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বদানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন কণা ক্ষতির পরিমাণ জানতে প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু সরল ফৈমনি কোন উত্তর দিতে পারেনি। ফৈমনির কথায় অন্যরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সবজির বাগান করলেও তিনি কেবল নিজের পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর জন্য করলা লাগিয়েছেন, কাজেই সেটার অর্থমূল্য নির্ধারণ করা যায় না। আদিবাসী জীবনবোধ এমনই— চলতি বিশ্ব অর্থ দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করতে চায় কিন্তু আদিবাসী জীবনে অর্থ উপজীব্য বিষয় নয়। হলিউডের বিখ্যাত মুভি এপিকালিপ্তোতে এই বোধ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

সবজির বাগান নিধনের শিকার আরেক গারো নারী ভারতী মৃ (বয়স আনুমানিক ৫৫) এবারই প্রথম স্বামী-স্ত্রী মিলে বাড়ির পেছনের পতিত জায়গায় করলার বাগান করেছিলেন। প্রথবারেই পড়লেন লোকসানের মুখে। কারণ করলা বাগান করতে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হয়; জাংলা তৈরীতে প্রয়োজন হয় বাঁশ, সুতা; ফসল ফলাতে বীজ, সার, বিষ অন্যান্য কীটনাশকসহ মজুরির। ফসল তোলার সময় বাগান কেটে ফেলায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হলেন। এখন বাগানের কথা মনে হলেই ভারতী মৃ’র চোখে জল চলে আসে।

বন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যেটা জানা গেল উনারা বনভূমি রক্ষা—বন সৃজন করছেন। এখানে একটু বোঝার বিষয় আছে। আসলে উনারা যেটা করছেন সেটা বন নয়, বাগান বা এক কথায় মনোকালচার। বনে একটা প্রাকৃতিক বুনন থাকে, পশু-পাখি, উদ্ভিদ, লতাগুল্ম সর্বোপরি বনবাসীর চমৎকার সমন্বয় থাকে কিন্তু বন বিভাগের তথাকথিত বনে এসবের কোন বালাই থাকে না। তাদের গাছে বনে পাখি বাসা করে না, উদ্ভিদ জন্মায় না, বনবাসী খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। সেটা বন নয়, বাণিজ্যিক বাগান। বন সৃজনের নামে বাগানের এই ধারনার প্রবর্তন বনবাসীদের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ তেমনি প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্যের জন্যও এটা ক্ষতিকর। এইসব বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিপরীতে প্রয়োজন প্রাণ—প্রকৃতি, পরিবেশ, জীবন বান্ধব টেকসই কর্মসূচি।

প্রসঙ্গের খাতিরে বলা লাগে, শেরপুর কিংবা ময়মনসিংহের উত্তরে যে গারো পাহাড় অবস্থিত সেটির নামকরণ গারো আদিবাসীদের নামে, এটা ঐতিহাসিকভাবে সর্বজন স্বীকৃত। সরকারের বন আইন, বনবিভাগ তৈরির বহুকাল থেকেই এখানে আদিবাসীরা বসবাস করে আসছে। বালিজুরী চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে। তার-ও আগে থেকে সেখানে আদিবাসীদের বসতির ইতিহাস। কিন্তু এখন সরল এই মানুষগুলো বাইরের মানুষের চাতুরিতে জমিজমা, বাগান, শ্মশানের জায়গা খুইয়ে বসতির অধিকার হারানোর শঙ্কায় দিন গুনছে শিকারীর জালে আটকা পড়া হরিণ শাবকের ন্যায়। যেন কিছু করার নেই!

অত্র জেলার ইতিহাসের সাথে এখানকার স্থানীয় গারো, কোচ, হাজং, হদি, বর্মন, ডালু, বানাই জনজাতির নাম ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সেই ইতিহাস থেকে এই জনগোষ্ঠী গুলোর অবদান অস্বীকার মাইনাস করা যাবে না। পাকিস্তান আমল (১৯৫৬) পর্যন্ত আদিবাসীদের স্বতন্ত্র অবস্থানের কথা মেনে নিয়ে পুরো গারো পাহাড় আংশিক শাসনবহির্ভূত এলাকার (নন-এক্সক্লুডেড) মর্যাদা পেয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে রাষ্ট্র বিধি বল প্রয়োগ পূর্বক এইসব অঞ্চলে কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এজন্যই অনেকে বলে, আদিবাসীরা নয় বরং রাষ্ট্র স্বয়ং বন জবরদখলকারী। রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের দেরিতে হলেও এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে যে, আদিবাসীরা বন ধ্বংসকারী নয় বরং রক্ষা উপরি পরিচর্যাকারী। আদিবাসীরা বনকে মা হিসেবে দেখে— মা’কে কেউ বিক্রি করতে পারে না। ভোগ দখলের প্রশ্ন অবান্তর।

বালিজুরীর ইস্যু নিয়ে বিভিন্ন ছাত্র-যুব, আদিবাসী সংগঠনগুলো প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। এটা আশা জাগানিয়া দিক। কিন্ত প্রতিবাদকারীদের একটি অংশ এই ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ও ‘বনবিভাগের কতিপয় দুষ্কৃতিকারীর অপকর্ম’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বন আইন, বন সম্পর্কিত সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের মনস্তত্ত্ব— গোটা সিস্টেম যখন বিপক্ষ তখন বালিজুরীর মতো ঘটনাকে ‘কতিপয় দুষ্কৃতিকারীর অপকর্ম’ বলে চিহ্নিত করা যথার্থ নয়। তারপরও সরকারি ঘরানার রাজনীতি যিনারা করেন উনারা ইনিয়ে বিনিয়ে মধু মিশ্রিত বুলি আওড়ে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করেন যার সারমর্ম বন—পরিবেশ বিশেষত আদিবাসীদের জন্য আত্মঘাতী স্বরূপ। এই বক্তব্য দিয়ে বন বিভাগের যাবতীয় উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে জায়েজ করে দেয়া হয়।

সরকারের বনবিভাগ ও আদিবাসীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সংঘাত নতুন নয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট যবে থেকে বন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়া শুরু করে তখন থেকেই এই বিপত্তির সূচনা। সম্প্রতি শেরপুর বনবিভাগ বনবাসীদের জন্য আরেকটি বিপত্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। তারা পুরো জেলার বন জবরদখলকারীদের একটি তালিকা করেছে। এই তালিকায় আদিবাসীদের নামপরিচয় আছে, এ নিয়ে দেখা দিয়েছে উচ্ছেদ আতঙ্ক। প্রশ্ন হল, এই তালিকায় আদিবাসী জনমানুষ কি করে অন্তর্ভুক্ত হল? আদিবাসীরা তো বন দখল ভোগ করে না, দখলী কিংবা দলিলি সংস্কৃতির সাথে আদিবাসীরা পরিচিত নয়। জমির কাগজ করতে হবে আদিবাসীরা তা বিশ্বাস করে না, বাইরের চাপিয়ে দেয়া নামজারীর সংস্কৃতি চালু হবার পর থেকেই আদিবাসীরা ভূমি নিয়ে বহুমুখী সমস্যার শিকার হয়েছে। এই সমস্যা সংকট নিরসন করতে হলে বন পরিবেশ নিয়ে রাষ্ট্রের যে নীতি দৃষ্টিভঙ্গী সেটি বদলানো দরকার। আদিবাসীরা যেভাবে বনকে দেখে সেভাবে দেখতে হবে।

আদিবাসী জীবন ভূমি, বনকেন্দ্রিক। ভূমি ছাড়া আদিবাসী জীবন অচিন্তনীয়। এজন্যই আদিবাসীরা বলে, ভূমি আমার নয়, আমিই ভূমির। আমরা ভূমি থেকে আসি এবং ভূমিতেই ফিরে যাই। ভূমি আমাদের মা। ভূমি আমাদের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু। পুরো দুনিয়ার পরিবেশ জলবায়ু কর্মীরা আদিবাসীদের এই ধারণা বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে সেই অনুযায়ী করণীয় ঠিক করছে। আমরা আশা করবো বাংলাদেশ সরকারও প্রাকৃতিক বন, পরিবেশ—প্রতিবেশ বিনাশী সর্বোপরি বনবাসীর জীবন বিরোধী চলতি বাণিজ্যিক বন নীতিতে পরিবর্তন এনে যুগোপযোগী পলিসি গ্রহণ করবেন। যাতে বনবিভাগ ও বনবাসীর মধ্যকার দা-কুমড়া সম্পর্কের চির অবসান ঘটিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় সুখ সমৃদ্ধি প্রগতির পথে।

লেখক: উন্নয়ন ডি. শিরা, অ্যাক্টিভিস্ট। ই-মেইল: [email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *