সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাজং নারী ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড দাবি

গত ১৪ আগস্ট সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানাধীন সীমান্তবর্তী রাজাই গ্রামে এক হাজং আদিবাসী তরুণীকে (২৩) ধর্ষণের প্রতিবাদে ও ধর্ষকের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ২০ আগস্ট সকালে সংগঠনের ফেসবুক পেইজে একটি অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন।

সংগঠনের বক্তারা বলেন, দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বিচারহীনতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং এসব অপরাধ সংঘটিত হতেই থাকে। আদিবাসীরা যেহেতু আরো প্রান্তিক তাই তারা সুবিচার কখনই পায় না।

সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশীষ হাজং এবং মূল বক্তব্য পড়ে শোনান যুগ্ম-সাংগঠনিক সম্পাদক অন্তর হাজং। গত ১৪ আগস্ট সকালে তাহিরপুরের রাজাই গ্রামের আব্দুল রাশিদ (৪৫), পিতা আবুল কালাম কর্তৃক এক হাজং তরুণী ধর্ষণের শিকার হন।

সংগঠনের মূল বক্তব্যে ধর্ষকের ফাঁসিসহ ৭ দফা দাবি পেশ করা হয়। সে দাবিগুলোর মধ্যে ছিল (১) সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাজং নারীকে ধর্ষণের ঘটনাটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত আসামীকে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে (২) ভিকটিমের মেডিক্যাল রিপোর্ট সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক, (৩) দরিদ্র, অসহায় ও হাজং জাতিগোষ্ঠীর এই ক্ষতিগ্রস্ত ভিকটিম ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, (৪) ক্ষতিগ্রস্ত নারীর মানসিক অবস্থা জোরদার করণের জন্যে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, (৫) ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র নারী ও তার পরিবারের দৌড়াদৌড়ি/যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচসহ পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং মামলা পরিচালনার যথার্থ খরচ প্রদান করতে হবে, (৬) সারাদেশে আদিবাসী নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন ও শারীরিক সহিংসতার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং (৭) আদিবাসী নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার নিশ্চিত করণে সরকারকে একটি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সংহতি বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা বলেন, মূল স্রোতধারার নারী ধর্ষণ ও বর্বোরোচিত হত্যার শিকার হলে দেশের মানুষ যতটা এগিয়ে আসে, আদিবাসী নারীর ক্ষেত্রে আমরা সেভাবে দেশের সামগ্রিক লোকের আওয়াজ তুলতে দেখিনা। এজন্য আরো নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করতে হবে, একসাথে লড়তে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের থানা, আদালত ও বিচার ব্যবস্থা এখনও আদিবাসীবান্ধব নয়, সেখানে আদিবাসী ভাষায় কথা বলার লোকদের জন্য কোন ইন্টারপ্রেটার/দোভাষী সহযোগী নেই। তিনি বলেন, হাজং নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় উপযুক্ত বিচার করে অপরাধীর ফাঁসি দেয়া হোক কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্ষকেরা উপযুক্ত শাস্তি না পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেই যাবে।

আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান বলেন, রাষ্ট্রে আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নেই কারণ তাদের ওপর নির্যাতনকারীর উপযুক্ত শাস্তি এদেশে সহজে হয় না। এজন্য অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

আদিবাসী নারীনেত্রী নমিতা চাকমা বলেন, আদিবাসীদের আরো সচেতন হতে হবে যেন এরকম ঘটনা ঘটলে তারা দ্রুত মেডিক্যাল টেস্ট এবং মামলা করতে আগ্রহী হয়। তাদের শক্ত থাকতে হবে যেন তারা কারো প্ররোচনায় মামলার থেকে পিছিয়ে না যায়। তিনি প্রচলিত আইন মোতাবেক হাজং নারীর মামলার সুষ্ঠু পরিচালনাসহ অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

জাতীয় হাজং সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল হাজং বলেন, দেশের প্রচলিত আইনেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া সম্ভব। কারণ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯(১) এ বলা আছে, “যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি [মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে (সংশোধনী ২০২০)] দন্ডনীয় হইবেন।” অতএব হাজং নারী ধর্ষণের এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত আসামীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া উচিত যেন পরবর্তীতে আর কেউ এসব ঘৃণ্য কাজ করতে না পারে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ-সম্পাদক এন্ড্রু সলমার বলেন, ভিকটিমের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র, নিরীহ ও সহজ-সরল প্রকৃতির। ভিকটিম নিজেও ভালো বাংলা বলতে পারে না। বাংলায় যোগাযোগের জন্য অন্যের সাহায্য নিতে হয়। তার মা প্রতিদিন কাজ করতে যায়। একদিন কাজ না করলে তাদের পরিবারে খাবার জোটে না। এই ঘটনায় তাদের যে কয়েকদিন কাজ বন্ধ রাখতে হল জানিনা তাদের ঊনুনে এখন খাবার আছে কিনা!
এই পরিবারের জন্য মামলা পরিচালনাসহ আর্থিক সহযোগিতাও করা প্রয়োজন।

তিনি আরও যুক্ত করেন, অভিযুক্ত আসামী আসলেই একজন দুষ্ট প্রকৃতির। এর আগেও সে এ ধরনের নানা অপরাধ করেছে কিন্তু এবার ঠিকই ধরা খেয়েছে। তার উচিত বিচার হোক।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আরো সংহতি প্রকাশ করেন বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠনের সভাপতি আশীষ কুমার হাজং, সাধারণ সম্পাদক পল্টন হাজং, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আন্তনী রেমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ, বাদল হাজং, আদিবাসী নেত্রী মল্লিকা চাকমা প্রমুখ।

উল্লেখ্য যে, গত ১৪ আগস্ট সকালে রাজাই গ্রামের আব্দুল রাশিদ (৪৫), পিতা আবুল কালাম কর্তৃক এক হাজং তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়। ভিকটিম ঘটনার দিন সকালে বাড়ির অদূরে রাজই ছড়াতে গোসল করতে গেলে আগে থেকে উৎ পেতে থাকা অভিযুক্ত আব্দুল রাশিদ তার কাছে এসে ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোড়পূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। মেয়েটি সে সময় নিজেকে রক্ষার জন্য চিৎকার করলেও প্রবল বৃষ্টির কারণে তার চিৎকার কেউ শুনতে পায় নি। ঐ দিনই রাতে ভিকটিমের মায়ের অভিযোগে তাহিরপুর থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়, মামলা নং ১২ তারিখ ১৪/০৮/২০২১ খ্রি: ধারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ৯ (১)। মামলার তদন্তের দায়িত্ব পড়ে তাহিরপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) আবু বকর সিদ্দিকের ওপর।

১৫ আগস্ট সকালে ভিকটিমকে সুনামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে মেডিক্যাল টেস্ট করানো হয়েছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *