সংখ্যাঘুদের উপর হামলা, ঘর-বাড়ী ও মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় দোষীদেও গ্রেফতার ও বিচার দাবী

খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামে সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ী-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উপর হামলা এবং মন্দিরের বিগ্রহ ভাংচুরের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবী জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। দেশের বিশিষ্টজনেরা এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এ দাবী জানিয়েছেন। এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৭ আগস্ট,২০২১ তারিখ খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামে চারটি মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু দোকান ও কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা।। ঘটনায় প্রকাশ ৬ আগস্ট ,২০২১ তারিখ শুক্রবার রাত ৯টার দিকে পূর্বপাড়া মন্দির থেকে কয়েকজন নারীভক্ত হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে শিয়ালী মহাশ্মশানের দিকে যাচ্ছিলেন। পথের মাঝে একটি মসজিদ ছিল। মসজিদের ইমাম নারীদের কীর্তন করতে নিষেধ করেন। তখন কিছুটা তর্কাতর্কি হয়। বিষয়টি নিয়ে ৮ আগস্ট, ২০২১ তারিখ থানায় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শনিবার বিকেল পৌনে ৬টার দিকে পার্শ্ববর্তী চাঁদপুর, গাংনী, বামুনডাঙ্গা, শেখপুরা, আনন্দনগরসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় দু’ শতাধিক যুবক রামদা, চাপাতি, কুড়াল নিয়ে শিয়ালী গ্রামে হামলা চালায়। তারা অতর্কিতে বাজারের গণেশ মল্লিকের ওষুধের দোকান, শ্রীবাস মল্লিকের মুদি দোকান, সৌরভ মল্লিকের চা ও মুদি দোকান, অনির্বাণ হীরার চায়ের দোকান ও তার বাবা মজুমদারের দোকানসহ প্রায় ১০টি সংখ্যালঘুদের দোকান ভাঙচুর করে এবং বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করা হয়। এছাড়াও গোবিন্দ মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া হরি মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া দুর্গা মন্দির, শিয়ালী মহাশ্মশান মন্দিরের বেশিরভাগ প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। এ সময় কয়েকজন বাধা দিতে গেলে তাদের পিটিয়ে আহত করা হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, করোনাকালীন সময়ে সংখ্যালঘুদের উপর যে অত্যাচার হয়েছে এটা তারই আর একটি লজ্জাজনক উদাহরণ।

বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিভিন্ন কৌশল আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা পাবনার সাঁথিয়া (২০১৩ সাল) , কক্সবাজারের রামু (২০১২ সাল), ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার নাসিরনগর (২০১৬ সাল) ভোলার মনপুরা (২০২০), সুনামগঞ্জের শাল্লা (২০২১) ঘটনাগুলো জানি এবং বারংবার এ ধরণের ঘটনা বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলছি এবং দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ বিচারের দাবি করে আসছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ঘটনার তদন্ত শেষ হয়নি এবং প্রকৃত অপরাধীরা কখনোই আইনের আওতায় আসেনি। অপরদিকে, খুলনার রূপসায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার কথাটি প্রশাসন জানা সত্ত্বেও অপ্রীতিকর ঘটনা বন্ধে বা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কেন কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলনা? স্থানীয় সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের সদস্যগণও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের পাশে দাড়ায়নি। এ উত্তেজনার কথা সকল পক্ষই জানত। এছাড়া সংখ্যালঘুদের উপর এ ধরনের আক্রমনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমনের ক্ষেত্রেই পুলিশ ঘটনা ঘটার আগে বিষয়টি জানলেও তাদের নিষ্কৃয়তা বা সময়ক্ষেপন এসকল ঘটনা ঘটার সুযোগ করে দিচ্ছে। দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যের বিষয়টি হলো, বিগত দিনের প্রায় প্রতিটি ঘটনার মত এবারও তাৎক্ষনিক নয়, প্রশাসনের পক্ষ হতে সময়নিয়ে বৈঠকের প্রস্তাব ও প্রস্তাবিত বৈঠকের এক বা দুদিন আগে পরিকল্পিত হামলা এবং হামলার পর প্রশাসনের তথাকথিত তৎপরতার একই চিত্র পরিলক্ষিত হলো। এছাড়া প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার দায়ও এড়াবেন কিভাবে। এটাও লক্ষনীয় যে সব ধরণের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির নীরবতা ও নিস্ক্রিয় ভূমিকা দুর্বৃত্ত ও সাম্প্রদায়িক শক্তির ঔদ্ধত্য ক্রমাগত বাড়িয়ে চলছে। খুলনার রূপসায় সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতন, তাদের হয়রানি এবং মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাসহ পূর্বে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে সকল ঘটনা ঘটেছে তার তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি। এ ধরণের ঘটনা যাতে আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি যে কোন ধরণের সাম্প্রদায়িক হামলা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা জন্য সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়ে আসার জন্য আমরা দাবি জানাচ্ছি।

এই বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হচ্ছেন, এড. সুলতানা কামাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী, বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক, সাবেক বিচারপতি, আপীল বিভাগ, খুশী কবির, নারী নেত্রী ও সমন্বয়ক, নিজেরা করি, ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি, এড. রাণা দাশগুপ্ত, প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এড. সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, এড. জেড আই খান পান্না, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, সদস্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, এড. তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ড. আবুল বারকাত, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ড. জোবাইদা নাসরীন, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ফারহা তানজীম তিতিল, সহকারি অধ্যাপক, ইসলামি বিশ^বিদ্যালয়, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, নির্বাহী পরিচালক, রিব, কাজল দেবনাথ, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সঞ্জীব দ্রং, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, দীপায়ন খীসা তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, আদিবাসী ফোরাম,এড. সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান নির্বাহী, বেলা, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অনারারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট এবং শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *