নয়া সংযোগ, নয়া সংহতি: পাভেল পার্থ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ভিত্তি সুরের সাথে মিল রেখে করোনাকালের বিশ্ব আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ। ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়, আদিবাসীদের সাথে নিয়ে একসাথে, দরকার এক নয়া সামাজিক সংযোগ ও সংহতি’। কী সেই সামাজিক সংযোগ বা সংহতি? কার সাথে কার? যদি বাংলাদেশের কথাই ধরি তবে সতের কোটি মানুষের দেশে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা খুব বেশি হলে পঞ্চাশ লাখ। সংখ্যায় নগণ্য, নড়বড়ে বসতি, ক্ষুধায় কাতর, কার্যত ভূমিহীন আর গরিব দিনমজুর এই মানুষেরা কেন বারবার দুনিয়ায় ‘উদাহরণ’ আর ‘মনোযোগ’ হয়ে ওঠেন? কী অবদান এই নিরন্ন, ভূমিহারানো মানুষদের? যতবার দুনিয়া বিপদে পড়েছে, সামাল দিয়েছে উত্তাল সংকট ততবার দুনিয়া একটু হলেও স্মরণ করেছে এই সবহারানো মানুষদের। এমনকি চলমান করোনা মহামারিকালে আবারো দুনিয়া স্মরণ করেছে আদিবাসী মানুষদের। আদিবাসী মানুষের জ্ঞান, কারিগরি, দর্শন আর জীবনবোধের। আদিবাসী মানুষেরা দুনিয়ার সাথে কোনো ছলনা করেনি। এই মাতৃদুনিয়াকে চুরমার করে দুমরেমুচরে দোকানে তুলেনি। এখানকার জল, মাটি, অরণ্য, পাহাড়, বাতাস কী জীবকূল সবকিছুর সাথে মিলেমিশে থাকতে চেয়েছে। সহ¯্রবছর ধরে দুনিয়াকে একটা জগতসংসার বলেই চিন্তা করেছে। যার কোনো মালিকানা নিজে দাবি করেনি কোনোদিন, সন্তানকেও এই শিক্ষাই দেয়ার চেষ্টা করেছে। বুঝতে পারেনি দুনিয়ায় ভূগোল, ইতিহাস, অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ভিন্ন ভিন্ন হয়। একটা পাহাড় কী বড় নদী কখনো দুই টুকরো হয়ে যায়, পাহাড় আর নদীর নাম বদলে তখন হয় ‘রাষ্ট্র’। হয়তো আদিবাসী মানুষ নিজেদের বহুজাতিক বাজারের চৌকস ভোক্তায় পরিণত করতে পারেনি বা নয়াউদারবাদী ব্যবস্থায় নিজেদের জান-জবান বিলাতে পারেনি। আর হয়তো তাই এমন মানুষেরা অধিপতি উন্নয়নের মাপকাঠিতে ‘পিছিয়ে আছে’। আচ্ছা যদি একটু উল্টো করে দেখা যায়, আদিবাসী জগত যে দর্শন ও জীবনবোধ ধারণ করে তা যে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত সেটিই ‘পিছিয়ে থাকা উন্নয়ন’। চলতি আলাপখানি মূলত একটুখানি উল্টো করে দেখার মানত করেছে। বেশ কিছু মানুষের সাথে মেলামেশার অভিজ্ঞতা থেকে লেখাটি দাঁড় করানো। আমার কাছে এরা দার্শনিক, সকলেই আমার প্রণম্য শিক্ষক। বাস্তুতন্ত্র, প্রাণ, প্রকৃতি ও প্রতিবেশের জটিলসব সূত্র ও বিজ্ঞান গাঁথুনি আমি এদের থেকেই অর্জন করেছি। চলতি আলাপ মনে করে, পিছন থেকে কাউকে সামনে আনতে হলে কেবল কোনো শারিরীক ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী নয়, তার সামগ্রিক জীবনবোধ আর চিন্তাদর্শনকে সামনে আনা জরুরি। কারণ স্বকীয় জীবনবোধ আর আত্মপরিচয়ের জটিল সীমানাই আদিবাসী মানুষের সত্যিকারের উপস্থিতি। আর এ কারণে আজ আদিবাসী সমাজ ও বৃহত্তর জনসমাজের ভেতর দরকার এক নয়া সৃজনশীল সংযোগ, দরকার এক সংবেদনশীল সংহতি।

নসিফ পথমির পরীক্ষাগার
আদমপুর রেঞ্জের কাউয়ারগলা বনবীটে ‘গহীন বনের’ ভেতর একটা ছোট্ট খাসি পুঞ্জি আছে। নাম কালেঞ্জি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্তে পড়েছে। ছড়ার পাড়ে উঁচু সব বৃক্ষ-ফার্ণ আর নানা জাতের কচুর ঝোপ। কেমন এক মায়াময় বর্ষারণ্যের পরিবেশ। কালেঞ্জি পুঞ্জির নসিফ পথমির কাছে আমার যেদিন ‘খাসি উদ্ভিদবিদ্যার’ হাতেখড়ি হয় আমি নসিফের ঘরে ঢুকে বেহুঁশ হয়ে যাই। চারধারে ঝুলছে নানা লতাগুল্ম, ডাল, কন্দ, শেকড়, পাতা, ফুল। নসিফের সাথে সকালে বের হই, বনবাদাড় ঘুরে বিকাল নাগাদ পুঞ্জিতে ফিরি। একদিন কিছুটা বৃষ্টি হয়েছিল, দুপুর বা মধ্যবিকেলে এক চকচকে পাতার কচু নিয়ে নসিফের সাথে তর্ক হয়। খাসি ভাষায় এর নাম ‘নিয়াংসোয়াত’। এই কচুর যে উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় আমি জানি, নসিফ জানান এটি সেটি নয়। পরের সকালে নসিফ আমার বলা কচুটিও খুঁজে আনেন। আমি দুটি কচুর ভেতর কোনো অমিল খুঁজে পাই না। নসিফ আমাকে কচু দুটি সণাক্তকরণে এক গোপন শ্রেণিকরণ জ্ঞান দান করেন। আমার মুখের হা বন্ধ হয় না। নমুনাসমেত ঢাকায় ফিরে ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে যাই। ড. হোসনে আরা বেগম তখন কচু নিয়ে পিএইচডি করছেন। তিনিও কচু দুটিকে প্রথম একই প্রজাতি হিসেবে সণাক্ত করেন। পরে আমি নসিফের বিবরণটি বলি। বেশ সময় নিয়ে বহু নিরীক্ষার পর প্রমাণিত হয় নিয়াংসোয়াত আসলেই একটি আলাদা কচুর জাত। বাংলাদেশে যা প্রথম নতুনভাবে সণাক্ত হয় এবং এ বিষয়ে গবেষণাপ্রবন্ধও প্রকাশিত হয়।

উল্কিগুরু লিলমনি ঋষি
দেশজুড়ে বিস্মৃত হওয়া উল্কির ইতিহাস ও কারিগরি খুঁজতে গিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের ফকদনপুর কালীতলার মুসহরপাড়ায় লিলমনি ঋষির সাথে পরিচয়। সাদ্রীভাষী মুসহর সমাজে শরীরে উল্কি আঁকা এক ঐতিহ্যগত রীতি। মুসহর ভাষায় একে খদনী বা গদানী বলে। পুরুষের চেয়ে নারীদের শরীরেই খদনী বেশি দেখা যায়। শরীরে খদনী আঁকা মুসহর সমাজে জাতিগত চিহ্ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সৌন্দর্য এবং নিজস্ব চিত্রশৈলীর বিষয়। খদনী আঁকিয়েদের মুসহর সমাজে খোদনী বলে। লিলমনি এমনি একজন সম্মানিত খোদনী। লিলমনির কাছ থেকে শিখেছি, শরীর রক্ত-মাংসের। এ শরীরের বিনাশ আছে। খদনী দিয়ে এক শরীর থেকে আরেক শরীরকে আলাদা করা হয়। শরীরকে চিহ্নিত করা হয়। এটি সমাজের চিহ্ন। সমাজ এই চিহ্ন শরীরে ধারণ করার অধিকার তাঁকে দিয়েছে। ইচ্ছে হলেই যে কেউ যেকোনো চিহ্ন শরীরে ধারণ করতে পারে না। খদনীর মাধ্যমে শরীরকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ফগা হাঁসদার জঙ্গল
বাংলাদেশের গুরুত্ববহ এক শালবনের সাঁওতালি নাম শারশাবীর। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ শারশাবনের আলোকধূতির ফগা হাঁসদার কাছে বিশেষ সাঁওতালি কবিরাজি দীক্ষা নেই। ফগা হাঁসদা শিখিয়েছেন, জংগলই ধর্মকে জন্ম দিয়েছে, মানুষকে কর্ম দিয়েছে। জংগল এক বিরাট সংসার। এখানে কেউ অজানা, কেউ আত্মীয়। বৃক্ষ তরুলতা, পাখি পতঙ্গ, সাপ ব্যাঙ, মানুষ সব নিয়েই জংগল। জংগলের মরণ মানে সকলের মরণ। ক্ষুধায় কাতর মানুষকে জংগল আলু দেয়। আড়হা, সাং, বায়াং, ডম্বরু, কুলু, চেমুয়া, ডুরে কত জাতের আলু। ওরতুত, মুচি ওট, ওতাম ওট, পুটকা ওট কত বাহারি জংলী মাশরুম। নানান ফল আর শিকার। অসুখেবিসুখে জংগলই বড় ডাক্তারখানা। ঝড়তুফানে জংগলের ঘনলতাঝোপ বান্দোনাড়ি মানুষ ও পশুপাখিকে আশ্রয় দিয়েছে। জংগল গান দিয়েছে, বাহা উৎসবে রঙবেরঙের ফুল দিয়েছে।

অজিত রিছিল ও আগ্রাসি একাশিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালীন আগ্রাসি একাশিয়া আর বাঁশঝাড়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়ে একটা সমীক্ষা করেছিলাম। দেখেছিলাম একাশিয়ার মতো আগ্রাসি গাছের তলায় কিছুই জন্মায় না। পরে দেশঘুরে আগ্রাসি গাছের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ গুলো জানতে পারি। কিন্তু নেত্রকোণার দূর্গাপুরের মেঘালয় পাহাড়ের তলায় মেনকীফান্দা গ্রামের এক টিলায় শিক্ষক অজিত রিছিলের সাথে সাক্ষাতের পর একদম থ হয়ে যাই। আগ্রাসি গাছের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই মানুষটি জেলজুলম সহ্য করেছেন। বনবিভাগ প্রাকৃতিক শালবন উপড়ে একাশিয়া চারা লাগিয়েছিল। অজিত রিছিল একাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। আগ্রাসি গাছের বিরুদ্ধে মেনকীফান্দা আন্দোলন আমাকে স্থানীয় বৃক্ষপ্রজাতির বাস্তুতন্ত্র এবং এর সাথে মানুষের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের জটিল বিন্যাসগুলো বুঝতে সহায়তা করেছে।

সেকরে ¤্রাে ও পতঙ্গ-পঞ্জিকা
বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে আমার জুমচাষ শেখার শিক্ষক ছিলেন মূলত মধ্যবয়সীরা। শতবর্ষী সেকরে ¤্রাের সাথে পরিচয় ঘটে পরে। জুম থেকে ফিরে সন্ধ্যায় এমপুপাড়াতে আসর জমতো, সেকরে ছিলেন তার মধ্যমণি। দুনিয়ায় নানারকম বর্ষপঞ্জিকা হয় জানতাম। কিন্তু এক এক পোকার ডাক ও উপস্থিতি দিয়েও ঋতু ও মাস বুঝতে পারার মতো পতঙ্গ-পঞ্জিকার কথা যখন সেকরে জানান তখন থ হয়ে যাই । এক পোকা ডাকল জুমে বীজ বুনতে হয়। আবার আরেক পোকা ডাকলে ফসল তোলার সময়। সেকরে ¤্রাে থেকেই শিখেছিলাম প্রকৃতির সংকেত ও নির্দেশনাগুলো বুঝলে আদতে একটা জীবনচক্র আন্দাজ করা যায়।

গংশে রাখাইনের নদীকথা
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার সমুদ্র আর নদী লাগোয়া তিনশ বছরের এক প্রাচীন রাখাইন গ্রাম ছয়ানিপাড়া। নদীর সাথে রাখাইন বসতির আছে এক ঐতিহাসিক সংযোগ। রাখাইন ভাষায় নদী আর গ্রামের নাম গুলি গড়ে ওঠে নদীর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ওপর। গংশে জানিয়েছিলেন, নদী আর মানুষের জীবন এক সাথে বয়ে যায়। এক আদি রাখাইন গ্রামের নাম ছিল ¤্রাইবুনিয়া। ¤্রাই মানে সমুদ্র মোহনার নদী এবং বুনিয়া মানে কিনার। ¤্রাইবুনিয়া গ্রামটিরও অবস্থান ছিল সমুদ্র মোহনার নদীর কিনারে। রাখাইন ভাষায় মো মানে খুব বৃষ্টিপ্রবণ, ¤্রাই মানে নদী। মোধুপ্রিমাই মানে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকার নদী। কিন্তু এসব নদীকথা হয়তো আর থাকছে না, পায়রা সমুদ্র বন্দরের জন্য হয়তো হারিয়ে যাবে ছয়ানিপাড়া।

দয়ারঞ্জন চাকমার ডুবন্ত স্মৃতি
একটা সময় খাগড়াছড়ির ভৈরফাতে থাকতাম সুপ্তা আর অনিমেষ চাকমাদের ঘরে। কিন্তু রাতবিরেতে দয়ারঞ্জন চাকমার কাছে ধুম ধরে পড়ে থাকতাম। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে ডুবে গিয়েছিল তাদের গ্রাম। বসতির পর বসতি। তলিয়ে যাওয়া গ্রামগুলির গল্প শুনতাম, মানচিত্র তৈরি করতাম। বুঝতে পেরেছিলাম উন্নয়ন কারো কারো জীবনে সর্বনাশা উচ্ছেদ তৈরি করে।

কালেঙ্গার শচিকুমার দেববর্মা
আমার জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে রেমা-কালেঙ্গা বনের ত্রিপুরা গ্রামে। প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রতিবেশবিদ্যা শিক্ষার এক জটিল বিদ্যালয় ছিল এই অরণ্য। ত্রিপুরারা নিজস্ব পূজারীকে অচাই বলেন। পুরানবাড়ির শচিকুমার দেববর্মা ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ অচাই এবং আমার এক শিক্ষাগুরু। কত বর্ষা কী হেমন্ত সকাল কী সন্ধ্যা আমায় অরণ্য জংগলে ঘুরে ঘুরে শিখিয়েছেন ত্রিপুরা অরণ্যবিজ্ঞান। জেনেছি ত্রিপুরাদের জটিল অরণ্যদর্শন। এমনকি ২০০০ সনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জনউদ্ভিদ সমীক্ষার কাজেও রেমা-কালেঙ্গার ত্রিপুরাদের উদ্ভিদ জ্ঞান আমার সামনে খুলে দিয়েছিল আরেক চিন্তা-দুয়ার।

অনিতা মৃর দেলাং
টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবন আমার আরেক বিদ্যালয়। চুনিয়া গ্রামের অনিতা মৃ আর জনিক নকরেকের পরিবার ছিল আমার ভিত্তিঘর। মান্দি বা গারো জীবনের অবিস্মরণীয় সব আখ্যান জেনেছি অনিতা মৃর কাছ থেকে। আমরা ডাকতাম ‘আম্বি’, মানে নানি বা দাদি। আম্বি মারা যাওয়ার পর আদি সাংসারেক ধর্মীয় রীতিতে মৃতের স্মরণে ‘দেলাং’ নামের ঘর বানানো হয়েছিল। যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দেলাংশুয়া’ কৃত্য হয় ভোর আকাশে জ্বলজ্বল করছিল এক আশ্চর্য ধ্রুবতারা। আম্বির কাছ থেকে শিখেছি পরিবার, সংসার, সমাজ, স্বজন, প্রতিবেশীর অর্থ। জেনেছি, মানুষ কখনোই একা থাকতে পারে না, একা চলতে পারে না, একা বাঁচতে পারে না।

চাবাগানের পাহাড়ি মুন্ডা
মৌলভীবাজারের পাথারিয়া চাবাগানের হলেও পাহাড়িয়া মুন্ডার সাথে আমার পরিচয় মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের চূড়ায়। তখন কয়েকপ্রস্থ তাক তাক জটা তার মাথায়। চাবাগানের কাজ শেষে মাধবমন্দিরের দেখভাল করতেন। জংগলের কবিরাজ বলে অনেকে মানতো তাকে। আমি বুঝেছিলাম ‘উপনিবেশ’। উপনিবেশ কিভাবে মানুষের স্মৃতি-বিস্মৃতি, চিহ্ন, নিদর্শন সবকিছু চুরমার করে ফানাফানা করে দেয় চাবাগানের দীর্ঘ বঞ্চনার ফিরিস্তি এক পাহাড়ি টিলায় আমার কাছে মেলে ধরেছিল উপনিবেশের জনবিশ্লেষণ।

দরকার নয়া সংযোগ, নয়া সংহতি
লেখায় বর্ণিত এমন সহ¯্রজনের সাথে আমার অবিস্মরণীয় সব সময় কেটেছে। শিখেছি প্রাণ-প্রকৃতির অনন্য ব্যাকরণ। বুঝেছি মাতৃদুনিয়ার টিকে থাকবার শর্ত। এই মানুষেরা যেভাবে পৃথিবীকে দেখেছেন, যেভাবে জীবনকে আন্দাজ করেছেন এই পৃথিবী কী সেই ধারাপাত মানছে? ক্ষমতা আর নয়াউদারবাদী বাজার কী বলে? তাহলে ‘কাউকে পেছনে না রেখে’ যদি সবাইকে নিয়ে সমানতালে উন্নয়নের ময়দান আমরা দেখতে চাই সেখানে এই মানুষদের জীবনবীক্ষা আর দর্শন কোথায় থাকবে? উন্নয়নযাত্রার পেছনে না সাথে? প্রশ্নটি আজ সবার জন্যই উন্মুক্ত রইলো। অনেকেই বলবেন হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহ, উলগুলান, তেভাগা, নানকা, হাতিখেদা, টংক, ভানুবিল, চাবাগানের হাতবন্ধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম সবখানেতেই আদিবাসী-বাঙালির শ্রেণিগত ঐক্য গড়ে ওঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধে গড়ে ওঠেছিল দুর্বার সংহতি। কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে ইকোপার্কবিরোধী লড়াই বা ফুলবাড়ি কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনেও আমরা আদিবাসী ও বাঙালির মিশ্র অংশগ্রহণ দেখি। কিন্তু এসব সংযোগ আর সংহতির গভীরেও যেন রয়ে গেছে উপনিবেশিকতার এক নিদারুণ দেয়াল। এই দৃশ্যমান কি অদৃশ্য বা ঝাপসা বা আড়াল করে রাখা দেয়াল চুরমার করে তলিয়ে দেয়া জরুরি। আদিবাসী জীবনের সমৃদ্ধ জ্ঞানপ্রবাহ, বিজ্ঞান কারিগরি, প্রকৃতি সংরক্ষণবিদ্যা, পরিবেশগত অবদান, সৃষ্টিকর্ম, শিল্পকলা, দর্শন আর পরিশ্রমী ইতিহাসকে সম্মান, স্বীকৃতি আর সুরক্ষার ভেতর দিয়েই কেবল এক নয়া সৃজনশীল সংযোগ ও সংবেদনশীল সংহতি গড়ে ওঠতে পারে।

……………………………….
গবেষক ও লেখক। ই-মেইল: [email protected]

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *