আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২১ উপলক্ষ্যে সম্প্রীতির যুব সংলাপ

আজ ৭ আগস্ট সকাল ১১:৩০ ঘটিকায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২১ উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আয়োজনে সম্প্রীতির এক ভার্চুয়াল যুব সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের ফেসবুক পেইজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

সংগঠনের সভাপতি অনন্ত বিকাশ ধামাই এর সভাপতিত্বে এবং চন্দ্রা ত্রিপুরার সঞ্চালনায় উক্ত যুব সংলাপে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সহ-সভাপতি তৌহিদুর রহমান, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতি হরেন্দ্রনাথ সিং, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক রিপন চন্দ্র বানাই ছাত্র, শিক্ষক ও সংস্কৃতি কর্মী মুকুল কান্তি ত্রিপুরা, সংস্কৃতি কর্মী তুহিন কান্তি দাস, উন্নয়ন কর্মী লামিয়া মহসীন, দৈনিক প্রথম আলোর স্টাফ রিপোর্টার ড্রিঞ্জা চাম্বুগং, উদ্যোক্তা খাইথেম সিথি সিনহা প্রমুখ।

তৌহিদুর রহমান সংলাপে বলেন, সমতলে পৃথক ভূমি কমিশন না থাকার কারনে সমতলের আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত ভূমি হারাচ্ছে। তিনি আরো বলেন পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ভূমি কমিশনের আইন বাস্তবায়ন না হাওয়ার অন্যতম কারন হচ্ছে সরকার বিভিন্ন মহল ভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সৎ ইচ্ছা থাকতে হবে এবং আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে পিছনে ফেলে নয় এসডিজির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

তুহিন কান্তি দাস তার বক্তব্যে বলেন, এদেশের উন্নয়ন হলেও আদিবাসীদের এখনো উন্নয়ন হয়নি। আদিবাসীদেরকে এখনো এই রাষ্ট্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়নি। তিনি আরো বলেন, অবকাঠামো নির্ভর উন্নয়নের ফলে সংস্কৃতি পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই রাজনৈতিক সচেনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাবর্ত্য চুক্তিকে তিনি মুক্তির সনদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার তার প্রতিশ্রুতি রাখেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শিক্ষক ও সংস্কৃতি কর্মী মুকুল কান্তি ত্রিপুরা আলোচনায় বলেন, একজন মানুষকে তখনই প্রতিষ্ঠিত বলা হয় যখন তিনি সামাজিক, রাজনেতিক ও আর্থনেতিকভাবে সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। ঠিক তেমনি আদিবাসীদেরকে রাষ্ট্রের সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করে এসডিজি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে হবে। আদিবাসীদের নিজ ভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন আদিবাসীরা অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার হচ্ছেন। একটি জাতির অস্তিত্বই হচ্ছে সংস্কৃতি। তাই রাষ্ট্রকে আদিবাসী বান্ধব হয়ে আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষা ও সংরক্ষণে এগিয়ে এসে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন।

রিপন চন্দ্র বানাই সংলাপে বলেন, আদিবাসীরা ইচ্ছে করে পিছিয়ে পরেননি এই রাষ্ট্রই আদিবাসীদেরকে পিছিয়ে রেখেছে। তাই রাষ্ট্রকে নতুনভাবে অঙ্গীকার করতে হবে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে।

লামিয়া মোহসীন বলেন, বাংলাদেশের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকার কারনে আদিবাসীরা বিভিন্নভাবে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোন একটা গোষ্ঠীকে পিছনে ফেলে কখনো দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। তাই তিনি আদিবাসীদের সাথে নিয়ে এসডিজির গোল বা লক্ষ্য মাত্রা পূরণের আহ্বান জানান।

ড্রিঞ্জা চাম্বুগং সংলাপে অংশগ্রহণ করে বলেন, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম গুলোকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারনে আদিবাসী শব্দ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না।

হরেন্দ্রনাথ সিং বলেন, এদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকার কারনে এদেশের তরুণ সমাজ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে নিজেদের জীবন বাজি রেখে। তাই তিনি শিক্ষিত তরুণদের নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য রাষ্ট্রের কাছে আহ্বান জানান।

খাইদেম সিথি সিনহা তার বক্তব্যে বলেন, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে বিশেষ করে একজন আদিবাসী উদ্যোক্তা হিসেবে সব ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়। তিনি আরো বলেন অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সংস্কৃতিগুলোকে ভূলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

অনন্ত ধামাই সভাপতির বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পঞ্চাশ বছর পরও এদেশের আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আদিবাসীদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র প্রতিনিয়ত চলছে বলেও দাবি করেন এই আদিবাসী যুব নেতা।

পরিশেষে আদিবাসী যুব সংলাপ থেকে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করেন।

১। আদিবাসী যুবদের জীবনমান টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আদিবাসী যুব সংগঠনসমূহের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে রাষ্ট্র কর্তৃক আদিবাসী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রনয়ন করতে হবে;

২। আদিবাসী তরুণ ও যুব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটা নিশ্চিত করতে হবে;

৩। আদিবাসী যুবদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে, কর্মক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা ও তাদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে হবে;

৪। আদিবাসী যুবদের নেতৃত্ব বিকাশ, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গস্খহণ করতে হবে;

৫। আদিবাসী কন্যা শিশু ও যুব নারীর প্রতি সকল ধরণের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ঘটে যাওয়া সহিংসতাগুলোর ন্যায় বিচার করতে হবে;

৬। আদিবাসী যুবদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার মিথ্যা মামলা-হয়রানি বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে;

৭। আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে;

৮। অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে;

৯। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে;

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *