চলে গেলেন ড. মানিকলাল দেওয়ান

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির সাবেক ডীন অধ্যাপক ড: মানিকলাল দেওযান আজ বৃহস্পিতবার সকালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন। পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে ড: মানিকলাল কিছুদিন পূর্বে সপরিবারে করোনা আক্রান্ত হন। চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি করোনামুক্ত হয়ে রাঙ্গামাটির মাঝেরবস্তি এলাকার ট্রাইবেল অফিসার্স কলোনীতে নিজ বাসভবনে অবস্থান করছিলেন। গত বুধবার রাতে হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতা বোধ করলে তাকে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সকাল ১১ টার দিকে সেখানেই তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে বলে সেখানকার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

ড: মানিকলাল দেওয়ানের মৃত্যুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ একজন গুণবান শিক্ষাবিদকে হারাল। ড: মানিকলাল ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনকারী। দীর্ঘ সময় তিনি ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। সেখানে ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির ডীনের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। বাকৃবি-র প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।

২০১৩ সালে প্রকাশিত ড: মানিকলাল দেওয়ানের জীবনীগ্রন্থ “আমি ও আমার পৃথিবী” থেকে জানা যায়, ১৯৩৫ সালের ১লা জানুয়ারি রাঙ্গামাটিতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম প্রিয় মোহন চাকমা এবং মাতার নাম করুণা দেওয়ান। ১৯৫২ সালে তিনি রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে School Final পাশ করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কলেজ অব ভেটেরিনারি সায়েন্স থেকে ১৯৫৮ সালে বিএসসি পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি সেখানে সহকারী প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬১ সালে তিনি USAID বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমেরিকার Texas A & M University থেকে M. S in Pathology ডিগ্রী লাভ করেন। Armed Forces Institute of Pathology, Washington Dc থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন East Pakistan Agricultural University – তে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বৃত্তি লাভ করে ১৯৭১ সালে মস্কো ভৈটেরিনারি একাডেমি থেকে PHD in Veterinary Pathology অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাকৃবি-তে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাকৃবি-তে প্যাথলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠাকালীন বিভাগীয় প্রধানের দ্বায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দুইবছর তিনি বাকৃবি-র ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির ডীন হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করেন। ১৯৮০-৮১ সালে ইরাকের মসুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

ড: মানিকলাল কৃতিত্বপূর্ন শিক্ষাজীবন এবং বর্ণাধ্য কর্মজীবনে বহু সম্মান ও পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচার তাকে Dr. S.D Chaudhuri Gold Medal এ ভূষিত করে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে আজীবন সম্মাননা পদকে ভূষিত করে। তাঁর নামানুসারে সেখানে একটি “ড: এম এল দেওয়ান সম্মেলন কক্ষ” স্থাপন করা হয়েছে। ২০০০ সালে তিনি অধ্যাপনা থেকে অবসর নেন। পরবর্তীতে ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাাম চুক্তির আলোকে প্রতিষ্ঠিত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে খ্যাতির সাথে দ্বায়িত্ব পালন করেন। ড: মানিকলাল দেওয়ানের মৃত্যুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর আত্মীয়বর্গ ও শুভান্যুধায়ীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আগামীকাল শুক্রবার সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর দাহকার্য সম্পাদন করা হবে বলে জানা গেছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *