পাহাড়ের পাড়া কেন্দ্র শিশুদের জন্য শিক্ষার আলো

সুমন্ত চাকমা, জুরাছড়ি, নিজস্ব সংবাদদাতাঃ রাঙামাটি পার্বত্য জেলার জুরাছড়ি উপজেলা। এ উপজেলার সব চেয়ে দুর্গম ও সীমান্তে অবস্থিত দুমদুম্যা ইউনিয়ন। এখানে যাতায়তের একমাত্র মাধ্যম পায়ে হাঁটা। খুব ভোরে উচু নিচু পাহাড় বেয়ে দু”দিন সময় লেগে যায় ইউনিয়নের বগাখালীতে পৌঁছাতে। তাইতো কোন কর্মকর্তা সাহস পায়না সেখানে যেতে। বছর বছর ধরে বঞ্চিত মৌলিক অধিকার থেকে তারা। তবে এখন আর সেই দৃশ্য নেই। প্রতিটি শিশু শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
থেগা নদী, পাহাড়, ঝিড়ি, ছায়াঘন বনবনানী পরিবেষ্টিত অসংখ্য বন্য পশুপাখির বিচিত্র ডাকে মুখরিত এই ইউনিয়নের গুচ্ছ-গুচ্ছ গ্রামে ২২টি পাড়া কেন্দ্র রয়েছে।
১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সমন্বনিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের এ সব প্রতিষ্ঠার পর প্রত্যন্ত ও দুর্গম পাহাড়ের ভাঁজে-ভাঁজে যেন বেজে উঠে অন্য আরেক রোমাঞ্চকর জেগে উঠার উচ্চসিত শাশ্বত রাগীনির অমোগ সুর-মুর্ছনা। সকালে পাড়া কেন্দ্রের ঘন্টার আওয়াজ, ৩-৫ বছরের শিশুদের কল-কোলহ, জাতীয় সংগীতের ধ্বনি ও অ তে অজগর, আ তে আম, ক তে কলা, শিশুদের ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে যায় অনেকের। এ দৃশ্য এখন দুর্গম দুমদুম্যা ও মৈদং ইউনিয়নে।
১৯৯৮ সালে রাঙামাটি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রত্যক্ষ করলেন, পাহাড়ের অরণ্যাচারী সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সন্তানদের দুর্বিসহ জীবনযাপনের অমানবিক করুন চিত্র। তারা বুঝতে পারলেন, একমাত্র শিক্ষার অভাবেই পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলোর এই পশ্চাৎপদতা। তাদের আধুক চিন্তাচেতনায় উজ্জীবিত করতে হলে প্রয়োজন শিক্ষার পাদপ্রদীপ নিয়ে আসা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের জুরাছড়ি সমন্বনিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ১২৩ জন নিষ্ঠাবান শিক্ষকের পরিচালনায় ও সেই সাথে ১২ জন সিনিয়র পাড়া কর্মী এবং ৩জন তত্বাবধায়কের নিরলস প্রচেষ্টায় ৪৬০০ জন প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার্থী নিয়ে আলোর পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে তারা। বর্তমানে জুরাছড়ি, বনযোগীছড়া, মৈদং ও দুমদুম্যা ইউনিয়নে ১২৩টি পাড়া কেদ্রের ১০০০জন শিশু অধ্যায়নরত।
এছাড়া পাড়া কর্মীদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত অবস্থার উন্নয়ন সাধন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, শিশু ও মহিলাদের স্বাস্থ্য, পুষ্ঠি ও শিশুর বয়স উপযোগী যতœ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ এবং মহিলাদের অংশগ্রহনে টেকসই সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ ও মহিলাদের ক্ষমতায়নের সচেতনতা বৈঠক করা হয়।
দুমদুম্যা ইউনিয়নের বগাখালী কার্ব্বারী(গ্রাম প্রধান) ও দুমদুম্যা মৌজার হেডম্যান সমূর পাংখোয়া জানান, পাড়া কেন্দ্র গুলো গ্রাম ভিত্তিক স্থাপনে শিশুদের লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছে। এ সব পাড়া কেদ্রে গুলে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যায়নের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে শিশুদের নিরাপদ লেখা পড়া করা সম্ভব। যেহেতু প্রতিটি পাড়া কেন্দ্র হতে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো ১৫-২০ কিলোমিটার পাহাড়ী রাস্তার দুরুত্ব।
দুমদুম্যা ইউনিয়নের জ্যেষ্ঠ পাড়া কর্মী শিউলী চাকমা ও লাল মুনি তঞ্চঙ্গ্যা জানান, এ সব পাড়া কেন্দ্রে ৩-৫ বছরের শিশুদের হেসে খেলে প্রাম্ভিক শিক্ষা ও ৫-৬ বছরের শিশুদের বর্ণ মালা শিখনে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
প্রকল্প সংগঠক পূর্ণ মঙ্গল চাকমা জানান, যথাযথ দেখভালের মাধ্যমে শিশুদের প্রাক শিক্ষার পাশাপাশি পাড়াকর্মীদের মাধ্যমে প্রসূতি মাদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, কিশোরী, গর্ভবতী দুদ্ধদানকারীদের আয়রন টেবলেট খাওয়ানো, মা ও নবজাতকের যতœ বিষয়ে সেবা ও পরামশ্য প্রদান করা হয়।
এছাড়াও শিশুদের টিকা গ্রহণ, কিশোরী ও গভবর্তীদের টিটি টিকা গ্রহনে সহায়তা, নিরাপদ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার, স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে হাঁত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ডায়রিয়া ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ওআরটি ও মশারী ব্যবহারের পরামর্শ মূলক সেবা প্রাদান করা হচ্ছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক চিচি মুনি চাকমা জানান, ৪০-৫০ টি পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি পাড়া কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এ সব পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রাক শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্ঠি, পানি ও পয়োনিস্কাশন, শিশুর সুরক্ষার কাজ করা হয়ে থাকে।
দুমদুম্যা ইউপি চেয়ারম্যান শান্তি রাজ চাকমা জানান, দুর্গমতা বিবেচনা করে পাড়া কেন্দ্র বৃদ্ধি ও পাড়া কেন্দ্র গুলোতে প্রাক প্রাথমিকের পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত উন্নতি করা জরুরী।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী জানান, সম্প্রতি দুমদুম্যা ইউনিয়ন পরির্দশনকালে এসব পাড়া কেন্দ্র গুলোতে শিশুদের পাঠদান ও শিশুদের মানসিক বিকাশের প্রচেষ্টা লক্ষ করেছি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *