আমার বন্ধু রাজীব: সুমু হক

ঈশ্বর নাকি পৃথিবী থেকে ভালো মানুষগুলোকে চিরকাল আগেভাগেই উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে থাকেন।
যদিও তাঁর এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে কি যুক্তি কাজ করে আমার জানা নেই, মানুষকে যদি তিনিই ভালোই বসবেন, তাহলে সেই মানুষের পৃথিবীটাকে বসবাসযোগ্য করে রাখবার জন্যে এর উল্টোটাই কি তাঁর করা উচিত নয়!
যদি কোনদিন তাঁর সাথে দেখা হয় তাহলে ঈশ্বরের সাথে এই নিয়ে বেশ এক চোট তৰ্ক করা যেতেই পারে, কিন্তু তাতে তো আর তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আমার বন্ধুটিকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না!
আমি ২০০০-২০০১ সালে মাত্র ৮ কি ৯ মাস এই বিভাগের শিক্ষার্থী হবার সুযোগ লাভ করেছিলাম। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়েই দেশের বাইরে পড়তে চলে আসি। কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সেই একটি বছরের যোগাযোগ এবং সেই সময়ের মানুষগুলোর বন্ধুত্ব এবং সান্নিধ্যগুলোই আমার বাকি জীবনটাকে আমূলে বদলে দেয়। আজও অবধি সেই সম্পর্ক, সেই বন্ধুত্বগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই দেশ ছেড়ে এলেও বিভাগের সাথে যোগাযোগ অটুট থাকে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বিভাগে পড়াকালীন কিন্তু রাজীব মীরের সাথে দেখা কিংবা পরিচয়, কোনটাই হযে ওঠেনি আমার।
তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা ২০০৩ সালের গ্রীষ্মে, কলাভবনে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ডক্টর নাদির জুনাইদের অফিসে।
কি একটা কাজে কোন এক দুপুরে স্যারের অফিসে ঢুকতেই দেখি দরজার পাশের চেয়ারটিতে মাথা নিচু করে বসে আছে কেউ, গাঢ় বাদামি রঙের একটা শার্ট পরা।
স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন, “আমার ছাত্র, রাজীব।”
কোনদিন দেখা না হলেও স্মিত হাসির সাথে বললো, “তোমাকে কিন্তু আমি চিনি।’
অন্য সময় হলে হয়তো আমি এমন অযাচিত মন্তব্যে খানিকটা অপ্রস্তুত হতাম, কিন্তু তাঁর হাসির ভেতর এমন কিছু একটা ছিল, যেটা ভীষণ আন্তরিক, দেখলে মনে হয়, আসলেই বহুদিনের চেনা।
বিদায় নিয়ে সে চলে গেলো। ঐটুকুই।
আমার জীবনে তাঁর দ্বিতীয় পর্যায়ের আবির্ভাব প্রায় ৯ বছর পর, ২০১২ তে, ফেসবুকের হাত ধরে।
আমাদের পরিচয়, বন্ধুত্ব, এবং অকাল বন্ধুশোক, সবটাই এই মাত্র ২০১২ থেকে ২০১৮ এই ছয়টি বছরের গল্প।
হয়তো এই ছয়টি বছরেই এক জীবনের সমান বন্ধুত্বের দায়ভার রেখে যাবার কথা ছিল ওর, তাই এত দ্রুতই এত আন্তরিক হয়ে উঠেছিল।
শুধু আমার কাছেই নয়, আমার ভাই, আমার মা, আমার পরিবারের কাছেও।
আমার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সঙ্কটের মুহূর্তগুলোতে নীরবে, বিন্দুমাত্র প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, একা হাতে তুলে নিয়েছে অনেক কাজের ভার, যখন পরিবারের কাছের মানুষগুলো ক্রমাগত ঠকিয়ে গেছে, পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে গেছে, রাজীব নীরবে সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে, যেখানে ও একা হাতে পারেনি, এমনকি ওর ছাত্রদেরকে বলেছে আমার পাশে এসে দাঁড়াতে।
রাজীবের চরিত্র নিয়ে যারা এত এত নোঙরা কথা রটায় তাদেরকে আমার কেবল একটাই কথা বলবার আছে, আমি বলছিনা, শুধু আমার বন্ধু বলেই রাজীব কোন অন্যায় করেনি কিংবা করতে পারে না, কিন্তু একথা জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার জীবনের যে সংকটময়, বিপন্ন মুহূর্তে আমার সাথে ওর পরিচয় হয়েছিল সে সময় অন্য যে কোন পুরুষই আমার মানসিক অবস্থার সুযোগ নিতে চাইতো এবং অনেকেই নিয়েছেও, কিন্তু রাজীব কিন্তু সেটা একটিবারের জন্যেও নেয়নি।
একজন শুধুমাত্র অনলাইনে পরিচিত হওয়া ব্যক্তি, যার সাথে একজন পুরুষের শারীরিক, মানসিক, আৰ্থিক, কোন সম্পর্কেই লাভবান হবার কোন সম্ভাবনা নেই, তার সংকটে আজকের সমাজে এমন নিঃস্বার্থভাবে কয়জন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন?
এত গেলো আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। ওর সাথে বন্ধুত্বের পুরোটা সময় জুড়ে দেখেছি, এই একইভাবে যে শুধু ও আমার বিপদেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাই নয়, যে কোন মানুষ, যে কোনরকম বিপদে পড়েছে শোনামাত্রই ও ঝাঁপিয়ে পড়তো সাহায্যের জন্যে। সেই ব্যক্তির দোল, মত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্ম, নৃতাত্বিক পরিচয়, কোনটাই ওর কাছে বিবেচ্য ছিল না। ওর এই উদারতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই ওকে বিপদে ফেলার চেষ্টাও করেছে। এই উদারতার মূল্য ওকে দিয়ে যেতে হয়েছে আমৃত্যু মিথ্যে কলংক আর অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে। আমি খুব বেশি বকাবকি, রাগারাগি করলে বলেছে, “হয়তো অনেক মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে বিপদে ফেলতে চাইতেই পারে, শত্রুর তো অভাব নেই, কিন্তু তাই বলে সেই কথা চিন্তা করে কি বিপদের সময় কাউকে সাহায্য না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবো? পরে যা হবে হোক গিয়ে!”
ওর এই সরলতাই হয়েছিল ওর কাল!
রাজীব ওর সন্তানদের পিতৃস্নেহে পড়াতো।
কেবল পড়াতোই না, ওদের থাকার জায়গা না থাকলে, তার ব্যবস্থা করতো, অসুখের সময় সেবা করতো, রান্না করে খাওয়াতো!
ওর মৃত্যুর পর টেলিফোনে সেই সন্তানতুল্য ছাত্রদের আর্তনাদ আমাকে এখনো নিদ্রাহীন রাখে।
সুমনার সাথে পরিচয়ের আগে অবধি ওর জীবনযাপনে খানিকটা বোহেমিয়ান চিন্তাভাবনা ছিল আর এই নিয়ে এই সমাজের আর দশজন তথাকথিত “বুদ্ধিজীবী”র মত ওর কোন হিপোক্রেসি ছিল না। ও যা ভাবতো, যা বিশ্বাস করতো, মুখ ফুটে তাই বলতো, করতোও তাই। কোনদিন আর দশজন পুরুষের মত এই নিয়ে ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় করা কিংবা এই নিয়ে দুমুখো আচরণ করাও ওর স্বভাবে ছিলোনা আর তাই মানুষ ওকে ভুল বুঝতো।
আমাদের মত হিপোক্রেটদের সমাজে রাজীব মীরের মত মুক্তমনা সোজাসাপ্টা স্পষ্টবাদী মানুষদেরকে ভুল বোঝা খুব সহজ, এদেরকে স্কেপগোট বানিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করা আরও সহজ।
আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের হিপোক্রেটিক চিন্তাভাবনাকে রাজীব থোড়াই কেয়ার করতো।
যেই আদিবাসী জুম জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্যে ও দিনের পর দিন আন্দোলনে থেকেছে, ওদের সাথে পথে পথে ঘুরে বেরিয়েছে, সেই মুক্ত সমাজের স্পষ্টবাদিতা আর মানুষে মানুষে সময়ের ভাবনার প্রতি রাজীবের ছিল অশেষ সম্মান। সেও রাজীব নিজের প্রয়োজনে একজন নারীকে অসম্মান করেছে, একথা আর যেই হোক, আমি কোনদিন মানতে পারি না।
কিন্তু ওই যে বললাম, আমরা অনিচ্ছুক নারীকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে ইনবকসে নোংরা ইঙ্গিত পাঠাতে ভালোবাসি, ভীড়ের বাসে সবার অলক্ষ্যে হিজাব পরা নারীকেও ছেড়ে দিতে জানিনা, নিষ্পাপ শিশুদেরকে বন্ধ দরজার আড়ালে যৌন লালসার তৃপ্তির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বাইরে আমাদের দাঁড়ি-টুপি-পরা সুশীল চেহারাটিকে দিব্যি বজায় রাখি, রাজীব মীরের মত স্পষ্টবাদী সৌন্দর্য্যের পূজারী, নারীপ্রেমী, স্যেকুলার, মানবতাবাদী একজন কবিকে আমাদের সহ্য হবে কেন!
কিন্তু আমি অন্তত কোনদিন ওর চোখে আমার জন্যে কিংবা আমার সামনে অন্য কোন নারীর জন্যে সৌন্দর্য্যের প্রতি প্রশংসা ছাড়া আর অন্য কোন নোংরা দৃষ্টি দেখিনি। যে দৃষ্টি আমি একই সময়ে সমসাময়িক অনেক তথাকথিত “ভদ্রলোকে”র চোখেই দেখেছি।
ওর সাথে বন্ধুত্বের সুবাদে ইনবক্সে নোংরা মেসেজ এমনকি ওর চরিত্র সম্বন্ধে কুৎসা বর্ণনা করে টেলিফোন কল অবধি পেয়েছি সেই প্রবাসে বসেই, কিন্তু সেই প্রমান চেয়েছি, তৎক্ষণাৎ সেই অতি-উৎসাহী সংবাদদাতারা ভোজবাজির মত মিলিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসীরা আজ নানাদিক থেকে যেসব সংকটের মুখোমুখি তাতে এইসময় রাজীবের মত একজন মানুষের অভাব বারবার অনুভব করি।
যখন বনবিভাগ একজন বাসন্তী রেমার কলাবাগান ধ্বংস করে দেয়, কিংবা যখন একজন লাকিংমেকে অকালে বিনা বিচারে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়, আমি টের পাই, সেই প্রতিবাদী মানুষগুলোর ভীড়ে আমার বন্ধু রাজীবের আত্মা ছটফট করে আর্তনাদ করে বেড়াচ্ছে। যখন ম্রো জনগোষ্ঠীদের আদি বাসভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে পাঁচতারা হোটেল নির্মাণের পায়তারা চলে, তখন সেই চিম্বুক পাহাড়ের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে রাজীবের আত্মা হাহাকার করে।
যে দেশ, যে মাটিকে ও এত ভালোবাসতো, আমাদের হাজার অনুরোধ, উপরোধ স্বত্ত্বেও ও যে দেশ ছেড়ে কোনদিন বাইরে যেতে চায়নি, সেই দেশ, সেই দেশের মানুষের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এতখানি অপমান বুকে নিয়ে চলে যেতে হলো ওকে!
আমাকে সবাই বলে আমি নাকি ক্ষমা করতে পারি না, আমি নাকি ক্ষমা করতে শিখিনি!
কাকে ক্ষমা করবো আমি! এই অকৃতজ্ঞ সমাজকে! কোনদিন না!
ওর মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি নানা কারণে দেশে ফেরা হয়নি।
জানিনা আর কোনদিন ফেরা হবে কি না.
তবে এইটুকু জানি যে আরও অনেক কিছুর সাথে সাথে এই একটি মানুষকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আঘাতে আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবার জন্যেও ওই মাটিতে আমার অভিশাপ মিশে থাকবে।
চলে যাবার দিন স্যারকে, মাকে অনুরোধ করেছিলাম, জানাজার আগে পরে সম্ভব হলে ওর মুখটা আমাকে কেউ একটু দেখাক।
কেউ দেখায়নি, “স্যার বলেছিলেন, উনি নিজেও দেখবেন না, আমাকেও দেখতে না করেছিলেন।
এখন মনে হয়, ভালো করেছেন হয়তো।
ওই শেষ মুহূর্তটাকে দেখিনি বলেই আমার আঁকছে এখনো রাজীব বেঁচেই আছে.
যেন যেকোনদিন ভোর ছয়টায় আমার ধানমন্ডি ৬ এর বাসার ফোনে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুলে বলবে, “ষ্টার এ বসে আছি, চলে এসো, নাস্তা করি, অনেকদিন আড্ডা দেয়া হয় না!’
যেখানেই থাকো রাজীব, ভালো থাকো, শান্তিতে থাকো। বেঁচে থাকতে যে শান্তিটুকু তোমাকে আমরা কেউই দিতে পারিনি।

…………………………
৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ
সুমু হক, কানাডা প্রবাসী।
উন্নয়নকর্মী, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *