বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও কিছু কথা – শক্তিপদ ত্রিপুরা

সূচনা: বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’ গঠন সারা বাংলাদেশের আদিবাসীদের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ২০০১ সালের ১৩ জুলাই তারিখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ঢাকায় গঠিত হয়। শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাকে সভাপতি, শ্রী সঞ্জীব দ্রংকে সাধারণ সম্পাদক ও শ্রী শক্তিপদ ত্রিপুরাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৭৫ সদস্যবিশিষ্ট এক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়, যার কার্যকরী সদস্য সংখ্যা ছিল- ২১। ২০০১ সালে গঠনের পর থেকে আদিবাসী ফোরাম প্রতিবছর আদিবাসী দিবস উদযাপন করে আসছে। আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটি প্রতিবছর সাংবাদিক সন্মেলন, র‍্যালী, সমাবেশ, সেমিনার, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। আদিবাসী ফোরামের শাখা ও সহযোগী সংগঠনসমূহ স্ব স্ব অঞ্চলে আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে র‍্যালী, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে আসছে।

আদিবাসী ফোরাম গঠনের প্রেক্ষাপট: বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও আদিবাসীদের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ‘জাতিসংঘ ও আদিবাসী জাতি- এক নতুন অংশীদারিত্ব’ শিরোনামে ১৯৯৩ সালকে জাতিসংঘ কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘের এই ঘোষণা সারা পৃথিবীর আদিবাসী মানুষকে আলোড়িত করে। বাংলাদেশের আদিবাসীরাও ১৯৯৩ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে এই আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ উদযাপনের উদ্যোক্তা ছিলেন- চাকমা সার্কেলের চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, আদিবাসী তরুণ নেতা সঞ্জীব দ্রং, আওয়ামী লীগ নেতৃদ্বয় দীপংকর তালুকদার ও প্রমোদ মানকিনসহ আরো অনেকেই। ১৯৯৩ সালে রাজধানী ঢাকায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ উদযাপন করা হয়েছিল এবং মুক্তিযোদ্ধা রণবিক্রম ত্রিপুরা ও শক্তিপদ ত্রিপুরার নেতৃত্বে খাগড়াছড়ি জেলা থেকে শিল্পীদলসহ একটি টীম উক্ত প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা স্বত:স্ফুর্তভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে (১৯৯৪ সালে) জাতিসংঘ ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। উল্লেখ্য যে, এক সময় আওয়ামী লীগ দলের মধ্যে আদিবাসী শব্দ নিয়ে কোন বিতর্ক বা আপত্তি ছিল না। যার কারণে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালে শেখ হাসিনা আদিবাসী দিবসে বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাণী দিয়েছিলেন। সেকারণে আওয়ামী লীগের গঠনত›ত্র, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও শেখ হাসিনা সরকার তথা আওয়ামী লীগ সরকারের সরকারী নানা নীতিমালা ও পরিপত্রে আদিবাসী শব্দের উল্লেখ (স্বীকৃতি) ছিল। কোন এক বিশেষ কারণে পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকার আদিবাসী শব্দ ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। আদিবাসী শব্দ ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও আওয়ামী লীগের বহু সংসদ সদস্য, বহু নেতা এখনো আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে থাকেন, স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।

১৯৯৩ সালে রাজা দেবাশীষ রায়কে আহবায়ক ও সঞ্জীব দ্রংকে সদস্য সচিব করে এক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সে কমিটি কোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে জাতীয় এনজিও শেড (SHED) এর উদ্যোগে ঢাকায় আদিবাসীদের এক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারে আমারও উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই সেমিনারে আদিবাসীদের একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বরোপ করা হয়। উক্ত সেমিনারে সরকারের নিকট আদিবাসীদের দাবী দাওয়া তুলে ধরা এবং আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য আদিবাসীদের একটি শক্তিশালী জাতীয় সংগঠন গড়ে তোলা দরকার বলে বক্তাগণ উল্লেখ করেন।

১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য এক নতুন দ্বার খুলে দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রিয় নেতা, পরবর্তীতে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের প্রিয় নেতা শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) পার্বত্য চুক্তির পর সমতলের আদিবাসীদের দিকে নজর দেয়। চুক্তির পর সমতলের আদিবাসীদের বহু নেতা শ্রী লারমার সাথে সাক্ষাৎ করে সমতলের আদিবাসীদের ওপর দৃষ্টি প্রদানের জন্য অনুরোধ জানান। শ্রী লারমা পার্টির (জনসংহতি সমিতি) সম্মতি নিয়ে সারা বাংলাদেশের আদিবাসীদের জন্য একটি জাতীয় সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশের আদিবাসীদের একটি জাতীয় সংগঠন গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অত:পর ২০০১ সালের ১৩ জুলাই তারিখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম সংবাদ সন্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসীদের দাবী দাওয়া সরকারের নিকট তুলে ধরে।
বাংলাদেশ সরকারের নিকট পেশকৃত বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দাবীসমূহ হলো-

বাংলাদেশের ৫০- এর অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃতি প্রদান করা;
আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা;

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা এবং সমতলের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও পৃথক ভূমি কমিশনর গঠন করা;
উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের চিরায়ত ভূমি বেদখল না করা এবং আদিবাসীদের যেসকল ভূমি বেদখল করা হয়েছে তা আদিবাসীদের নিকট ফেরত প্রদান করা;
শিক্ষা ও চাকরি কোটা বৃদ্ধি করা;
আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং জাতীয় বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা;
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে গৃহীত আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র অনুসমর্থন ও বাস্তবায়ন করা এবং আইএলও কনভেনশন ১০৭ বাস্তবায়ন ও ১৬৯ নং কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করা ইত্যাদি;

আদিবাসী ফোরামের মূলনীতি
এই সংগঠনের মূলনীতি হলো- ঐক্য, সংহতি ও প্রগতি। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা ও জোরদার করা এবং প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়াই হবে সংগঠনের মূল আদর্শ।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
বাংলাদেশের বসবাসরত আদিবাসী জাতিসমূহের রাজিৈতক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা ।
বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা ।
আদিবাসী জাতিসমূহের ভাষা, সংস্কৃতি, আইন, প্রথা, রীতিনীতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সংরক্ষণ ও বিকশিত করা।
স্থানীয় সরকার পরিষদ, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও জাতীয় সংসদসহ প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে মহিলা প্রতিনিধিসহ আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
আদিবাসী জাতিসমূহের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদার করা।
প্রথাগত আইন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর আদিবাসীদের প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত অধিকার নিশ্চিত করা।
বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণী ও জাতিগত বৈষম্যসহ আদিবাসীদের উপর সকল প্রকার নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার অবসান করা।
আদিবাসী নারী সমাজের উপর সকল প্রকার নিপীড়ন, বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসান ঘটানো এবং সমাজে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।
আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে আদিবাসী জনগণের সংস্কৃতি ও পরিবেশের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করা ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যায় দেশের অপরাপর অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী জনগণের জন্য একটি আদিবাসী মন্ত্রণালয় গঠনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা।
বাংলাদেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দল এবং সংগঠনসমূহের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা ও ইস্যু ভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশগ্রহন করা।
আদিবাসীদের অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনসমূহের সাথে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার করা।

আদিবাসী ফোরামের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমস্যা
নেতৃত্বের মধ্যে একটি শক্তিশালী টিম গড়ে উঠেনি;
সমতলে সংগ্রামমূখী নেতৃত্বের সংকট;
আদিবাসী অধ্যুষিত প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আদিবাসী ফোরামের শাখা সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়ে উঠেনি;
আদিবাসী ফোরামের অধীনে একটি শক্তিশালী ছাত্র ও যুব সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়ে উঠেনি;

সম্ভাবনা
আদিবাসী যুব সমাজের মধ্য থেকে একটি অংশ আদিবাসী ফোরামের একটি শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ব্যাপারে গুরুত্বসহকারে ভাবছে;
আদিবাসী জাতিসমূহে বহু শিক্ষিত ও সচেতন ছাত্র ও যুবক রয়েছে যাদের দিয়ে একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন ও যুব সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব এবং ইতোমধ্যে আদিবাসী ফোরামের সহযোগী সংগঠন হিসেবে ‘আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ও ‘আদিবাসী যুব ফোরাম’ গড়ে উঠেছে;
বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার আদিবাসীরা আদিবাসী ফোরামের শাখা সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহী;
আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত তাদের চিরায়ত ভূমি বেদখলসহ নানা নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে;
আদিবাসী সমাজে শিক্ষার হার যেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি সচেতন ব্যক্তির সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে;

আদিবাসী ফোরামের অর্জন

পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে উঠেছে;
আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে এবং আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে;
সরকারের কতিপয় মন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের সদস্যদেরকে আদিবাসী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়েছে;
বাঙালী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল তাঁদেরকে আদিবাসী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়েছে;
ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় আদিবাসীদের পক্ষে প্রচারনা বৃদ্ধি পেয়েছে;
আদিবাসী বিষয়, আদিবাসী অধিকার নিয়ে বাঙালী ও আদিবাসী লেখকদের মধ্যে লেখালেখি বৃদ্ধি পেয়েছে;
আদিবাসীদের সমস্যা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে;
বহু জাতীয় সংস্থা ও এনজিও আদিবাসী অধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ে কাজ করছে;
মৌলভীবাজার জেলার মুরইছড়া ইকোপার্ক ও মাধবকুন্ড ইকোপার্ক বাতিলসহ আদিবাসীদের বহু ভূমি রক্ষা আন্দোলন সফল হয়েছে;
আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচী বাস্তবায়িত হয়েছে;

আদিবাসী ফোরামের সীমাবদ্ধতা

আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বদা সংগ্রামকে প্রাধান্য না দেয়া;
আদিবাসীদের ওপর কোন অত্যাচার বা নির্যাতন হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও ভূমিকা পালন করতে না পারা;
আদিবাসী অধ্যুষিত সকল জেলা ও উপজেলায় ফোরামের শাখা সংগঠন না থাকা;
কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটি শক্তিশালী সংগ্রামী নেতৃত্বের অভাব;
জনগণের সহযোগিতা নিয়ে তহবিল গঠনে কর্ম-দক্ষতার অভাব;
একটি শক্তিশালী সহযোগী ছাত্র ও যুব সংগঠনের অভাব;

কতিপয় সুপারিশমালা
কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটি সংগ্রামী নেতৃত্ব গড়ে তোলা;
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শাখা সংগঠন গড়ে তোলা;
জনগণের সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী তহবিল গড়ে তোলা;
একটি শক্তিশালী ছাত্র ও যুব সংগঠন গড়ে তোলা;

শেষ কথা: আমরা সবাই জানি এবং দু:খজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা লাভের অর্ধশত বছর পার হতে চলেছে বাংলাদেশে এখনো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ভালভাবে বিকশিত লাভ করতে পারেনি। যার কারণে রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছে তারা গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল হয়ে উঠতে পারেনি। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করে তারা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল না হলে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাম্প্রদায়িক আচরনের শিকার হন। এ ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নানা বঞ্চনা ও নিষ্পেষনের শিকার হন সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর নিকট থেকে। প্রশাসনে যারা রয়েছে তারা যেহেতু গণতান্ত্রিক নন, বরং সাম্প্রদায়িক তৎ কারণে প্রশাসন তথা রাষ্ট্রযন্ত্র সর্বদা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে এবং রাষ্ট্র কর্তৃক যাবতীয় পৃষ্টপোষকতা তারা পেয়ে থাকে। এমতাবস্থায় দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের তরফ থেকে নিরপেক্ষ ভূমিকা কিংবা ন্যায়বিচার পাওয়ার কোন বাস্তবতা নেই। যার কারণে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা কিংবা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আদিবাসীদের সংগ্রাম ব্যতিত বিকল্প কোন পথ নেই। সারা পৃথিবীতেও সাধারণভাবে লক্ষ্য করা গেছে- সংগ্রাম ব্যতিত পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র দেশের কোন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে কোন অধিকার প্রদান করতে উদারতা দেখাতে পারেনি। আমাদের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাচ্ছি- বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংবিধানে কিংবা বাস্তবে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, কর্মের অধিকার কিংবা স্বশাসনের অধিকার প্রদানে আত্মিক দৈন্যতা লক্ষ্য করা যায়। যার কারণে বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিসমূহ আজ বিলুপ্তির পথে।

বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিসমূহ যদি তাদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বমর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে চায় তাহলে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, তাদের শিক্ষা ও ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতএব বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামকে সে পথেই এগোতে হবে। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে সংগ্রামের বিকল্প কোন উন্নত পন্থা-পদ্ধতি এখনো আবিস্কৃত হয়নি। সুতরাং অধিকারহারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামই শেষ কথা- একথা সর্বদা যেন আমরা মনে রাখি। ইস্পাত কঠিন সংগ্রাম গড়ে তোলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বশাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আদিবাসী ফোরামকে একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে একটি সংগ্রামী নেতৃত্ব। ইস্পাত কঠিন সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য একটি শক্তিশালী সংগঠন ও তার একটি প্রগতিশীল সংগ্রামী নেতৃত্ব অতীব জরুরী।
————————————–
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ২০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশেষ নিবন্ধ।

শক্তিপদ ত্রিপুরা; সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *