পায়রা বন্দরের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ রাখাইনদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় পায়রা বন্দর এর জন্য নির্ধারিত ভূমি অধিগ্রহণ করা হলে উচ্ছেদ হবে বেশ কয়েকটি রাখাইন পরিবার। রাখাইনদের শতবর্ষী গ্রাম থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা অপ্রত্যাশিত এবং দু:খজনক। অধিগ্রহণ করার জন্য নির্ধারিত ভূমির বিপরীতে অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্থ রাখাইন পরিবারগুলোর যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ। আজ ৮ই জুলাই, ২০২১ ইং এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই দাবি জানানো হয়েছে।

নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং এর সঞ্চালনায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ছয়আনিপাড়ার ৬ টি রাখাইন পরিবারকে কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পায়রা তৃতীয় সমুদ্রবন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণের আওতায় প্রায় তিনশ বছরের প্রাচীন আদিবাসী রাখাইনপল্লী নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন সেখানকার স্থানীয় রাখাইন সমাজের প্রতিনিধি চিংহ্লামং রাখাইন এবং মেইনথিন প্রমীলা। তাঁরা বলেন, নানান প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পটুয়াখালীর রাখাইনরা কোনমতে টিকে আছে। এখন সেখান থেকেও যদি তাদের উচ্ছেদ হতে হয় তবে তারা কোথায় যাবেন? প্রশাসন নানান আশ্বাস দিচ্ছে, কিন্তু সেগুলো বাস্তবে কার্যকর হবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। রাখাইনদের পাশে দাড়ানোর জন্য তারা সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-র সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন- ইতোপুর্বে বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রতিবেদন এ উঠে এসেছে যে, পুরো পায়রা বন্দর প্রকল্পটিই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এ প্রকল্পটির কারণে স্থানীয় প্রাণ-প্রতিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়বে। তাও সেখানে কার স্বার্থে আজ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে তা তলিয়ে দেখা দরকার। উন্নয়নের নামে স্থানীয়দের উচ্ছেদ করার আয়োজন কোনভাবেই কাম্য নয়।

ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন কণা বলেন, রাখাইনদের মতামতকে উপেক্ষো করে সেখানে যে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে সেটা আদতে রাখাইনদের চিরায়ত ভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করারই নামান্তর। তাই সেখানে ভয়ের সংস্কৃতি, নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রশ্ন রাখেন- প্রকৃতপক্ষে কার স্বার্থে আজ পটুয়াখালীতে উন্নয়নের নামে রাখাইনদের ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে? সেটা কী আদতেই জাতীয় স্বার্থে নাকি কোন বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে বলে তিনি প্রশ্ন রাখেন।

দেশবরেণ্য মানবাধিকারকর্মী এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, উন্নয়নের নামে গৃহীত এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। আমরা যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের কথা বলি সেগুলো কী কেবলই মুখের কথা? প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক জীবন যাপনের অধিকার আছে। আজ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক শক্তির শাসনামলে কোন নাগরিকের অধিকার ক্ষুন্ন হবে, নিজ বসটভিটা ও চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ হতে হবে সেটা কোনভাবেই কাম্য নয়।

আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও যুক্ত ছিলেন। তারা আয়োজকদের নানান প্রশ্নও করেন। এসময় আরো মতামত রাখেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, ফটোসাংবাদিক আরিফুর রহমান, মুশতাক হোসেন প্রমুখ।

শেষে বর্ষীয়ান রাজনীতিক পংকজ ভট্টাচার্যের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন সমাপ্ত করা হয়। পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ৩০০ বছরের পুরনো একটি গ্রাম থেকে রাখাইনদের উচ্ছেদ হতে হবে। সেটা মেনে নেওয়া যায় না। ক্ষতিগ্রস্থ রাখাইন পবিারগুলোকে যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য রাখাইন গ্রামগুলোর সাথে সংযুক্ত করেই তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পুকুর ও শ্মশানের পুনব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় কোন উচ্ছেদ চলবে না।

সংবাদ সম্মেলন থেকে বেশ কিছু দাবি জানানো হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-

১. অবিলম্বে কলাপাড়া উপজেলার ছয়আনি রাখাইনপাড়ার ৬টি আদিবাসী পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও তাদের সংস্কৃতি জীবনধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এমন জায়গায় পুণর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. মৃতদেহের সৎকারের জন্য জায়গা ও বৌদ্ধ বিহার বরাদ্দ দিতে হবে;
অগ্রাধকিারভিত্তিতে পায়রা বন্দরে তাদের চাকুরীতে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে;
৩. আদিবাসী রাখাইনদের ভূমি অধিকার সুরক্ষায় স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যু, দালালদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. রাখাইন জনগোষ্ঠীসহ সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা ও ভূমি বিরোধ নিস্পত্তির জন্য একটি পৃথক আদিবাসী ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করতে হবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *