মামলার রায় দিতে শ্রম আদালত নিচ্ছে প্রয়োজনীয় সময়ের দশগুন বেশি: ব্লাস্ট

একটি মামলার রায় দেওয়ার জন্যে আইনানুযায়ী শ্রম আদালতের যে সময় নেওয়ার কথা, তার চেয়েও ১০ গুণ বেশি সময় নিয়ে রায় দেন এই আদালত। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। কর্মক্ষেত্রে আঘাত ও মৃত্যুর শিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে দায়ের করা ৮০টি ক্ষতিপূরণ মামলা বিশ্লেষণ করেছে ব্লাস্ট। এই মামলাগুলোর রায় দিয়েছেন শ্রম আদালত। এই মামলাগুলো বিশ্লেষণের পর ব্লাস্ট এই তথ্য পেল।

ব্লাস্টের গবেষণা কনসালট্যান্ট তাকবির হুদা প্রণীত এই গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের শ্রম আইনটি দাবিদারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়োগদাতার সদিচ্ছার (সামর্থ্যের পরিবর্তে) ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ দিতে বারবার অস্বীকৃতি জানানো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এবং এক্ষেত্রে আইন অমান্য করা হলেও তাতে খুব সামান্য বা একেবারেই কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না তাদেরকে।’

রায় দেওয়ার জন্যে এত দীর্ঘ সময় লাগার পেছনে প্রতিবেদনে যে মূল কারণগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো হচ্ছে- প্রয়োজনের তুলনায় কম সংখ্যক বিচারক, পুরনো মামলার চাপ, লিপিবদ্ধ তথ্য-প্রমাণ পেতে সমস্যা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমিক ও আদালতের মধ্যের বড় ভৌগলিক দূরত্ব।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দাবিদারের উপজেলা থেকে শ্রম আদালতের (যেখানে ক্ষতিপূরণের দাবিটি পেশ করতে হবে) গড় দূরত্ব ২০১ কিলোমিটার।’ ‘৮০টি মামলার মধ্যে ৫০টিতে আদালত ও দাবিদারের বাড়ি ভিন্ন জেলায় অবস্থিত ছিল। বিচারের জন্যে দাবিদারকে শত কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, যা খুবই ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ।’

প্রতিবেদনটি আরও জানায়, সময় ও দূরত্বের কারণে শ্রমিক ও তাদের পরিবাররা অনেক সময় আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করে নেয়।

গত ৩০ জুন উক্ত প্রতিবেদনের ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, ‘প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যগুলো আমাদেরকে দেখাচ্ছে অন্যায়ের শিকার মানুষেরা, যারা কর্মক্ষেত্রে আঘাত ও মৃত্যুর শিকার হয়েছেন, তারা শ্রম আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে ভিন্ন এক ধরনের অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন। ফলে আদালতে মামলা চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্যে অসম্ভব ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হচ্ছে।’

এ কারণে কর্মক্ষেত্রে আঘাত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি বীমা স্কিম চালু করা এখন সময়ের দাবি বলেও মনে করেন তিনি। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবাররা দ্রুত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন তার জন্য এই বীমা স্কিম চালুর দাবিও করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরো সংযুক্ত ছিলেন ব্লাস্টের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর একেএম নাসিম, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান প্রমুখ।

ব্লাস্টের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘শ্রম আইন কর্মীদের অধিকার রক্ষা করার জন্যে প্রণীত হয়েছিল। তবে, এত বছর পরেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, ক্ষতিপূরণ আদায় করা সহজ নয়। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ অবজ্ঞা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে মামলাগুলো স্থগিত থাকা ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দেরির কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না এবং হতাশ হয়ে পড়েন। বর্তমানে প্রচলিত আইনটিকে সংশোধন করে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণের নিয়মটি উঠিয়ে দিতে হবে এবং আদালত ও বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে।’

সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর একেএম নাসিম বলেন, ‘প্রতিবেদন থেকে বেরিয়ে আসা তথ্যগুলো মর্মান্তিক হলেও এটি কিছু বিষয়কে নিশ্চিত করেছে, যেগুলো বহু বছর ধরেই আমাদের জানা। বস্তুত ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ অবকাঠামোটি শ্রমিকদের উপকারে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। শ্রম আইন দ্রুত সংশোধন করা উচিত।’

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, যারা শ্রমিকদের কায়িক শ্রম থেকে আসা লভ্যাংশ পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন, নিয়োগদার পাশাপাশি তাদেরকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্বের অংশ করে নেওয়া উচিত বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *