সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন জরুরি: অনলাইন আলোচনায় বিশিষ্টজনরা

সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন জরুরি বলে মন্তব্য করছেন বিশিষ্টজনরা। এই কমিশন গঠনের দাবিতে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও সহযোগী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে গতকাল বুধবার (৩০ জুন) একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহবায়ক জনাব ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থাা আরডিসি’র চেয়ারপার্সন অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হোসেন । ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।

স্বাগত বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন- সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় আদিবাসীদের তার নিজ ভুমি থেকে বিতাড়িত করা করা হচ্ছে । ভুমি দস্যুরা বিভিন্নভাবে প্রশ্রয় পাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সকলের আরো সোচ্চার হওয়া উচিত। অবিলম্বে সরকারকে তার নির্বাচনী ইশতেহারের উল্লেখিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।


বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং তার মূল প্রবন্ধে বলেন,
বর্তমান সরকার সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ২০০৮ সালে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মানমর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে।’ গত ১২ বছরে সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের কোনো কাজই শুরু হয়নি। তাই আর বিলম্ব না করে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক পৃথক কমিশন গঠন করতে হবে বলেও মনে করেন এই আদিবাসী নেতা।

অবিলম্বে সকল অসম্প্রদায়িক শক্তি এক সাথে আন্দোলন করে এই দাবী আদায় করতে হবে বলে মনে করেন ওয়েবিনারের প্রধান অতিথি সাংসদ ও আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন- আদিবাসী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভুমি কমিশনের দাবী করে আসছে ।সরকার নির্বাচন পূর্ব ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেনি। শুধু জমির একটি কাগজ না থাকার কারনে একজন আদিবাসীকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। অথচ এই কাগজটি দেওযার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করেনি বলেও দাবী করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সোহরাব হাসান বলেন, ভূমি কমিশনের আগে আমাদের ভাবতে হবে রাষ্ট্র এই ক্ষমতা আদিবাসীদের দিতে চায় কিনা? কারন আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে দেখেছি ভুমি কমিশন এখনো কার্যকর হয়নি। আজ পর্যন্ত কোন কেস তারা সমাধান করেছেন কিনা আমাদের জানা নেই । কিছু দিন আগেও টাঙ্গাইলে এক আদিবাসী নারীর কলা বাগান ধবংস করে ফেলা হয়েছে। তাই আদিবাসীদের দাবির প্রতি সংবেদনশীল সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজ, মিডিয়াকে সাথে নিয়ে সকল আদিবাসীদের একাতাবদ্ধ হয়ে সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনের দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, পাহাড় ও সমতলের ভুমির সমস্যার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই সমাধানও সেভাবে করতে হবে। আমরা দেখেছি সিলেটের চা বাগানের টিলাগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। আদিবাসীরা তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে অমানবিক জীবন যাপন করছে। আদিবাসী মানুষের জমিন-জল-জঙ্গলের অধিকার নিশ্চিতকরণে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও ঐতিহ্যগত শাসন কাঠামোর সর্বোচ্চ সমন্বিত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও মনে করেন এই আদিবাসী গবেষক ।

ওয়েবিনারে আরো বক্তব্য রাখেন আদিবাসী নেতা অজয় মৃ, হরেন্দ্র নাথ সিং, সারা মারান্ডি, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক রীনা রায়, এএলআরডির রফিক আহমেদ সিরাজী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য সোহেল হাজং এবং খাসি আদিবাসী নেত্রী ফ্লোরা বাবলি তালাং প্রমুখ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *