দলিতদের অধিকার সুরক্ষায় অধিকতার অন্তর্ভূক্তি ও নীতিমালা প্রয়োজন

দলিতদের অধিকার সুরক্ষায় তাদেরকে সামাজিক মর্যাদা প্রদান এবং মূলধারায় অর্ন্তভূক্তি করার জন্য রাষ্ট্রীয় বিশেষ নীতিমালা থাকা আবশ্যক। দলিত অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (আইসিডিআর), নাগরিক উদ্যোগ এবং মানবাধিকার বিষয়ক বাংলাদেশ ও আমেরিকান বার এসোসিয়েশন কেন্দ্র-র উদ্যোগে দলিতদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক এক অনলাইন আলোচনায় বক্তারা এমন মতামত প্রকাশ করেন।

নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আমেরিকান বার এসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ড: ওয়ারিস হুসেইন। তিনি বলেন, সমাজের দলিত শ্রেণীর আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তাই দলিতদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় পর্যায়ে এবং আর্ন্তজাতিকভাবে ক্যাম্পেইন থাকা প্রয়োজন।

অনলাইন আলোচনা সভায় দলিতদের আইনগত সুরক্ষা ও অন্যান্য অধিকারের সার্বিক অবস্থার উপর একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন গবেষক ড: সিনথিয়া ফরিদ। challenges to effective legal remedies for Dalit and Minorities’ Defenders in Bangladesh শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি দেখান যে, সকলক্ষেত্রেই দলিতরা সমাজের অন্যান্য নাগরিকের তুলনায় নানবিধ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্র্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর নির্বাহী প্রধান ব্যারিষ্টার সারা হোসেন বলেন, দলিতদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সমাজের সকল স্তরের নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। দলিতদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

ড: ফস্টিনা পেরেইরা তাঁর আলোচনায় বলেন, দলিতরা সংখ্যালঘুদের মধ্যেও যেন সংখ্যালঘু। তাদের জন্য সুযোগের অসমতা ও বৈষম্য অনেক বেশী। ঐতিহাসিকভাবেই তারা নানানভাবে সামাজিক বঞ্চনার শিকার।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপ-পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন- মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে, বিচারপ্রাপ্তির প্রশ্নে, শিক্ষার অধিকার, কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক মর্যাদা প্রভৃতি ক্ষেত্রেই দলিতরা বৈষম্যের শিকার।
বাংলাদেশের সংবিধান সাংবিধানিকভাবে আইনগত সমতা-র নিশ্চয়তা প্রদান করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তাই বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের বিশেষ নীতিমালা থাকা আবশ্যক। এবিষয়ে মানবাধিকার কমিশন কাজ করছে।

সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন- সমাজে সাধারণভাবে দুর্বলের উপর সবলের শোষণের সংস্কৃতি দেখা যায়। কিন্তু দলিতদের ক্ষেত্রে এ চিত্র আরো ব্যাপক। যদিও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশের তুলনায় আমাদের দেশের দলিতদের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো।

দলিত মানবাধিকার কর্মী বিভুতোষ রায় বলেন- সামগ্রিকভাবে দলিতদের এখনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই। অনেকেই দলিতদের সাথে বর্ণবাদী আচরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রেই দলিতদের অস্পৃশ্য করে রাখা হয়, তাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়।

আইসিডিআর এর সভাপতি ডিবি সাগর বলেন- জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয়ক্ষেত্রেই পাবলিক-প্রাইভেট সব পর্যায়ে ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। এক্ষেত্রে আইসিডিআর যথাযথ প্রচেষ্টা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি। তিনি বলেন, দলিতদের মানবাধিকার পরিস্থিতি কোনভাবেই সন্তোষজনক বলা যায় না। বাজেট প্রণয়ণসহ রাষ্ট্রীয় নীতিমালা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও দলিতদের জন্য বিশেষ নীতিমালা, সামাজিক সুরক্ষাবলয় প্রভৃতি থাকা দরকার। দেশের প্রান্তিক ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষায় একটি সংখ্যালঘু বিষয়ক কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুর হুদা বলেন- চলমান করোনা পরিস্থিতিতে দলিতদের সার্বিক অবস্থা নিশ্চয়ই অন্যান্যদের তুলনায় অধিকতর খারাপ। দলিতদের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় আগামীতে এএলআরডি উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আলোচনায় আরো অংশগ্রহণ করেন- মাইনরিটি রাইটস ফোরাম এর এডভোকেট উৎফল বিশ্বাস, দলিত ও চা জনগোষ্ঠীর অধিকারকর্মী তামান্না সিং বড়াইক, নারায়ণ চর্মকার প্রমূখ।

সর্বশেষ আলোচনায় অংশ নেন সাবেক বিচারপতি ও ব্লাস্টের উপদেষ্টা মো: নিজামুল হক। ১৯৯৮ সালে স্বয়ং প্রত্যক্ষ করা দলিতদের প্রতি সমাজের অন্যান্য নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির এক উদাহরণ স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রান্তিক ও দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বত্র সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন- সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে, সংসদে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে কয়জন দলিত নাগরিকের অংশগ্রহণ আছে? দলিত ও সমাজের অধিকারবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সচেতন ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *