মজুরী বোর্ড কর্তৃক চা শ্রমিকদের মজুরী ঘোষণা: আমার কিছু জিজ্ঞাসা- রিপন বানাই

বাংলাদেশে অন্যতম জনপ্রিয় পানিয় হচ্ছে চা। শহর কিংবা গ্রামে চায়ের আড্ডা হয়না এমন জায়গা নেই। এমনকি অতিথি পরায়ন বাঙালি চায়ের দাওয়াত দিতে কখনই কার্পণ্যবোধ করেনা। শোনা যাচ্ছে চা কে জাতীয় পানিয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। পর্যটন স্থান হিসেবে চা বাগান অনেক আগেথেকেই সমাদৃত। চা যখন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ঠিক তখন এই চা যারা উতপাদন করে আমরা কি কখনও তাদের খবর রাখি?

বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে, চট্টগ্রামসহ পঞ্চগড়ে চা উতপাদন হচ্ছে। লক্ষাধিক আদিবাসী ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এই কাজে যুক্ত। বেশির ভাগ শ্রমিক নারী। এই মানুষগুলোর জীবন-জিবিকা কেমন তা হয়তো আমাদের অনেকের অজানা।

গত ১৩ জুন, ২০২১ চা শিল্পের জন্য বহুল প্রতিক্ষিত নিম্নতম মজুরি বোর্ড একটি প্রজ্ঞাপন তাদের সুপারিশসহ প্রকাশ করে। প্রজ্ঞাপনটি চা শ্রমিকদের উপর দীর্ঘ দিনের ঘটে যাওয়া অন্যায় ও তাদের মানবেতর জীবন-যাপনের অবসান ঘটাবে একিসাথে মালিক ও রাষ্ট্রের দের’শ বছরের অপবাদ ঘোচাবে এমনই প্রত্যাশা ছিল চা শ্রমিক তথা সকল মানুষের। কিন্তু নিম্নতম মজুরি বোডের্র প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে যে সুপারিশ করা হয়েছে তা কেবল আমাদের হতাশই করেনি অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। রাষ্ট্র অনেক দেরিতে হলেও এই অবহেলিত মানুষগুলোর প্রতি তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেও তা কেবল হাতছাড়াই করেনি অনেকটা মালিকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে শোষকের ভূমিকায় অবতির্ণ হয়েছেন। রাষ্ট্র অসহায় নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত না করে উল্টো তাদের অধিকার হরণ করেছে। অবাক হয়েছি তাদের সুপারিশগুলো দেখে! কিভাবে মজুরী বোর্ড এই অবিবেচক ও কান্ডজ্ঞানহীন কাজটি করতে পারলো? বোর্ড যা করেছে এটি কখনই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। এই বিষয়টি সকলের কাছে পরিস্কার যে, চা বাগানের শ্রমিকরা কিভাবে জীবন চালাচ্ছে। এমন একটি সেক্টরে যখন নিম্নতম মজুরী নির্ধারিত হতে যাচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই তাদর আরোও সচেতন ও যত্নশীল হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু চা শ্রমিকদের এই মজুরী নির্ধারনে তারা কেবল অদক্ষতার পরিচয়ই দেননি তারা নিজেদের অযোগ্যতারও প্রমাণ দিয়েছেন।

আমার প্রথম প্রশ্ন হলো মজুরী বোর্ড কি বিদ্যমান শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর ক্ষমতা রাখে? প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে তাই করা হয়েছে। গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত সুপারিশের ৭ নং ধারায় বলা আছে চা শিল্পের বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশ চা সংসদ প্রতি ৩ (তিন) বছর অন্তর অন্তর মজুরি ছাড়াও উৎপাদনশীলতা ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন করবেন। প্রকৃতপক্ষে চা শিল্পের বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত রীতি হলো শ্রমিক ও মালিকপক্ষ প্রতি ২ (দুই) বছর অন্তর অন্তর আলোচনা করে সমোঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে থাকেন। ৩ (তিন) বছর অন্তর অন্তর সিদ্ধান্ত গ্রহনের (চুক্তির) বিষয়টি সঠিক নয়। তাছাড়া মজুরি বোর্ডের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনেও ২ (দুই) বছর অন্তর অন্তর সিদ্ধান্ত (চুক্তি) গ্রহনের কথা বলা আছে।

নিম্নতম মজুরী বোর্ড কার স্বার্থে এবং কেন দুই বছরের স্থলে তিন বছর সুপারিশ করলো?

উদ্বেগের অন্যতম কারন হলো বোর্ড কখনই অবস্থিত/চলমান সুবিধাকে কমাতে পারেনা। এটি কোনো প্রকার নীতি কিংবা আইনের সাথে যায় না। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে মজুরী বোর্ডের চেয়ারম্যানকে এবিষয়ে বলার কিছুই থাকতে পারেনা।

আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন মজুরী বোর্ড কোন যুক্তিতে ১১৭ টাকা মজুরী ঘোষণা করলো? সেটাও ২০২১ সালে? মজুরী বোর্ডের প্রস্তাবিত ১১৭ টাকা যা শ্রমিকরা ২০১৯ সালের জানুয়ারী থেকেই পেয়ে আসছে ২০২১ সালে এসে বোর্ড ১১৭ টাকা প্রস্তাব করলো কার স্বার্থে? বিষয়টি কি তাদের অজানা ছিল? যদি তাই হয় তাহলে খেযেদেয়ে তাদের কাজটা কি? জনগণের টাকায় তাদের রেখে লাভটা কোথায়? এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। তাছাড়া এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে বলে আমি মনে করি। প্রশ্ন করি, তাহলে জনগণের টাকায় মজুরী বোর্ড রেখে কি লাভ?
আমার তৃতীয় ও শেষ প্রশ্ন, মজুরী বোর্ডের কাজ কি? নিশ্চই মালিক ও শ্রমিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করা বৈষম্য কমানো, কোনোমতেই মালিকের কিংবা শ্রমিকের দালালি করা নয়। সাধারণের যে ধারণা রাষ্ট্রযন্ত্র সবসময় ধনীক শ্রেণীর পক্ষে এই কথাটি কি তাহলে সত্যি? রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারে না।

এছাড়াও সংশ্লিষ্ট শিল্পের নেতাদের মতে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে শ্রমিকের স্বার্থ বিরোধী অনেক সুপারিশ এসেছে যা তাদের প্রচলিত প্রথা তথা রীতির বিরোধী। অত্যন্ত যৌক্তিক কারনেই নির্ধারিত শিল্পের শ্রমিক প্রতিনিধি জনাব রামভজন কৈরী স্বাক্ষরদানে বিরত থেকেছেন।

দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের ভাষায় মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিনত হচ্ছে সেই সময়ে একজন শ্রমিকের মজুরী ১১৭ টাকা কিভাবে হতে পারে তা আমাদের বোধগম্য নয়। নিত্যপন্যের দাম যখন উর্দ্ধগতি, রাষ্ট্র যখন সকলকে এগিয়ে নিতে চায় তখন সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কিভাবে একজন চা শ্রমিকের মজুরী ১১৭ টাকা সুপারিশ করে? রাষ্ট্র এই স্ববিরোধীতা কখনই করতে পারেনা।

আমরা প্রত্যাশা করি কর্তুপক্ষ এই বিষটি বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। রাষ্ট্র তার সঠিক দায়িত্ব পালন করবেন। মজুরী বোর্ড রাষ্ট্রের বাইরের কোনো বিষয় নয়। আশা করি যে চিন্তাথেকে যাদের ন্যায্য হিস্যা দিতে মজুরীবোর্ড গঠন হয়েছিল আজথেকে ৯০ বছর পূর্বে সেই মজুরী বোর্ড চা শ্রমিকদের হতাশ করবেনা। তাদের বোধদয় হবে।

রিপন বানাই: মানবাধিকার কর্মী।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *