চা জনগোষ্ঠীর দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি করার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন

চা জনগোষ্ঠীর দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, জীবিকা ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃদ্ধি করার জন্য দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।

আজ ২১ শে জুন সোমবার আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাস, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনায় এ আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্প্রতি চা শ্রমিকদের জন্য গঠিত “নিম্নতম মজুরি বোর্ডের” সুপারিশকৃত গেজেট প্রস্তাবনায় চা-শ্রমিকদের প্রাপ্য ন্যায্য বেতন-ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল এবং অমানবিক বলে চা বাগানে কর্মরত চা শ্রমিক, শ্রমিক সংগঠন এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে।

আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাস, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনলাইন আলোচনায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং এর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি প্রমুখ।

আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রেখে “নিম্নতম মজুরি বোর্ড: চা শ্রমিকদের প্রত্যাশা” শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক চা শ্রমিক নেতা রামভজন কৈরি। পঠিত প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি জানান যে, সম্প্রতি চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি বিষয়ে “নিম্নতম মজুরি বোর্ড” একটি সুপারিশমালা সরকারের নিকট প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত এই সুপারিশমালা ইতিমধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গেজেট সুপারিশমালা অনুসারে চা শ্রমিকদের জন্য দৈনিক ১২০ টাকা হারে বেতন নির্ধারণের প্রস্তাবনা করা হয়েছে য অগ্রহণযোগ্য এবং চরম অমানবিক। এই সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হলে চা শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন এবং তাদের সার্বিক জীবনমানের উপর চরম বিরুপ প্রভাব পড়বে। তাই অচিরেই এই সুপারিশমালা সংশোধন করে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। অন্যথায় শ্রমিকদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যুনতম অধিকারও লঙ্ঘিত হবে।

টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতাখারুজ্জামান বলেন, যেখানে চা শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার কথা সেখানে মজুরি বোর্ড কৌশলে চা-শ্রমিকদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলো ক্রমাগত হ্রাস করছে। চা শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ডের প্রস্তাবিত বেতন-ভাতা সর্বনিম্ন, অগ্রহণযোগ্য এবং অমানবিক। চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা আইনগত ক্ষেত্রেও নানবিধ বৈষমের শিকার হয়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত বাৎসরিক ছুটিও নেই। এমনতর বাস্তবতায় শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, কাজের পরিবেশ, বেতন-ভাতা সহ সকল ক্ষেত্রেই তারা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। দেশে সামগ্রিকভাবে টেকসই উন্নয়নের জন্য এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, মজুরি বোর্ডের প্রস্তাবিত সুপারিশমালায় আইনগতভাবে দুষ্ট ও অগ্রহনযোগ্য। প্রস্তাবিত এই বৈষমূলক সুপারিশমালা অচিরেই সংশোধন করা উচিত। তিনি বলেন- আইনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও অবস্থিত অধিকার কোনভাবেই হ্রাস করা যায় না। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অথচ, মজুরিবোর্ডেও প্রস্তাবনায় সেটাই করা হয়েছে। শ্রমিকদের বিরোধিতা সত্বেও বোর্ড কেন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। চা শ্রমিকদের অধিকার বঞ্চিত রেখে চা-বাগান মালিকরা বিশাল অর্থ-বিত্ত এবং লাগামহীন মুনাফা ভোগ করছে। তাই যেখানে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখভাল করার কথা মজুরি বোর্ডের, সেখানে তারা করছে ঠিক উল্টোটা। মজুরি বোর্ডেও প্রস্তাবনা ও প্রকাশিত গেজেট সুপারিশ অচিরেই প্রত্যাহার করে সংশোধন করা উচিত।

প্রথম আলোর যুগ্ম সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, “দেশ স্বাধীন হয়েছে মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র হওয়ার প্রত্যাশায়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আমরা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার পরতে পরতে চরম বৈষম্য বিরাজমান দেখছি।” । তিনি আরো বলেন, প্রস্তাবিত সুপারিশমালায় চা শ্রমিকদের জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই। চা শ্রমিকরা এখনো নিগৃহীত, অবহেলিত ও চরম বৈষম্যের শিকার। রাষ্ট্র কি চা শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে গণ্য করছে না? দৈনিক ১২০ টাকায় কি কারো পরিবারের ভরণপোষণ সম্ভব?

অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বরেন, চা শ্রমিকরা যেখানে বসবাস করেন সেগুলোকে গৃহ বলা যায় না। তাদের আবাসস্থল যেন এক একটা মুরগীর খাঁচা। এমন মানবেতর জীবন নিয়ে চা- শ্রমিকরা কোনমতে বেঁচে আছে। প্রস্তাবিত মজুরি বোর্ডের সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের বেঁচে থাকাটাও অসাধ্য হয়ে পড়বে। তিনি প্রশ্ন রাখেন মজুরি বোর্ড কি মালিকপক্ষের দালালি করে? অযোগ্য, অথর্ব ও পক্ষপাতদুষ্ট এই মজুরি বোর্ড ভেঙে দিয়ে নতুন করে বোর্ডকে গঠন করা উচিত বলে তিনি দাবি জানান।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *