বড়লেখা ও কুলাউড়ার ক্ষতিগ্রস্থ পানপুঞ্জি পরিদর্শনোত্তর অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য

বড়লেখা ও কুলাউড়ার ক্ষতিগ্রস্থ পানপুঞ্জি পরিদর্শনোত্তর অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য আইপিনিউজের পাঠকদের জন্য হুবুহু দেওয়া হলো-

বড়লেখা ও কুলাউড়ার ক্ষতিগ্রস্থ পানপুঞ্জি পরিদর্শন অনলাইন সংবাদ সম্মেলন
১৫ জুন ২০২১। সকাল ১১।

সুপ্রিয় সাংবাদিক বন্ধু

সবাইকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা। করোনা মহামারীর কারণে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আজ আমাদের একত্র হতে হয়েছে। আপনাদের সকলকে আবারো জানাই কৃতজ্ঞতা। কিন্তু দু:খজনকভাবে করোনা মহামারীর ভেতরেও মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা ও কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী আদিবাসী পানপুঞ্জি গুলোতে বহিরাগতরা প্রবেশ করে জবরদখল করেছে, নির্বিচারে ধ্বংস করেছে পানবাগান এবং কেটে ফেলেছে বহু দেশি গাছ। আপনারা জানেন হয়তো এইসব পানপুঞ্জির বাসিন্দা খাসি জনগোষ্ঠী করোনা মহামারীর প্রথম থেকেই নিজস্ব লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও এই পানপুঞ্জিগুলো রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আদিবাসী খাসিরা পাহাড়ি-টিলায় গড়ে তোলা নিজেদের গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলেন। লতানো গাছপানসহ দেশীয় বৃক্ষপ্রজাতিতে ভরপুর থাকে এসব পুঞ্জি। খাসি ও মান্দি জনগোষ্ঠী এসব পুঞ্জির বাসিন্দা। কিন্তু সিলেট বিভাগের আদি পানপুঞ্জি গুলো আর আগের মতো থাকতে পারছে না। মূলত চাবাগান থেকে উপ-ইজারা নেয়া এসব পুঞ্জি থেকে উচ্ছেদ হতে হচ্ছে আদিবাসিন্দাদের। আদিবাসীদের লাগানো বহু প্রাচীন বৃক্ষ ও পানগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। জীবন ও জীবিকার ওপর এমন প্রশ্নহীন নিপীড়নের সুরাহা হচ্ছে না। চা নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বছর প্রতিটি চাবাগানের আড়াই শতাংশ বাগান সম্প্রসারণের নামে বৃক্ষসম্পদে ভরপুর আদি এই বসতিগুলো চরম হুমকীতে আছে। শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জি এবং কুলাউড়ার ঝিমাই পুঞ্জিতে গাছ কাটা ও উচ্ছেদের বিষয়টি পাবলিক পরিসরে বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরিবেশ ও আদিবাসীদের জীবনজীবিকা সুরক্ষা প্রশ্নে গড়ে ওঠেছিল নাগরিক আন্দোলন। আদালত রায় দিয়েছে, উল্লিখিত পুঞ্জিগুলোর কোনো ক্ষতি করা যাবে না। কিন্তু সম্প্রতি আবারো মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বড়লেখার বেশকিছু খাসিপুঞ্জি আক্রান্ত হয়েছে। বহিরাগতরা এসে পুঞ্জি দখল করেছে এবং নির্বিচারে অনেক পুঞ্জির গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। প্রশাসন তৎপর হয়ে বড়লেখার বনখলা পুঞ্জির জবরদখলকৃত জায়গা দখলমুক্ত করে আবারো আদিবাসীদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। সামগ্রিক বিষয়টি বোঝার জন্য ঢাকা থেকে মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশকর্মী, শিক্ষক, আদিবাসী সংগঠক, গবেষক, সাংবাদিকদের এক নাগরিক প্রতিনিধিদল গত ৭-৮ জুন ২০২১ আমরা ক্ষতিগ্রস্থ পুঞ্জিগুলো পরিদর্শন করি। ক্ষতিগ্রস্থ আদিবাসী, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সাথে কথা বলি। আজকের এই অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা আমাদেও পরিদর্শনোত্তর কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। সিলেট বিভাগের খাসি ও মান্দি আদিবাসীদের পানপুঞ্জির সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং বসবারত আদিবাসীদের ভূমি সংকটের স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব জানিয়ে শুরু করছি আজকের এই অনলাইন সংবাদ সম্মেলন।

সাহসী সংবাদকর্মী

আমরা প্রথমেই ধন্যবাদ জানাতে চাই স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের। যারা সবসময় নিপীড়িত আদিবাসীদেও পাশে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন এবং মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন বেদখল হওয়া পানপুঞ্জি দ্রæতই দখলমুক্ত করে আদিবাসীদের কাছে হস্তান্তর করেছনে। যদওি সবপুঞ্জি এখনও দখলমুক্ত নয়। গত ১২ জুন বড়লেখার পানপুঞ্জি প্রধানদের সাথে মতবিনিময় করে পানপুঞ্জির উন্নয়ন ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন।

আদিবাসীবান্ধব গণমাধ্যমকর্মী

আমরা প্রথমে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের রেহানা চাবাগানের এক ছোট্ট পানপুঞ্জি কাঁকড়াছড়া পরিদর্শন করি। রেহানা চাবাগানের সাথে পুঞ্জির উপ-ইজারা চুক্তিটি ২০১৩ সনে শেষ হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ আর চুক্তি নবায়ন করেনি। তারা নির্বিচারে গাছ কেটে সেখানে চায়ের চারা লাগিয়ে দেয়। এভাবে বহু উৎপাদনক্ষম পান ও ফলের জুম কর্তৃপক্ষ দখল করেছে। জীবিকা হারিয়ে ৪৭ পরিবারের ভেতর ৩০ পরিবার উচ্ছেদ হতে বাধ্য হয়েছে। এখন মাত্র টিকে আছে ১৭ পরিবার। পুঞ্জিতে প্রবেশের মুখেই একটা খেলার মাঠ। কিন্তু এই মাঠটির চারধারেও চায়ের চারা লাগানো হয়েছে। পুঞ্জির একমাত্র কবরস্থানটি দখল করে নতুন চাবাগান সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পুঞ্জিবাসীদের পানীয় জলের একমাত্র উৎস পানির কুয়াটিও নষ্ট করছে চাবাগান। পুঞ্জিবাসী মিন্টু রেমা পরিবারের দুই একর পানজুম ছিল। জুমের প্রায় ৬৭০টি বড় গাছই কেটে ফেলেছে চাবাগান। দখল করে নিয়েছে তার জুমের জমি।
পরবর্তীতে আমরা বড়লেখার আগার ও বনাখলা পানপুঞ্জি পরিদর্শন করি। আগার পুঞ্জির কেটে ফেলা সহস্র পানগাছের স্তুপের কাছে যখন আমরা পৌঁছাই বোঝা যায় কী নৃশংসতা চলছে পানপুঞ্জি ঘিরে। গাছের শোকে পানজুমের মালিক রিনুস পডুয়েং ঠিকমত কথা বলতে পারছিলেন না। পুঞ্জিবাসীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, কেবল করোনাকালেই নয় এর আগেও পুঞ্জি দখলের জন্য দুর্বৃত্তরা তাদের গাছ ও পানজুম কেটে ফেলেছে। ২০১৯ সনের জানুয়ারিতে নালিখাই পুঞ্জির পান জুম ও বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ২০১৫ সনের নভেম্বরে আগার পুঞ্জির কয়েকশত পান গাছ কেটে বিনাশ করে। বড়লেখার সীমান্তবর্তী শাহবাজপুর ইউনিয়নের আরেক পানপুঞ্জি ‘বনাখলা পুঞ্জি’। ২০০৭ সনে খাসিরা ছোটলেখা চাবাগান থেকে ২৭২ একর জমি ইজারা নিয়ে এই পুঞ্জি গড়ে তোলে। ছোটলেখা চাবাগান সরকারের কাছ থেকে এক হাজার ৯৬৪ দশমিক ৫০ একর টিলাভূমি চাবাগানের জন্য ইজারা নিয়েছিল। চাবাগানের ইজারাকৃত জমি থেকেই কর্তৃপক্ষ টাকার বিনিময়ে খাসিদের উপ-ইজারা দেয়। ২০২১ সনের ২৮ মে বনাখলা পুঞ্জি দখল করে বাইরে থেকে আসা বাঙালিরা। পুঞ্জি দখল বিষয়ে পুঞ্জিপ্রধান নরা ধার থানায় একটি জিডি করেন এবং চাবাগান কর্তৃপক্ষ মামলা করে। জবরদখলের এক সপ্তাহ পর বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন ২০২১ সনের ৪ জুন বনাখলা পানপুঞ্জির জায়গা দখলমুক্ত করেছেন। বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নেতৃত্বে পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে বনাখলা পুঞ্জিতে জবরদখলকারীদের নির্মিত ঘর উচ্ছেদ করেছেন।

জীবন ও জীবিকা সংবেদনশীল বন্ধু

মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের খাসি ও মান্দিরা ঐতিহ্যগতভাবে বনবিভাগ, চাবাগান এবং কিছু খাসজমি এলাকায় বসবাস করেন। খাসিদের বিশেষ পানজুম স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে এক সবুজ আবহ তৈরি করে। কেবল জীবনজীবিকা নয় এই পানজুম ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সংরক্ষণে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সরেজমিনে আমরা দেখেছি, পানপুঞ্জিগুলো তুলনামূলকভাবে উদ্ভিদপ্রজাতিতে বেশ বৈচিত্র্যময় এবং সেখানকার প্রাকৃতিক ছড়া আবর্জনামুক্ত। জানতে পেরেছি পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা আদিবাসী শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শিখে থাকে। পানপুঞ্জির পরিবেশবান্ধব চাষপদ্ধতিকে গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা জরুরি এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও বরাদ্দও জরুরি। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক জোর দিয়ে বলেছেন, পুঞ্জিবাসী আদিবাসী জীবনজীবিকার সুরক্ষাই তার প্রথম অগ্রাধিকার। আমরা প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের আশ্বাস ও তৎপরতার ওপর শতভাগ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে চাই। আমরা দেখতে চাই রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে পানপুঞ্জির ভূমি সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করেছে। চাবাগান কর্তৃপক্ষ, চাবোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, বনবিভাগ, আদিবাসী সংগঠন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সকলের মতামত ও পরামর্শেই এই সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব। আশা করি আপনাদের গণমাধ্যমে আমাদের সাম্প্রতিক এই পরিদর্শন অভিজ্ঞতা এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত ও প্রচারিত হবে। দীর্ঘসময় এই অনলাইন সংবাদ সম্মেলন আয়েঅজনে অংশ নেয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।

আমাদের প্রস্তাব:

ক্স পানপুঞ্জি জবরদখল, গাছ কাটা ও পানজুম ধ্বংসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের আইন ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
ক্স ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
ক্স পানপুঞ্জির নাগিরকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানসহ মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ক্স পানপুঞ্জির নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধান করতে হবে।
ক্স পানপুঞ্জি গুলোর গাছকাটা, উচ্ছেদ ও জবরদখল এগুলো সবই ধারাবাহিক নিপীড়নের ফলাফল। এক্ষেত্রে এসব অঞ্চলে ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভিন্নভাবে ভাবা জরুরি। পানপুঞ্জির জায়গা গুলো চাবাগান থেকে ইজারা বন্দোবস্তী বাতিল করে পুঞ্জিবাসীদের জন্য বন্দোবস্তী দেয়া যেতে পারে।
ক্স চাবাগান সম্প্রসারণের নামে কোনো পানপুঞ্জির গাছ কাটা যাবে না এবং পুঞ্জির জায়গা ও পানজুম দখল করা যাবে না।
ক্স মৌলভীবাজার অঞ্চলের খাসি, মান্দিসহ চাবাগানের আদিবাসীদের শিক্ষা-সংষ্কৃতি বিকাশে ‘আদিবাসী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান’ তৈরি করতে হবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *